Advertisement

বিপন্ন গণতন্ত্র, খাদের কিনারায় বাংলাদেশ

মোঃ মিনার“ল কবির (আল আমিন)
বর্তমান বাংলাদেশের পরি¯ি’তি এমন এক পর্যায় পৌঁছেছে যেখানে দেশের নাগরিক সমাজ উৎকন্ঠিত। অনিশ্চিত নৈরাজ্যের দিকে অগ্রসর দেশের ও গণতন্ত্র নামের সেই স্বর্ণের হাসটা। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নূন্যতম গণতন্ত্রের যে নিয়মতান্ত্রিক চর্”া শুর“ হয়েছিল সেটিকে ৫ জানুয়ারির অবৈধ ও জন সম্পৃক্তহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র নামক স্বর্ণের হাসটাকে করবস্তকরে দেশকে চরম সংকটের দিকে ধাবিত করছে সরকার। ক্রমাগত
রাজনৈতিক অ¯ি’রতায় বিপর্যয়ের মুখে দেশের অর্থনীতি এবং ভয়ংকর ভাবে ভঙ্গুর অব¯’ায় দেশের আইন শৃঙ্খলা। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে কলংকের যে দাগ এটে দিয়েছেন তা হয়তো কখনো মুছার নয়। আমরা জাতি হিসাবে দীর্ঘদিন সংগ্রাম ও সাধনা করে আস্তে আস্তে গণতন্ত্রের যে পথ চলা শুর“ করেছিলাম তা এই সরকার ক্ষমতার আসার দুই বছরের মধ্যে বিপন্ন হয়ে যেতে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ যেমন ২০১৩ এর ফেব্র“য়ারি মাসের মাওলানা সাঈদীর রায়ের পর যে গণ আন্দোলন শুর“ হয় সে আন্দোলন কে দমন করার জন্য সরকার যে ভাবে গণহত্যা শুর“ করেছিলো তা হয়তো বাংলার ইতিহাসে শুধুমাত্র স্মরণীয় হয়ে থাকবে না বরণ ইতিহাসে একটি গুর“ত্ব পূর্ণ ¯’ান দখল করে নিবে।
উদাহরণ ঃ ২৮শে ফেব্র“য়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উত্তাল ও ভয়ানকতম দিন। যেদিন নিরহ আন্দোলনকারীদের উপর সরকার নির্মম ভাবে গুলি চালিয়ে ইতিহাসকে রক্তাক্ত করেছে। এরপর দেখি ইসলাম বিদ্বেষী ব্লগারদের বির“দ্ধে  যে গণ আন্দোলন ও ইসলামী বিপ্লব শুর“ হয় তা দমনের জন্য নৃশংস গণহত্যা চালানো হয় যার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সূর্য্য আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে। এর পর দেখি বিরোধী দলের শান্তি পূর্ণ কর্মসূচীতে বিনা উস্কানিতে পুলিশের নির্বিচারে গুলি। শেষ পর্যন্ত ৫ই জানুয়ারির অবৈধ নির্বাচনের মধ্যে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কবরস্ত করেছে, যা দেশের জন্য একটি ভয়ংকরতম পরি¯ি’তি সৃষ্টি করেছে। এবার আসা যাক ডযধঃ রং উবসড়পৎধপু? বা গণতন্ত্র কী? গণতন্ত্রের ইংরেজি শব্দ উবসড়পৎধপু যা কৎধঃরধ শব্দ উবসড়ং ও যা গ্রীক শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়েছে যার অর্থ উবসড়ং অর্থ গণতন্ত্র বা জনগন আর কৎধঃরধ শব্দের অর্থ শাসক। সুতরাং তাদের শব্দগত অর্থ হ”েছ গণতান্ত্রীক বা জনগন  শাসক। 
সাধারণ সংজ্ঞা ঃ  সাধারণ ভাবে গণতন্ত্র বলতে এমন এক ধরণের শাসন ব্যব¯’াকে বুঝায় যেখানে জনগণে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে নিজেদেরকে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসন করে। 
বিশিষ্ট আইনবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানী লিন্ডসের মতে “গণতন্ত্র একাধারে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক মতবাদ এবং সে হিসাবে এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল স্বাধীনতা ও সাম্য। 
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের মতে “উবসড়পৎধপু রং ধ মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব নু ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব ধহফ ভড়ৎ ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষব” অর্থাৎ গণতন্ত্র হলো জনগণের জন্য জনগনের দ্বারা জনগণের শাসন। গণতন্ত্রের কিছু গুর“ত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার উপর গণতন্ত্র দাড়িয়ে থাকে। যেই চরিত্র বা পিলার গুলো না থাকলে গণতন্ত্র পরিপূর্ণ বা আংশিক ও পূর্ণ হয় না, এই গুর“ত্ব পূর্ণ পিলার গুলোকে আইনের  রক্ষাকবচ বলা হয়। 
যেমন ঃ আইনের অনুশাসন, দায়িত্বশীল শাসন ব্যব¯’া, জণগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, বহুদলীয় শাসন ব্যব¯’া, জনগণের ভোটধিকার, সমঝোতা এবং সামাজিক সাম্য। উপরোক্ত বৈশিষ্ট গুলো না থাকলে গণতন্ত্রের নামে এক নায়কতন্ত্র অথবা স্বৈরাচারতন্ত্র চালু থাকে। এবার দেখা যাক ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে এইসব বৈশিষ্ট্যও প্রতিফলন ছিল কিনা। আইনের শাসন গণতন্ত্রের প্রধান রক্ষাকবচ হলেও বর্তমান সরকারের আমলে বা ইতিহাসে নজির বিহীন ভাবে আইনের শাসনকে পর্যদুস্ত করেছে। আইনের শাসন থাকলে আজকে সাধারণ মানুষ অথবা বিরোধী দলকে পুলিশ আতংকে ভোগতে হত না। শান্তিপূর্ণ মিছিলে বাধাদান বা গুলি চলতো না, দেশে দ্বৈত নীতির উদ্ভব হতো না। 
জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী  ঃ- 
এটি গণতন্ত্রের জন্য অন্যতম পিলার। কিন্তু দুভার্গ্য আমাদের এই দেশে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী লেখা থাকলেও কিš‘ এই দেশে কোন সময় চালু না থাকলেও এই সময়ে তা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে জনগণের আশা আক্সক্ষাংখা জলাঞ্জলি দিয়ে ১৫তম সংবিধান সংশোধন যা ছিলো সম্পূর্ণ গণতন্ত্র বিরোধী। 
নাগরিক অধিকার ঃ গণতন্ত্রের অন্যতম মূল উপাদান হলো নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ করা। সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের জন্য কিছু মৌলিক বা মানবাধিকার নিশ্চিত করে যা ভঙ্গ করলে মানবতা বিরোধী অপরাধ বলে চিহ্নিত হয়। জাতি হিসাবে আজ আমরা কলংকিত। বিগত সময়ে যেভাবে মানুষ খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, তা দেখে আতংকে উৎকন্ঠিত হতে হয়। সামান্য পরিসংখ্যান দেখলে বুঝা যাবে কিভাবে ঐঁসধহ ৎরমযঃং ারড়ষধঃরড়হ করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ সংবিধান পরিপš’ী ও গণতন্ত্র বিরোধী। মহাজোটে সরকারের ৫ বছরে মানুষ খুন হয়েছে সাড়ে ২২ হাজার। যা ইতিহাসে রেকর্ড সংখ্যক। এরই মধ্যে ১৩ শতক রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এবং ৭০০ জন পুলিশের গুলিতে মারা যান। সবচেয়ে বেশি হত্যাকান্ড হয়েছে ২০১৩ তে কিনা ৩০০ এর উপর। মানুষের বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার কেড়ে নিয়ে শুধু গণতন্ত্র বা মানুষ হত্যা হয়নি এটি মূলত মানবতা কে হত্যা করা হয়েছে। 
বহুদলীয় শাসন ব্যব¯’া ঃ বহুদলীয় শাসন ব্যব¯’া গণতন্ত্র রক্ষার মূল বা অন্যতম উপাদান হলেও ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে যেখানে বহুদল নির্বাচন বর্জন করেছে সেখানে বহুদলীয় শাসন ব্যব¯’া নেহায়াত হাস্যকর নয় কি? 
ভোটাধিকার নিশ্চিত ঃ ভোটাধিকার নিশ্চিত হলো, সাংবিধানিক ও গণতন্ত্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ। কিন্তু দুভার্গ্য আমাদের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে যেখানে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দীতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয় সেখানে কিভাবে ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়েছে তা জনগণ জানেও না এবং ১০০ আসনের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ১০ শতাংশের একটু বেশি ঋধৎব বষবপঃরড়হ সড়হরঃড়ৎরহম অংংড়পরধঃরড়হ (ঋঊগঅ) এর মতে। এবং ৩৯টি কেন্দ্রে ১টি ভোটও না পড়ে ইতিহাস করেছে এই নির্বাচন। যা শুধুমাত্র সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের ভোটাধিকার হরণ করেন নি, মৃত্যু ঘটিয়েছেন গণতন্ত্রের। 
এবার আসা যাক কেন আমি এই নির্বাচনকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেছি। সংবিধানের ৬৫(১) স্পষ্টভাবে বলা আছে, বাংলাদেশের সংসদ সদস্য ও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। এটা সত্য যে, একটি নির্বাচনের জন্য বহুদলীয় অংশ গ্রহণ আবশ্যক করা হয়নি অথবা ২০% অথবা ১৫% এর নিচে ভোট না পড়লে বাতিল করতে হবে। এই বিধান গুলো অর্ন্তভূক্ত না হলেও ৬৫(১) জনগণের দ্বারা প্রত্যক্ষ ভাবে নির্বাচিত হতে হবে তা বলা হয়েছে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যে নির্বাচনে ৪০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৮টি দলই অংশ গ্রহণ করেননি। এমনকি ১৪ দলের ১৪টি দলই অংশগ্রহণ করেন নি। মাত্র ১২টি দলেই নিয়ে নির্বাচন করলেই তা কিভাবে গ্রহণযোগ্য বা বৈধ হবে। এই অবৈধ কারণেই আজকে এই সরকারকে স্বীকৃতি দিতে রাজি নই। এমন কি তারা এই নির্বাচনে অগণতান্ত্রিক ও প্রহসন বলে আখ্যায়িত করেছেন। 
যেমন এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন এই নির্বাচনকে “ট্রাজিককমিক” বলে আখ্যায়িত করেছেন। এমনকি আওয়ামীলীগ মিত্র ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক “দ্যা হিন্দুর” মন্তব্য ছিলো “বাংলাদেশে কেউই বিজয়ী হয়নি”। অন্যদিকে কলকাতার আনন্দ বাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে “বাংলাদেশের নতুন সরকার অবৈধ” অন্য দিকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী পত্রিকা “দ্যা ইকনমিষ্ট” বলেছেন “বাংলাদেশের রাজনীতি পচে গেছে” অন্য দিকে হংকং ভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংগঠন এক বিবৃতিতে বলেন “৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন এর প্রতিশ্র“ত, সহিংসতা, কারচুপি ও প্রহসন পুরোপুরি পূর্ণ করেছে। এখন দেখার সময় বাংলাদেশ কত টুকু ডুবে”। নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সং¯’া ঐঁসধহ ৎরমযঃং ধিঃপয এর বিবৃতিতে বলেন “আওয়ামীলীগ নিজেকে দেশের শীর্ষ¯’ানীয় রাজনৈতিক দল দাবি করলেও যেভাবে সমালোচকদের উপর নিপীড়ন চালা”েছ তাতে গণতন্ত্রের বিন্দু মাত্র নেই”। তারা আরো বলেন “গণ গ্রেফতার ও ভিন্নমত দমন বন্ধ করে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহবান জানান।” 
উপরোক্ত তথ্য গুলো থেকে প্রতিয়মান হয় যে, এই নির্বাচনকে তারা শুধুমাত্র বর্জন করেননি। তারা এই নির্বাচনকে চরমভাবে প্রত্যাখান করেছেন। দেশের সুশীল সমাজ ও এই নির্বাচনকে প্রহসন ও সম্পূর্ণ সরকারী নাটক বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই সব আলোচনার  মাধ্যমে বুঝা যায় বাংলাদেশের অব¯’ান। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে বন্ধুবিহীন ও একাকিত্ব হয়ে পড়েছে। আর যখন সম্পূর্ণ এককিত্ব হয়ে পড়বে তখন হয়তো বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। কেননা এখনো বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া অচল। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি ক্ষতিগ্র¯’ হয় তাহলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে প্রতিবেশি ভারত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় বাংলাদেশের তৈরী পোষাক,  শ্রম বাজার ও বিনিয়োগ চলে যা”েছ ভারতে, নিশ্চয় এক্ষেত্রে ভারত লাভবান। 
উপরোক্ত আলোচনা ও তথ্য থেকে প্রতীয়মান নয় কি? বাংলাদেশের গণতন্ত্র শুধুই বিপন্ন নয় বরং ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের কবর রচিত করেছে এবং স্বাধীনতাকে করেছে ক্ষুন্ন এবং বাংলাদেশকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দি”েছ যা থেকে উত্তরণের পথ সহজ নয়। 
লেখক
ছাত্র নেতা ও সংগঠক।
মোবাইল- ০১৬৭৭-৬৮০২৬৪