Advertisement

কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদী মৃত প্রায় : দুই তীরে হাজারো দখলবাজ

এস এম আরোজ ফারুক ॥
অশংখ্য বাকঁ নিয়ে যে নদীর সৃষ্টি তার নাম বাকঁখালী নদী। আর বাঁকখালী নদীর তীর ঘেসে গড়ে উঠেছে পর্যটন শহর কক্সবাজার। এশহরের ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদী এখন হাজারো দখলবাজদের হাতে পড়ে নদী থেকে খুব দ্রুত তা লোকালয়ে পরিনত হচ্ছে। দুই তীরে কয়েক হাজার একর সরকারি জমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করে দখল করে রেখেছে দখলদাররা। গত বছরের শেষ দিকে প্রায় এক হাজার অবৈধ দখলদারের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২৪২ দখলদারের বিরুদ্ধে নোটিশও পাঠানো হয়েছিল। তবে এখনো তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং দখলদারেরা আরো বেপরোয়াভাবে নদী দখল করে নিত্য নতুন স্থাপনা নির্মাণ করছে।
সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকার ক্ষমতাধর আওয়ামীলীগ নেতা, বিএনপি নেতা এমনকি জামায়াতের নেতারা মিলেমিশে বাঁকখালী নদী দখল ও ভরাট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দিনে নয় প্রতি রাতেই ৫/৬ টি ট্রাকে করে সারা রাত জুড়ে এসব ¯পটে চলছে বাঁকখালী নদী ভরাট যজ্ঞ। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করেই রাতারাতি ভরাট করে ফেলা হচ্ছে বির্স্তীণ বাঁকখালী নদী। এছাড়া এসব রাজনৈতিক পরিচয়ধারী রাঘববোয়ালদের পাশাপাশি প্রায় ১০০০ ব্যক্তি উত্তর নুনিয়াছড়া থেকে মাঝিরঘাট পর্যন্ত বাঁকখালী নদীর তীর ভরাট করে দখল করছে। এসব দখলদারেরা প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করেই কার্যক্রম চালাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে অনেকেই আবার উচ্চ আদালতে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে খোদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে নিষেধাঙ্গার আদেশ নিয়ে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চালানো অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। নানা ঝামেলার কারনে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সেদিকে তেমন দৃষ্টি দেননা বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপরও জেলা প্রশাসনের কোন ধরনের অনুমতি না নিয়েই দখলদাররা জলাশয় ভরাট করছে।
শহরের টেকপাড়া এলাকার আবুল কাশেম জানান, বাঁকখালী ভরাটের কারনে টিউবওয়েল এর পানি লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। তাই লক্ষাধিক টাকা খরচ করে তিনি গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। তিনি বলেন, এলাকার অনেকেই টাকার অভাবে এত ব্যায় বহুল গভীর নলকূপ স্থাপন করতে না পেরে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে দূর্ভোগ পোহাচ্ছে।
মাঝিরঘাট এলাকার আমির হোসেন দ্রুত বাঁকখালী নদী দখল মুক্ত করে ড্রেজিং এর দাবী জানান। এছাড়া বাঁকখালী নদী ভরাট করে ফেলার কারনে বর্ষায় কক্সবাজার শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শহরের বৃষ্টির পানি সহজেই বাঁকখালী নদীতে যেতে না পারা ও বাঁকখালী ছোট হয়ে যাওয়ার কারনে পানি ধারন ক্ষমতার অভাবে বর্ষাকাল জুড়েই শহরের বেশ কিছু এলাকা জলাবদ্ধতায় পতিত হয়। বাঁকখালী ভরাটের ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইচ গেইটটিও ভরাট হয়ে গেছে। এতে শহরের বাণিজ্যিক এলাকা বাজারঘাটা একটু বৃষ্টি হলেই পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকার পন্য নষ্ট হচ্ছে। এমনকি প্রতি বছরই বর্ষাকালে কক্সবাজার থেকে রামুর গর্জনিয়া পর্যন্ত বাঁকখালী নদীর দুই পাশের অর্ধশতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে আসছে।
এসব এলাকার সচেতন লোকজন বলছেন, অতীতে এভাবে বৃষ্টির পানিতে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হতো না। এছাড়া বিগত কয়েক বছর গুলোতে নতুন একটি শংকার জন্ম হয়েছে। আর তা হলো বাঁকখালী নদীর দুই পাশের গ্রাম গুলো দীর্ঘ সময় ধরে পানিবন্ধী থাকা। এলাকাবাসী বলেন, বাঁকখালী নদী ভরাট করায় ছোট হয়ে গেছে। আর সেই ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদী এখন একটি পাহাড়ি ‘ছড়া’ হিসেবে পরিণত হয়েছে।
কক্সবাজারের সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, পরিবেশবাদী সংগঠনসহ পুরো কক্সবাজারবাসীর দাবী ছিল দ্রুত বাঁকখালী নদী অবৈধ দখলমুক্ত করে তা ড্রেজিং করা। এছাড়া ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল কক্সবাজারের জেলা পার্ক ময়দানে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঁকখালী নদী দখল মুক্ত করে দ্রুত ড্রেজিং করা হবে বলে ঘোষনা করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির ৩ বছরেও বাঁকখালী নদী ড্রেজিং হয়নি। বরং সেখানে চলছে নদী ভরাটের প্রতিযোগিতা।
বাঁকখালী নদী ভরাটের বিষয়ে কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দিপু ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কক্সবাজারের ঐতিহ্যের এ নদী দখলবাজরা প্রতি দিনই গিলে খাচ্ছে। অথচ প্রশাসন এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থায় নিচ্ছে না। গুটি কয়েক ভূমিগ্রাসী মানুষের জন্য কক্সবাজারকে ধ্বংস হতে দেয়া যায় না। শীঘ্রই বাঁকখালী নদী রক্ষায় আন্দোলনের ঘোষনা দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, বাঁকখালী নদী শুধু কক্সবাজারের ঐতিহ্য নয় এটি কক্সবাজারের প্রাণ। বাঁকখালী নদী ভরাটের কুফল কক্সবাজারে ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে পরিবেশও। ভূ-গর্ভে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি এখন জেলাবাসীর প্রধান ইস্যু। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বাঁকখালী নদী ড্রেজিং করার ঘোষনা দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারনে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এই ইস্যুতে প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।

Post a Comment

0 Comments