Advertisement

বাংলাদেশ-মিয়ানমার বাণিজ্য চুক্তির ১৬ বছর পূর্ণ : টেকনাফ স্থল বন্দরে মোট রাজস্ব আয় ৬ শত ৫১ কোটি টাকা

আজ ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তির ১৭ বছরে পর্দাপণ করেছে। ১৯৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের টেকনাফ এবং মিয়ানমারের মংডু টাউনশীপে পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাণিজ্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল।এই ১৬ বছরে বাণিজ্য চুক্তির অধিনে টেকনাফ বন্দরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬৫১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।১৬ বছর ধরে টেকনাফ স্থল বন্দর দিয়ে যে পণ্য মিয়ানমার থেকে আমদানি হয় তা হচ্ছে- বিভিন্ন প্রজাতির হিমায়িত মাছ, শুটকী , বিভিন্ন প্রকার কাঠ, ছোলা, আচার, শুকনা বড়ই, সুপারি, হলুদ, মরিচ, তেঁতুল, তৈরি পোশাক, ব্যাটারি, স্ক্রাপ, মুলি বাঁশ, গোলপাতা,  বেঁত,বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি জিরা, ছিকন জিরা, ধন্যা, আদা, সেনেখা মাটি, সেন্ডেল, ছাতা, তুলা, গাম বুট, গবাদী পশুর চামড়া, গরু, মহিষ, ছাগল, তরমুজ, ইত্যাদি।অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রপ্তানি হচ্ছে-সিমেন্ট, ফেয়ার এন্ড লাভলী, গরুর নাড়িভুড়ি, ষাঁেড়র লিঙ্গ, এলমুনিয়াম সামগ্রী, ময়দা, ঔষুধ, চুল, গার্মেন্টস কাপড় ও গেঞ্জী ইত্যাদি।

জানা যায়, ১৯৯৫ সনের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের টেকনাফ এবং মিয়ানমারের মংডু টাউনশীপে পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঝাকজমক ও আড়ম্বরপূর্ণভাবে টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। এসব অনুষ্ঠানে উভয় দেশের একাধিক মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। স্বল্প পরিসরে চালু হওয়া সীমান্ত বাণিজ্য হাঁটি হাঁটি পা পা করে ১৭ তম বর্ষে পদার্পন করেছে। অবকাঠামো সহ নানা ধরণের সমস্যা এবং সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও সরকার টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য থেকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে। রপ্তাণী বাণিজ্যের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নিত্য নতুন আইটেমের পণ্য। এদিকে দেরীতে হলেও সীমান্ত বাণিজ্যের গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং সমস্যা সমূহ চিহ্নিত করে ক্রমান্বয়ে তা নিরসন করতে উভয় দেশের সীমান্ত এলাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বর্ডার ট্রেড জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ। বাংলাদেশের টেকনাফ ও কক্সবাজার এবং মিয়ানমারের মংডুতে ইতিমধ্যে এই গ্রুপের ৩টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভাগুলোতে সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ সমস্যা সমূহ দুরীকরণের সুপারিশ এবং প্রস্তাব তৈরি বিশেষতঃ বর্ডার হাট চালু ইত্যাদি চুড়ান্ত করা হয়েছে। যা টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রমে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে।

টেকনাফ কাষ্টমস সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৫ সালে সেপ্টেম্বর টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য চালু হওয়ার পর থেকে ৪ সেপ্টেম্বর ২০১১ পর্যন্ত ১৬ বছরে টেকনাফ স্থল বন্দর কাষ্টম্স মোট রাজস্ব আয় করেছে ৬৫১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩হাজার ৫ শত টাকা এবং এই ১৬ বছরে টেকনাফ থেকে ৫৮ কোটি ৬৭ লাখ ৬৭ হাজার ৫ শত ১৯ টাকা মূল্যের বাংলাদেশী পণ্য মিয়ানমারে রপ্তানী হয়েছে। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে ঘটনা বহুলের মধ্য দিয়ে ১৬ তম বর্ষ সম্পন্ন করে ৫ সেপ্টেম্বর ১৭তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এই বর্ষপূর্তি এবং নববর্ষে পদার্পন উপলক্ষ্যে কাষ্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, আমদানী-রপ্তানীকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশন বা সরকারী বেসরকারী কোন সংস্থা কোন আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেনি। তবে টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্যের একযুগ পূর্তিতে টেকনাফের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং সরকারকে সর্বোচ্চ রাজস্বদাতা মোঃ হাশেম মেম্বার টেকনাফ উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদে শুকরানা মিলাদ মাহফিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন। স্বল্প পরিসরে শুরু হওয়া এই সীমান্ত বাণিজ্য আজ দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় বিশাল ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য চালু হওয়ার পর প্রথম ৪ আর্থিক বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত বার্ষিক রাজস্ব আয়ের কোন লক্ষ্যমাত্রা ছিলনা।

 ১৯৯৫-১৯৯৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল ৭৯ লাখ ৯৮ হাজার ১১৬ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬৩৭ টাকা।

১৯৯৬-১৯৯৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ২৫৮ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ১ কোটি ৮১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৮৬ টাকা।

১৯৯৭-১৯৯৮ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ কোটি ৫১ লাখ ৮১ হাজার ৯৫ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল- ২ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার ৭৮০ টাকা।

১৯৯৮-১৯৯৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছিল ১ কোটি ৮২ লাখ ৪৫ হাজার ৮৬৯ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ৭৪ লাখ ১০ হাজার ৯৭৩ টাকা।

১৯৯৯-২০০০ অর্থ বছরে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৮ কোটি ৩০ লাখ ১০ হাজার ৩২৬ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ৪৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬৫ টাকা।

২০০০-২০০১ অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিলনা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৯ কোটি ৮লাখ ৯২ হাজার ৭১৫ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ১৭ লাখ ৪৫ হাজার ৪৯৭ টাকা।

২০০১-২০০২ অর্থবছরে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৩২ লাখ ৯০ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ১৩ কোটি ৪২ লাখ ৬৯ হাজার টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ৯৯ লাখ ৬৮ হাজার ৫৬৭ টাকা।

২০০২-২০০৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ কোটি ৭৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা।  রাজস্ব আয় হয়েছিল ২৭ কোটি ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৭ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ১ কোটি ৮৯ লাখ ২১ হাজার ৩৭৬ টাকা।

২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৩ কোটি ২৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার ৯২৩ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ২ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৭৪২ টাকা।

২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬১ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৫৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৬৭ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ১ কোটি ৪ লাখ ১৩ হাজার ৪২০ টাকা।

২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৭৪ কোটি ৮১ লাখ ৮২ হাজার ৫৮৭ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ২ কোটি ৫৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪২৫ টাকা।

২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৮৭ কোটি ৯৬ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭১ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ২ কোটি ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার ৩৯৫ টাকা।

২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৫ কোটি ১৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছিল ৬৯ কোটি ৯৯ লাখ ৬৭ হাজার ৩০১ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৪ হাজার ৩৮২ টাকা।
২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে রাজস্ব আয় হয়েছে ৬৯ কোটি ৩ লাখ ১১ হাজার ৬২৮ টাকা। রপ্তানী মূল্য ছিল ৮ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৭৮৪ টাকা।

২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ৬৮ কোটি ২১ লাখ ৫২ হাজার টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব আয় করেছিল ৭৫ কোটি ৪৭ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬০ টাকা। রপ্তানী হয়েছে ১১ কোটি ৮২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩০ টাকা মূল্যের পণ্য।

২০১০-২০১১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৪ কোটি ৪২ লাখ ৭২ হাজার  টাকা। রাজস্ব আয় হয়েছে ৯০ কোটি ৩৭ লাখ ৮৮ হাজার ২ শত ৬৭ টাকা। উক্ত অর্থবছরে ১১ কোটি ৬ লাখ ১৪ হাজার ৬শত ৫৫ টাকা মূল্যের বাংলাদেশী পণ্য টেকনাফ বন্দর দিয়ে মিয়ানমারে রপ্তানী হয়েছে।

২০১১-২০১২ চলতি নতুন অর্থ বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর টেকনাফ স্থল বন্দর কাষ্টম্সকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত করে দিয়েছে ৮৪ কোটি ২২ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাসিক লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৭ কোটি ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৩ টাকা ৩৩ পয়সা। অর্থবছরে প্রথম মাস জুলাইয়ে সব মিলে রাজস্ব আয় হয়েছে ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৮ হাজার ৫৭৬ টাকা, রপ্তানী মূল্য ছিল ৭৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬৩৭ টাকা। আগষ্ট মাসে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ৯৭ লাখ ৫১ হাজার ১৮৫ টাকা এবং রপ্তানী মূল্য হচ্ছে ৮৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৮ টাকা।তবে আগষ্ট মাসে ১৩ দিন কর্ম দিবস সরকারী বন্ধ থাকায় জুলাই মাসের চেয়ে সোয়া কোটি টাকা রাজস্ব আয় কম হয়।

সবমিলে টেকনাফ-মংডু সীমান্ত বাণিজ্য চালূ হওয়ার পর থেকে আগষ্ট ২০১১ সহ ১৬ বছরে মোট রাজস্ব আয় হয়েছে ৬৫১ কোটি ৫৭লাখ ৩২ হাজার ৫৯১ টাকা, এবং ৫৮ কোটি ৬৭লাখ  ৬৭ হাজার  ৫১৯ টাকা মূল্যের  বাংলাদেশী বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমারে রপ্তানী হয়েছে।

টেকনাফ কাষ্টমস সুপার আনোয়ার মাসুম ১৭বছরে পদাপর্ণের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, বাংলাদেশ মিয়ানমারের এ চুক্তির অধিনে বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব আয়ে ভূমিকা রয়েছে।ফলে আগামীতে রাজস্ব আয় দ্বিগুন হওয়ার সম্ভাবনা  রয়েছে।

Post a Comment

0 Comments