শামছুজ্জামান সেলিম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজকাল দারুণ সব ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনাকে 'অদ্ভুত' বলাই মনে হয় শ্রেয়। অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের 'জিএসপি' (জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্স) সুবিধা স্থগিত করে দিয়েছে। এই
'স্থগিত' করা নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে অদ্ভুত সব বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের 'অংশ' হয়ে গেছেন 'বিখ্যাত(!)' ইউনূস সাহেবও।'রানা প্লাজা ধসের' পর থেকেই শোনা যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাজারে বাংলাদেশের 'জিএসপি' সুবিধা বাতিল করবে। এ ব্যাপারে 'মজিনা' ঘন ঘন ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল জিএসপি বাতিল হতে যাচ্ছে। 'সংসদে' বিতর্ক হলো। প্রধানমন্ত্রী বললেন, বিরোধীদলের নেতা খালেদা জিয়া নিউওয়ার্ক টাইমসে নিবন্ধ লিখে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে 'জিএসপি' বাতিল করার আবদার করেছিলেন। খালেদা জিয়া যথারীতি এই অভিযোগ বাতিল করে দিলেন! অথচ বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর সব ওয়াকিবহাল মহলই জানেন ওই নিবন্ধ খালেদা জিয়াই লিখেছিলেন। বিএনপি এখন বলছে, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চিঠি লিখবে 'জিএসপি' আবার চালু করার জন্য (গরু মেরে জুতা দান)! আর সেই 'পৃথিবী খ্যাত ব্যক্তিত্ব' যুদ্ধ জয়ের হাসি দিয়ে বলছেন, এ ব্যাপারে তার কিছুই করার নেই!! কে না জানে, হিলারি ক্লিনটন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন ইউনূসের পক্ষে এবং হুমকি দিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। খালেদা চেয়েছিলেন সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য 'জিএসপি' বাতিল করতে। আর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাকে অপসারণের জন্য প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। খালেদা এবং ইউনূস, দুজনই এখন দারুণ 'হ্যাপি'! খালেদার 'লক্ষ্য' আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। অপরদিকে ইউনূসের 'লক্ষ্য' গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়া। অভিজ্ঞ মহল বলেন, ইউনূসের আছে আরও 'সুদূরপ্রসারী' লক্ষ্য।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে 'জিএসপি' সুবিধা পাওয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ জড়িত। অথচ দুজন ব্যক্তি (যাদের সঙ্গে সরকারের ঝগড়া রয়েছে) তাদের ব্যক্তি স্বার্থে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার পথ বেছে নিলেন! এ পর্যন্ত রাজনীতির অঙ্গনে 'দেশপ্রেম' বলে চালু থাকা 'ধারণার' এখন কি হবে? এই ঘটনা থেকে জাতি কি এ শিক্ষা নেবে যে, ক্ষমতার 'শিখরে' পৌঁছে গেলে ব্যক্তি স্বার্থে যা খুশি তাই করা যায়! হায় দেশপ্রেম!! এখান থেকে বাংলাদেশের জনগণ এই শিক্ষাই পেতে পারেন যে, তাদের 'বন্ধুর(!)' স্বার্থে কোন ছোট রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে পাত্তাই দেয় না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অভাগা এই দেশের বিশাল বিশাল 'বুদ্ধিজীবী' এবং 'সুশীল সমাজ' এই প্রশ্নে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন! যারা ইউনূসকে নিয়ে মাতামাতি করেন তাদের কাছে 'দেশপ্রেম এবং জাতির স্বার্থের' কি কোন দাম আছে? ওরা বলেন, 'রাখত তোমাদের এই ফালতু ইমোশান'!
এবার সোজাসুজি একটা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'বন্ধু' কারা হতে পারে? যদুমধু তো আর মার্কিনিদের 'বন্ধু' হতে পারে না। 'সুপার পাওয়ার' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'বন্ধু' সেই হতে পারে, যে তাদের শাসকশ্রেণীর স্বার্থ নিখুঁতভাবে রক্ষা করতে পারে। 'টিকফা চুক্তি' স্বাক্ষর করলেও তো মার্কিন শাসকশ্রেণীর স্বার্থ 'নিখুঁতভাবে' রক্ষা হয়। তাহলে বাংলাদেশে এই 'দুমুখী খেলা' খেলছে কেন মার্কিনিরা? এ যাবৎকালের মধ্যে এ প্রশ্নের সেরা উত্তরটা বোধহয় দক্ষিণ ভিয়েতনামের এক কালের প্রেসিডেন্ট নগো দেন দিয়েমের ভ্রাতিবধূ দিয়েছেন। মার্কিনিদের প্রাণের দোস্ত 'দিয়েমকে' যখন মার্কিনিরাই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল, তখন দিয়েমের ভাই নেনো দিন নু-এর স্ত্রী মাদাম নু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'আমেরিকা যার বন্ধু হয়, তার শত্রুর দরকার পড়ে না'! সে যাই হোক, বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ইতিহাসের এই অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেবে না। বাংলাদেশের জনগণ কি একেবারেই দিশাহারা হয়ে গেছে! ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের মুহূর্তে আমেরিকা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে রক্ষার জন্য সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। ভাগ্যিস, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল। পদগোর্নির এক ধমকেই সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে ঢোকা হলো না। আমরা স্বাধীনতা পেলাম। ভাগ্যের কি পরিহাস, এখন সেই বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর ঢোকে নির্বিঘ্নে! ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই বীভৎস হত্যাকা-ের কথা তো বাঙালি জাতি জানে। এর থেকে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাও শিক্ষা নিলেন না। জাতির দুর্ভাগ্য, আজ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বসে আছেন আমেরিকার 'বন্ধুরাই'! আর বাঙালি জাতি? জানি না ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়ানো বাঙালি জাতি এই প্রশ্নের উত্তর দেবে কিভাবে! তবে এ কথা ঠিক, জাতি আজ লক্ষ্যহীন শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, নীল আকাশে 'কেটে যাওয়া' ঘুড়ির মতো! তা না হলে, সাম্প্রতিক সময়ে 'গুরুত্বপূর্ণ' সব নির্বাচনে বিএনপি কেমন করে জেতে!! নিকট ভবিষ্যতে নাকি বিএনপি-জামায়াত এদেশে সরকার গড়তে যাচ্ছে? আওয়ামী 'কলামিস্টরা' আজকাল কলম মুখে নিয়ে চিবুচ্ছেন।
গাজীপুর থেকে আমার এক বন্ধু সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ক্যাম্পেইন সম্বন্ধে ফোনে বেশকিছু মজার ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেলেন। হেফাজতিরা বিএনপির প্রার্থী মান্নানের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন। তার বিবরণটা হুবহু তুলে দেয়ার চেষ্টা করছি। হেফাজতিরা একজন ভোটারকে বলছেন, ভাই আপনি মুসলমান? হ্যাঁ সূচক উত্তর পেয়ে বলছেন, তাহলে আলেম ওলামাদের আপনি সম্মান করেন? পুনরায় হ্যাঁ সূচক উত্তর পেয়ে সরকার যে মতিঝিলে এদেশের আলেম ওলামাদের ওপর অত্যাচার করেছে, অপমান করেছে, জেলে পুড়েছে তা আপনি শুনেছেন? এবারও ইতিবাচক উত্তর পেয়ে মহাউৎসাহে বলছেন, আলহামদুলিল্লাহ! তাহলে তো আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়া যায় না, কি বলেন? এসব শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মুসলমান হেফাজতি মাওলানা সাহেবকে জিগ্যেস করেন; হুজুর, একজন মুসলমান কি আল কোরআন পোড়াতে পারেন? উত্তরে হুজুর বলেন, নাউজুবিল্লাহ! ৫ মে তারিখে আপনারা তো বায়তুল মোকাররমের সম্মুখে আল কোরআন পুড়িয়েছেন? রাস্তার গাছ কেটেছেন, বিল্ডিংয়ে আগুন দিয়েছেন? হজুর এবার তড়িঘড়ি বললেন, মিথ্যে কথা। প্রশ্নকারীও নাছোড় বান্দা। বললেন, হুজুর আমরা টেলিভিশনে দেখেছি। এরপর হেফাজতি হুজুর দ্রুত কেটে পড়েন।
বিএনপি নেতা, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ প্রার্থী আবদুল মান্নান সাহেব ১৯৯২ সালে বিএনপি সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। হজের পাঁচশ' কোটি টাকা 'মেরে দেয়ার' অভিযোগে মান্নান সাহেবকে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই মান্নান সাহেবের পক্ষে তথাকথিত 'ইসলাম হেফাজতকারী' হেফাজতে ইসলামের হুজুররা 'ইসলাম ইস্যু' নিয়ে ভোট চাচ্ছে! সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে, এখানে না আছে 'ইসলাম', না আছে 'দেশপ্রেম'!! শাহবাগের কোন একজন তরুণের বিরুদ্ধে যদি কোরআন পোড়ানোর অভিযোগ উঠত তাহলে এই হেফাজতিরা সারাদেশে আগুন জ্বালিয়ে দিত। 'মুরতাদ' ঘোষণার ফোয়ারা ছুটত কই, এখন তো হেফাজতিদের 'মুরতাদ' ঘোষণা করা হচ্ছে না!! তাহলে মুসলমানরা কি বুঝে নেবে তথাকথিত ইসলামী দলের পক্ষ থেকে 'মুসলমানি লেবাস' পরে কোরআন পোড়ালে কোন অপরাধ হয় না!!! এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সব মানুষের রুখে দাঁড়ানো উচিত ছিল। সরকার এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এটাই স্বাভাবিক ছিল। বাস্তবে দেখা গেল সরকার কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে দ্রুত পিছু হটে গেল। শুধু পিছু হটেই শেষ হলো না, উল্টো এই 'হেফাজতিদের' তোয়াজ করতে শুরু করল সরকার! দেশ, জাতি, জনগণ ও সংবিধানের প্রতি কোথায় রইল দায়বদ্ধতা? প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপি হওয়ার পর যে 'শপথ' নিয়েছিলেন তারা তা রক্ষা করেছেন কি? উচিত ছিল এই 'হেফাজতিদের' নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। উল্টো স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ অপরাধ করার পর 'হেফাজতিরা' পুরস্কৃত হচ্ছে! এ ঘটনার পর ওদের যেন 'কদর' বেড়ে গেছে!! ভোটের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগাররাও দাবি করছে 'হেফাজতিরা' তাদের পক্ষে আছে!!! এখানে দেশপ্রেম কোথায়? 'ক্ষমতার' জন্য যা খুশি তাই করা যায়??
'জিএসপি' বাতিল, পদ্মা সেতু প্রকল্পে 'দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের(!)' জন্য ঋণ বাতিল করে দেয়া, সবই মার্কিন 'স্ট্যাটেজিক স্বার্থের' অংশ। ওরা অজুহাত দেখাল রানা প্লাজা ধস, আবুল হোসেন গংদের 'ষড়যন্ত্র' এবং ইউনূসর 'গ্রামীণ ব্যাংক'! আর আমাদের 'শিক্ষিত সুশীল সমাজ(!)' ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করলেন! বলতে লাগলেন, আহা, মার্কিনিরা কী নীতিবান!! ওরা না থাকলে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর যে কী হতো!!! এটা তো খুবই সরল সহজ বিবেচনা যে, আমার দেশের সমস্যা আমরা সমাধান করব। যদি তা না হয়, তাহলে জনগণকে সংগঠিত করে আন্দোলন করব, প্রয়োজনে সরকার পরিবর্তন করবথ সবই করা যায় জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মবিশ্বাস থাকলে, দেশপ্রেম থাকলে। আমরা কি ১৯৭১ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে দক্ষ দাবিদার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে পারিনি? সবচেয়ে বিড়ম্বনার বিষয় তখনই হয়, দেশপ্রেম যারা শেখায় তারাই যখন প্রকাশ্যে দেশদ্রোহিতা করে। শুধু করেই ক্ষান্ত থাকে না, নিজেদের 'জাতীয় বীর' বলে জাহির করতে থাকে! জানি না জাতি এই সংকট থেকে কবে বেরিয়ে আসবে!!

0 Comments