Advertisement

গরমের গেঁড়াকলে

ঘটনার সূত্রপাত আজ সকাল থেকেই। পাটিগণিতের অঙ্কের 'মনে করি' সিস্টেম কাজে লাগিয়ে 'মনে করি গরম নেই'- এই সূত্রে বাতেন সাহেব বেশ নাকডাকিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। সূত্র বেশ কাজে দিচ্ছিল। আরে দেবে না-ই বা কেন? এই 'মনে করি' সূত্রে কত বড় বড় অঙ্ক মিলে যায়! আর সেই তুলনায় গরম তো একটা তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু আরামের ঘুম তার কপালে সইল না। বাতেন সাহেবের একমাত্র স্ত্রী সাতসকালেই চোখ গরম করে বললেন, 'ময়দার
বস্তার মতো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছ কোন আক্কেলে? বাজারে যাও!'
বাতেন সাহেব পাল্টা চোখ গরম করে কিছু একটা বলতে গিয়েও স্ত্রীর চোখের গরমের কাছে অসহায় বোধ করলেন। তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন, প্রকৃতির গরমকে 'মনে করি' সূত্রে ফেলে একটু হলেও রেহাই পাওয়া যায়। কিন্তু স্ত্রীর চোখের গরম ঠাণ্ডা করার কি কোনো উপায় নেই?
: কী হলো? বলি ঝিম মাইরা রইলা কোন আক্কেলে? বাজারে যেতে বললাম না!
বাতেন সাহেব আরো কিছু ভাবতেন! কিন্তু স্ত্রীর গরম গরম ঝাড়ি খেয়ে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। তারপর মিনমিন করে বললেন, ইয়ে সকালের নাশতাটা দাও! গরম গরম খেয়ে বাজার করে নিয়ে আসি।
বাতেন সাহেবের স্ত্রী কোলবালিশটা আঁকড়ে ধরে কেবল একটু আরাম খুঁজছিলেন। তাঁর কথায় চিৎকার করে বললেন, কী বললা তুমি? এই সাতসকালে আমি নাশতা বানাব?
স্ত্রীর কথার গরমে বাতেন সাহেব আর কিছু বলার সাহস পেলেন না। কোনো রকমে বললেন, আরে না না, আমি কী তা-ই বলেছি নাকি? তুমি ঘুমাও, আমি বাজার করে নিয়ে আসি।
বাতেন সাহেব বাজারে যাওয়ার পথে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলেন। নাশতা করা দরকার। তিনি গরম গরম গরুর পায়া ও গোটাদশেক পরোটা দিয়ে গরম গরম নাশতা করে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে পেটটা ঘোঁত করে একটা গোলতান দিয়ে উঠল।
পেট গরম নিয়ে বাজারে এসে বাতেন সাহেবের মেজাজ গরম হতে লাগল। কারণ বাজার এতটাই গরম যে কোনো জিনিসেই হাত দেওয়া যাচ্ছে না। বয়সে কিশোর একটা ইলিশ মাছের দাম বলে দুই হাজার টাকা! ফাজলামো নাকি? বাতেন সাহেব মাছ বিক্রেতাকে কিছু বলতেই মাছ বিক্রেতা পাল্টা জবাব দিয়ে বলল, এক কাম করেন, পদ্মায় যাইয়া নিজেই মাছ ধইরা আনেন গা! খরচা কম পড়ব!
বাতেন সাহেব মেজাজ গরম করে দু-একটা গরম কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তার এখন এসব ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করলে চলবে না। তাকে তাড়াতাড়ি বাজার শেষ করতে হবে। আজ তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন আসবে। ভালোমতো বাজার না করলে আজ বাসা গরম হয়ে যাবে। বাতেন সাহেব বাজারের দিকে মনোযোগ দিলেন। অনেক কষ্টে একটা সিলভারকার্প মাছ কিনে বাসায় ফিরলেন। তার মনে মনে একটাই আশা, যে করেই হোক এটাকেই ইলিশ মাছ বলে বউয়ের সামনে প্রমাণ করতে হবে। তা না হলে আজ তাঁর খবর আছে।
সব গরমের ধাক্কা সামলে বাসায় আসতেই বাতেন সাহেব দেখলেন, লোডশেডিং চলছে। কোনো রকমে বাজারের ব্যাগটা রেখে বাতেন সাহেব ইজি চেয়ারে বসে একটু আরামের সন্ধান করতেই তাঁর স্ত্রী এসে বলল, এটা কী মাছ এনেছ? তোমাকে না ইলিশ মাছ আনতে বলেছিলাম?
বাতেন সাহেব ঢোক গিলে বললেন, এটাই ইলিশ মাছ! গরমে একটু এমন হয়ে গেছে!
বাতেন সাহেবের স্ত্রী চিৎকার করে বলল, আমাকে বোকা পাইছ? এটা কোনোমতেই ইলিশ মাছ হতে পারে না।
বাতেন সাহেব আত্মরক্ষার্থে গণিতের 'মনে করি' সূত্র প্রয়োগ করে বললেন, আহা! এত গ্যানজাম করার কী আছে! গণিতের সূত্র হিসেবে ধরে নিই মানে 'মনে করি'- এটাই ইলিশ মাছ! এই কথার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে যেন বাজ পড়ল। বউ কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে এগিয়ে এলো। বাতেন সাহেবের পেটটাও গোলতানি দিয়ে উঠল। পড়িমরি করে টয়লেটের দিকে ছুটলেন। একছুটে টয়লেটে ঢুকেই দরজা লাগিয়ে দিলেন। আহ! শান্তি! এবার আর কোনো ঝামেলা নেই।
বাতেন সাহেব টয়লেটে বসে আছেন। এখানেই চরম শান্তি। এখানে মেজাজ গরম নেই, বাজার গরম নেই, চোখের গরম নেই, প্রকৃতির গরম নেই। বাতেন সাহেব পেট গরমকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলেন। এই পেট গরমই তাঁকে আজ সব রকম গরমের গেঁড়াকল থেকে মুক্তি দিল। পেট গরমের জয় হোক!
rohit_kislu@yahoo.com

Post a Comment

0 Comments