বিপ্লব বিশ্বাস
রাজধানীতে এক শ্রেণীর নারী পাচারকারী দালাল চক্রের রাহুগ্রাসে জিম্মি হয়ে দিনের পর দিন অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের গৃহবধু চার দেয়ালে বন্দী করে ভোগের পণ্য হিসেবে
ব্যবহার করা হচ্ছে। কঠোর প্রহরা বেষ্টিত এসব বন্দীশালা থেকে নির্যাতিতরা পালাতে চাইলেও নারী ব্যবসায়ীদের পালিত গুন্ডাদের কারণে পালাতে পারে না। এসব গুণ্ডারা তাদের ধরে এনে নানাভাবে শারিরীক নির্যাতন করে। এক সময় তারা বাধ্য হয় অনৈতিক কাজে। নির্যাতিতাদের শুধু বাসা-বাড়ি নয় বিভিন্ন আবাসিক হোটেলেও তাদের সরবরাহ করে এই দালাল চক্র।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও অসাধু কিছু পুলিশ কর্মকর্তার ছত্রচ্ছায়ায় চালানো হচ্ছে এসব অনৈতিক কর্মকান্ড। প্রশাসনের কাছে নির্যাতিতরা লিখিত অভিযোগ করলেও কার্যত নেই কোন পদক্ষেপ। ফলে এসব এলাকার চার দেয়ালে এখন মুখ বুজে যেন নরক যন্ত্রণা ভোগ করছে শত শত অসহায় শিশু ও নারীরা।
জানা গেছে, প্রলোভনের মাধ্যমে মেয়েদের সংগ্রহ করে যারা সরবরাহ করে, তারা এ ব্যবসায় দালাল হিসাবে পরিচিত। দেশের প্রত্যন্তাঞ্চাল থেকে চাকরি দেয়া, বিয়ের প্রলোভন, প্রেমর ফাঁদে ফেলাসহ নানা কৌশলে কিশোরী ও উঠতি বয়সের মেয়েদের সংগ্রহ করে এসব দালালদের মাধ্যমে ঢাকায় আনা হয়। এর পর ফুসলিয়ে কিংবা জবরদস্তি করেই ফ্লাটে খদ্দেরদের রুমে কিংবা আবাসিক হোটেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। কোন মেয়ে এই অনৈতিক কাজে রাজি না হলে আটকে রেখে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এছাড়া রাজি না হওয়া মেয়েদের হতে হয় গ্যাং রেইপের শিকার এবং সেই দৃশ্য ধারণ করা হয় ক্যামেরায়। এ রকম গ্যাং রেইপ বা পুরো নগ্ন করে ভিডিও করার কারণে কোন মেয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে পারে না। তখন দলাল রূপী হিংস্র মানুষগুলোর আঙ্গুলের ইশারার কাছেই জিম্মি হয়ে পড়ে দুর্ভাগ্যের শিকার এসব মেয়েরা। কোন মেয়েকে অনৈতিক কাজে কোনভাবেই রাজি করাতে না পারলে দালালরা বাসা-বাড়ি কিংবা হোটেল মালিকদের মাধ্যমে পুলিশের সহায়তাও নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ আকস্মিক অভিযান চালিয়ে অনৈতিক কাজে রাজি না হওয়া মেয়েদের হোটেল থেকে অন্যান্য খদ্দের ও পতিতার সাথে একত্রে আটক করে জেলে পাঠায়। টাকার কাছে পুলিশও বিক্রি হয়ে যায়। এরপর দালালরা আত্মীয়স্বজন পরিচয়ে কোর্ট থেকে জামিনে এনে আবার এদের হোটেলে এনে তোলে। ফলে তাদের অনৈতিক কাজে নামাতে আর কোন বেগ পেতে হয় না তাদের।
হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেলথ ফাউন্ডেশন’ থেকে জানা যায়, এক বছর আগে প্রতারক সাগরের (কবিরের) প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে নারগিস (১৪) নামের একটি মেয়ে আটকে যায় নারী ব্যবসায়ীদের জালে। নার্গিস তার ছদ্মনাম। অবশেষে ২৪ অক্টোবর বুধবার দুপুরে ‘হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেলথ ফাউন্ডেশন’ নামক মানবাধিকার সংগঠন ও মুগধা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে মানিক নগরের ৬৬ নম্বর বাড়ি থেকে নারী পাচারকারীদের কবল থেকে নারগিসকে উদ্ধার করে। এ সময় নারী পাচারকারী নিলুকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে নারগিসের দেয়া তথ্য মতে নারী শিশু পাচারকারী চক্রের সদস্য সবুজ (৩০), সাগর (২৭) ও সোমাকে (২৫) পূর্ব মানিক নগর এলাকা থেকে আটক করে মুগদা থানা পুলিশ।
নারগিস জানায়, সে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করার সময় সাগরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত বছর কোরবানীর ঈদের আগে সাগর তাকে নারী ব্যবসায়ী নিলুর কাছে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে সে জানতে পারে, ওই প্রতারক প্রেমিক তাকে নিলুর কাছে বিক্রি করে গেছে। এরপর থেকে নিলুর অঘোষিত পতিতালয়ের পণ্য হিসেবে নিয়মিত ব্যবহার হতে হয় তাকে। প্রতিদিন তাকে মেটাতে হতো, কমপক্ষে ১০ জনের যৌন চাহিদা। শারীরিক কোনো অসুস্থতায়ও বন্ধ থাকতো না ওই যৌন ববর্রতা। নিলুর রক্ত চক্ষু এবং আরো নির্যাতনের ভয়ে মুখবুজে সহ্য করতে হয় যৌন নির্যাতন।
নারগিস আরো জানায়, সে একাই নয়, রামপুরা বনশ্রী, বাড্ডা ডিআইটি প্রজেক্ট, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, বনানী, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও এলাকায় একই ধরনের অপরাধীদের শতাধিক ‘মধুকুঞ্জে’ বন্দী রয়েছে আরো অসংখ্য শিশু ও যুবতী নারীরা। বনশ্রী ও রামপুরার ঘরে ঘরে প্রতিনিয়ত চলে এসব শিশুদের আহাজারি। স্থানীয় পুলিশ ম্যানেজ থাকায়, ওইসব শিশুদের কোনো আর্তনাদ ঘরের বাইরে বের হয় না।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের এডিসি (পশ্চিম) শহিদুল হক জানান, রামপুরা বনশ্রী এলাকার বাসা বাড়িতে অনৈতিক কর্মকান্ড চালানো হয় এমন তথ্য আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
হিউম্যান রিসোর্স এন্ড হেলথ ফাউন্ডেশনের মহাসচিব মো. আলমগীর জানান, বনশ্রীর অধিকাংশ বাড়ি এখন পতিতা-পল্লী ও নারী পাচারকারীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। বনশ্রী ও এর আশপাশের এলাকা এখন ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে দ্বিতীয় টানবাজার পতিতা-পল্লি হিসেবে। সম্প্রতি নারী শিশু পাচার এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক নারী-শিশুদের জোর করে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগে পৃথক কয়েকটি আবেদন জমা পড়ে তার দপ্তরে।

0 Comments