ফাহমিদা আহমদ
চলতি বর্ষা মৌসুমে দেশে মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গত মৌসুমের চেয়ে বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রবল বৃষ্টিপাত এবং স্বল্প সময়ে উজানে একাধিক বন্যার ফলে এ বছর বাংলাদেশেও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা
করছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বন্যা সতর্কিকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য-উপাত্ত এবং উজানের দেশগুলোর নদী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানা যায়, বাংলাদেশে, ভারত, নেপাল ও চীনে অতিবর্ষণ, আগাম বন্যা, ঘন ঘন নি¤œচাপ, ঘূর্ণিঝড় ও আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে এবার আগাম বন্যা ভয়ানক রূপ ধারণ করতে পারে। ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের প্রকোপে সৃষ্ট বন্যায় ইতিমধ্যে তলিয়ে গেছে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা। উজানের দেশ চীনের সিচুয়ান প্রদেশে একদফা বন্যা হয়েছে। ভারতেও বন্যা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র ও অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে দেশটির আরও বেশ কিছু এলাকায় বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে। পূর্বাভাসে চলতি বর্ষা মৌসুমে গঙ্গা অববাহিকায় একাধিক বন্যার শঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ইতিমধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারে দেশের উপকূলীয় এলাকার নদনদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারী বর্ষণ। এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
উপকূলীয় জেলা এলাকাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এদিকে সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় দেশের সমুদ্র বন্দরগুলোকেও সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে নদনদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে অনেক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে বেড়িবাঁধের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প। সমুদ্র উপকূল সংলগ্ন উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমী বায়ু জোরদার অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে প্রবল বর্ষণে দফায় দফায় প্লাবিত হচ্ছে দেশের চর, উপকূল ও দ্বীপাঞ্চল। টানা বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জেলায় যে বন্যা দেখা দিয়েছে। তাতে হাজার হাজার বসতবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা তীব্র ঢলে শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও চলাচলের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েক হাজার একর মৎস্য ঘেরের মাছ ঢলের সাথে ভেসে গেছে। নদী ও খালসমূহ উজানের পাহাড়ি ঢলে টইট¤ু^র হয়ে উঠায় বৃষ্টির পানি লোকালয়ে জমে আছে। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, সেই সাথে উজান থেকে নামছে পানি। উজান থেকে নেমে আসা পানি এবং বৃষ্টির পানি মিলে দেশের নদনদীগুলোতে পানি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। সাগর উত্তাল থাকায় নদীর পানি নামতে পারছে না। গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, মহাসেন চলে গেলেও বঙ্গোপসাগরে আরো ৬টি নি¤œচাপ সৃষ্টি হবার আশঙ্কা রয়েছে।
এসব নি¤œচাপের কারণে দেশের মধ্যে বেশিমাত্রায় বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে এবার নদী ভাঙনের প্রবণতা গত বছরের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। এতে করে ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষের মধ্যে হাহাকার দেখা দিয়েছে। উজানের পানি একযোগে বাংলাদেশে প্রবেশ করায় রাতারাতি বিভিন্ন নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে গেছে। ভেসে গেছে বসতবাড়ি, আবাদী জমি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিজ, কালভার্ট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। সরকারি, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় ১ লাখ ২৫০ স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে পড়ে। এর ফলে দেশের ৬৮ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। এমনিতেই আমাদের নদীগুলো বছরের পর বছর পলি জমে নাব্যতা হারিয়েছে। এ অবস্থায় উজান থেকে নেমে আসা ও অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির পানি যোগ হয়ে বন্যা অবধারিত। চলতি বর্ষায় প্রচ- ঝুঁকির মুখে রয়েছে হার্ড পয়েন্টের উজানে ও ভাটিতে নির্মিত ক্রসবারগুলো। পাইলট ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় যমুনা নদী খনন করা বালি দিয়ে এই ক্রসবার নির্মাণ করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমেই পুনরুদ্ধার করা হয় বর্তমান বাজার দরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ভূমি। আরো আড়াই হাজার কোটি টাকার ভূমি পুনরুদ্ধার হবে এই বর্ষা পাড়ি দিতে পারলেই। এমন আশা জাগানিয়ায় প্রকল্পটি টিকাতে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী কাজের জন্য প্রয়োজন ২৪ কোটি টাকা, আর স্থায়ীভাবে ক্রসবারগুলো রক্ষায় প্রয়োজন ২৫৪ কোটি টাকা। এজন্য রিভাইস ডিপিপি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। পাইলট ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের আওতায় যমুনা নদী খননের জন্য মূল ডিপিপিতে এটি কমিয়ে এক হাজার ২২ কোটি টাকা করা হয়েছে। ক্রসবার নির্মাণ ও এর রক্ষণাবেক্ষণের সমুদয় অর্থ ধরেই এই রিভাইস ডিপিপি তৈরি করা হয়েছে। একনেকের বৈঠকে গত ২ জুলাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
এদিকে ভয়াবহ হুমকির মুখে রয়েছে দেশের উনিশটি জেলার উপকূলীয় বেড়িবাঁধ ও পোল্ডারসমূহ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে সমুদ্র পানির তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়া, ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানির ব্যাপকতা এবং পানির থারমাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে এই হুমকি দেখা দিয়েছে। এর ফলে আগামী ৩০-৪০ বছরের মধ্যে উপকূলীয় এলাকার ৫ হাজার ৭শ’ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পুরোটাই ডুবে যাবে। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এসব জেলার ১৩৯টি পোল্ডারের সবগুলোই। এসব পোল্ডারের ভেতর রয়েছে কমপক্ষে ১২ লাখ হেক্টর জমি, এই অবস্থা উত্তরণে জরুরি পদক্ষেপ না নেয়া হলে জানমালসহ সম্পদ ও ফসলের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা বাড়তেই থাকবে। এ জন্য উপকূলীয় এলাকার পুরো বেড়িবাঁধই বর্তমান উচ্চতা থেকে আরো ২ মিটার পর্যন্ত উঁচু করতে হবে। উপকূলীয় এলাকার উপর পরিচালিত সমীক্ষায় বিশ্বব্যাংক ও নেদারল্যান্ড এমন মতামতই দিয়েছে। এ ব্যাপারে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অভিমত সরকারের পক্ষে উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধ নতুন করে নির্মাণ সম্ভব নয়। নতুন করে বেড়িবাঁধ নির্মাণে প্রচুর অর্থেরও প্রয়োজন। যা সরকারের পক্ষে জোগান দেয়া কঠিন। এমনিতেই ব্যাপক অর্থ সংকটে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। ফলে পাউবোর পক্ষে উন্নয়ন কাজ তো দূরের কথা, মেরামত কাজই ঠিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন দুরবস্থার মধ্যেই চলছে পাউবো। জরুরিভাবে মেরামত মঞ্জুরী বৃদ্ধি করা না হলে এই বর্ষায় উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙন প্রতিরোধ ও কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া পাউবোর পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে, এ নিয়ে সবচেয়ে সমস্যায় পড়বেন পাউবোর মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা। বাংলাদেশে বন্যা নতুন কোন ঘটনা নয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, আমাদের নদীগুলো বছরের পর বছর পলি জমে কাক্সিক্ষত নাব্যতা হারিয়েছে।
এ অবস্থায় উজানের পাহাড়ি ঢল ও অভ্যন্তরীণ বৃষ্টির পানি যোগ হয়ে ব্যাপক বন্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে উজান থেকে নেমে আসা নদীর পানি যেন জনপদে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলোর হাল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার এখনই সময়। আবার যেসব নদীর পানি কূল ছাপিয়ে জনপদে প্রবেশ করার আশঙ্কা রয়েছে সেখানে বাঁধ না থাকলে জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। বাঁধগুলো যেন ¯্রােতের আঘাত প্রতিরোধ উপযোগী হয় এবং নির্মাণ কাজে কোন প্রকার দুর্নীতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বেড়িবাঁধগুলোর বেশিরভাগই দুর্নীতির কারণে যথাযথভাবে নির্মিত হয়নি। বন্যার কুফলের আরেকটি দিক হচ্ছে, নদীভাঙন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে নদীভাঙন সবচেয়ে ক্ষতিকর। নদীভাঙন প্রবণ এলাকাগুলোতে এখনই পর্যাপ্ত ভাঙনরোধী টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যমান বাঁধগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার এখনই করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে বাঁধ সংস্কারে এক ধরনের হিড়িক পড়ে যায়। প্রবল বর্ষণ ও ঢেউয়ের তোড়ে বর্ষা মৌসুমে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়সাপেক্ষ অথচ এক ধরনের মুনাফালোভী ঠিকাদার এ সময়টাকেই সংস্কারের জন্য বেছে নেয়। এতে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল টাকা গচ্চা যায়, অন্যদিকে জনদুর্ভোগেরও শেষ থাকে না। লাভের লাভ হয় মুনাফালোভী অর্থলিপ্সু ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বন্যার কারণে পানিবাহিত রোগ মরাত্মক আকার ধারণ করে। এ সময় পানিবাহিত রোগ যেন ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য বন্যাপ্রবণ এলাকায় পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম পূর্ব থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে ত্রাণ সাহায্য পায় সেজন্য সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলে সবুজ বেষ্টনীর মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সম্ভব। সরকারকে এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভূপ্রাকৃতিক কারণে বন্যা অবশ্যম্ভাবী। এটি এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা রোধ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের হাতে নেই। তবে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনসহ ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

0 Comments