ঢাকা: জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬টি ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধান ও আরপিও’র বিধানে সাংঘর্ষিক হওয়ায় হাইকোর্ট থেকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে জামায়াতের নিবন্ধন।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া জামায়াতের সংশোধিত গঠনতন্ত্রে যেসব ধারার সঙ্গে সংবিধান ও আরপিও’র সঙ্গে যে ছয়টি ধারা সাংঘর্ষিক সেগুলো হলো- জামায়াতের গঠনতন্ত্রের মৌলিক আকিদা বিভাগের ২(৫) ধারায় লেখা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজস্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না, কেননা স্বীয় সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকার আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারও নাই।’
জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ২(২) ধারার বিষয়েও আপত্তি রয়েছে ইসি’র। ওই ধারায় লেখা হয়েছে, ‘সকল প্রকার ক্ষমতা ও এখতিয়ার একমাত্র আল্লারই।’
সংগঠনটির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অনুচ্ছেদের ধারা ৩-এ লেখা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।’
দাওয়াত অনুচ্ছেদের ৫(৩) ধারায় লেখা হয়েছে, ‘সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।’
স্থায়ী কর্মসূচি অনুচ্ছেদের ধারা ৬(৪)-এ লেখা হয়েছে, ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও চরিত্রবান লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।’
রুকন হওয়ার শর্তাবলি সম্পর্কে ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ব্যক্তিগত জীবনে ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করেন এবং কবীরা গুনাহ হইতে বিরত থাকেন।’
২০১৩ সালের মার্চে গঠনতন্ত্রের সর্বশেষ সংশোধনী পর্যালোচনা করে এই ৬টি ধারা সংবিধান ও আরপিও-বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে ইসি। এরপর কমিশন বৈঠকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন বাতিল করেনি কমিশন। তবে ২০১৩ সালের ২ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। এর ফলে দলটির নিবন্ধন নিশ্চিতভাবেই বাতিল হতে যাচ্ছে। দলের নির্বাচনী প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ ব্যবহার করে আর কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো ব্যক্তির উপরোক্ত রূপ সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার কিংবা উহার সদস্যই হইবার অধিকার থাকিবে না, যদি(ক) উহা নাগরিকদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (খ) উহা ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করিবার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; (গ) উহা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী বা জঙ্গি কার্য পরিচালনার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়; বা (ঘ) উহার গঠন ও উদ্দেশ্য এই সংবিধানের পরিপন্থী হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও’র ৯০ (জ) ধারায় বলা আছে, যদি কোনো দল বিলুপ্ত হয়ে যায় অথবা যদি কোনো দলকে সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে কিংবা কোনো দল যদি নির্বাচন কমিশনের কাছে পরপর তিন বছর তাদের তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হয় অথবা যদি কোনো দল পরপর দুটি সংসদীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে তাহলে তাদের নিবন্ধন বাতিল হবে। সেই সঙ্গে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে যেসব শর্ত আছে, যেমন কোনো দল যদি ধর্মীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ভাষাগত কিংবা লৈঙ্গিক বৈষম্য তৈরি করে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, তাহলেও কমিশন তার নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে। তবে কমিশন যদি কোনো দলের নিবন্ধন বাতিল করে, সেক্ষেত্রে ওই দল উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ পাবে।
দলের নিবন্ধন বাতিল করার বিষয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধিত) অ্যাক্ট-২০০৯ এর ধারা ৯০ এইচের ‘বি’তে বলা হয়েছে, সরকার কোনো দল নিষিদ্ধ করলে সেই দলের নিবন্ধন বাতিল করবে কমিশন। একই ধারার উপধারা ‘সি’তে বলা হয়েছে, দেশের সংবিধানের সঙ্গে কোনো দলের গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হলে সেই দলের নিবন্ধন থাকবে না বা নতুন করে নিবন্ধন পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আপিল করা হবে কি না জানতে চাইলে সিইসি বলেন, রায়ের কপি হাতে পেলেই সব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এর আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, নিবন্ধন অবৈধ হলে এ দলের প্রতীক নিয়ে কেউ নির্বাচন করতে পারবে না। তবে চাইলে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে পারবে। জামায়াতের দুই সংসদ সদস্যের বিষয়ে কী হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগে পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে নিই তারপর বলব।
উল্লেখ্য, ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটি তিনবার নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও এই প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হতে যাচ্ছে। এর আগে ১৯৫৯, ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান আমলে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর অন্য ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়। সাত বছর পর ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশে প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন সামনে রেখে ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর জামায়াতকে সাময়িক নিবন্ধন দেয় ড. এটিএম শামসুল হুদার কমিশন।
- See more at: http://www.bengalinews24.com/national-&-special-news/2013/08/04/13680#sthash.6TypteUU.dpuf


0 Comments