ডেস্ক রিপোর্ট
আওয়ামী লীগ সরকারের বদৌলতে থলে ভরে বাজার করা অনেক আগেই গল্পের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তো বটেই, মধ্যবিত্তরাও আজকাল বাজারে যাওয়ার কথায় রীতিমত আঁতকে উঠছেন,
আতঙ্কিত হচ্ছেন। এর কারণ নিশ্চয়ই উল্লেখের প্রয়োজন নেই। ক্ষমতাসীনরা লম্বা আশ্বাসের কথা শোনালেও এবং মাঝেমধ্যে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে ধমক উচ্চারণ করলেও এ সরকারের প্রাথমিক দিনগুলো থেকে পণ্যের মূল্য সেই যে আকাশের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছিল তার আর নিচের দিকে নেমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। মূলত লোকদেখানো ছিল বলেই মন্ত্রীদের ধমকে কোনো কাজ হয়নি। বরং মন্ত্রীরা যতবার ধমক দিয়েছেন ততবার দাম বেড়ে গেছে আরও কয়েক দফা। ফলে মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ধমক দেয়ার অভিনয় করার অভিযোগ উঠেছে। এদিকে রমজান শুরু না হতেই বাজারে গিয়ে জিহবা বেরিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। দৈনিক আমার দেশ-এর এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, বাজারে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজির নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না। মাছ কিনতে গেলে কম করে হলেও চার-পাঁচশ’ টাকা গুনতে হচ্ছে। মাংসের মধ্যে সবচেয়ে কম দাম ব্রয়লার মুরগির। কিন্তু এরও দাম মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৬৫/১৭০ টাকা। খাসির গোশত ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, গরুর গোশত ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা, দেশী মুরগি ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মুরগির ডিমের হালি উঠে গেছে ৩৫ টাকায়। সবজির বাজারেও এখন আগুনের উত্তাপ। ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজের দাম এক সপ্তাহের মধ্যে বেড়ে হয়েছে ৪৫ টাকা। ৬০ টাকার কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকায়। আদা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, রসুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা। ওদিকে ছোলা, সয়াবিন ও চিনিসহ রমজানে বেশি ব্যবহৃত প্রতিটি পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ছে বেশ কিছুদিন ধরেই। পাঁচ লিটার সয়াবিনের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৬৪৫ থেকে ৬৬০ টাকায়। সাধারণ মানের ছোলাও ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। ভালো মানের ছোলা কিনতে হলে এখনই ৯০ থেকে ৯৫ টাকা গুনতে হচ্ছে। একই অবস্থা অন্য সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরও। ৪০ থেকে ৪৬ টাকার কমে সাধারণ মানেরও কোনো চাল পাওয়া যাচ্ছে না। আর নাজিরশাইল ধরনের চাল কিনতে হলে প্রতি কেজির জন্য পকেট থেকে ৫০ থেকে ৫৬ টাকা পর্যন্ত বেরিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এতটাই ভীতিকর হয়ে পড়েছে। তা সত্ত্বেও মানুষকে বাজারে যেতেই হচ্ছে। কারণ, বাসায় খাওয়ার জন্য সবাই হা করে অপেক্ষায় আছে। অথচ বাজারে গিয়ে বেশি দাম দেয়ার সাধ্য নেই তাদের।
সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি দেখে বলার উপায় নেই যে, দেশে সত্যি কোনো সরকার রয়েছে। কারণ, কোনো পণ্যের দামই রাতারাতি বাড়েনি। বেড়ে আসছে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে। কিন্তু কোনো পর্যায়েই ধমক দেয়ার এবং লম্বা আশ্বাস ও গালগল্প শোনানোর বাইরে মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি এ সময়ের ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও সরকারকে তেমন নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। মন্ত্রীরা বড়জোর ধমকের পুনরাবৃত্তি করছেন। যেমন দু’দিন আগেও একাধিক মন্ত্রী বলেছেন, তারা নাকি ‘কঠোর নজরদারি’ করবেন! মন্ত্রীরা সেই সঙ্গে আরও একবার ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ ওপর দোষ চাপিয়েছেন। কিন্তু বলেননি, এই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রীদের তথা সরকারের অতি চমৎকার সম্পর্কের পেছনে ঠিক কোন বিষয়টি ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে ভূমিকা রাখছে। না হলে কথিত ‘কঠোর নজরদারি’ তারা এখনও শুরু করছেন না কেন? আর করে থাকলেও দাম লাফিয়ে বাড়ছে কেন? শুধু তা-ই নয়, এরই মধ্যে এই অভিযোগ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ‘অসৎ ব্যবসায়ীদের’ জন্য মুনাফা লুণ্ঠনের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়েই হঠাৎ করে মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা সরকার উল্টো প্রত্যাহার করেছে। ব্যবসায়ীরাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করছে যথেচ্ছভাবেই। আর সে কারণে দাম চলে যাচ্ছে মানুষের নাগালের বাইরে।
এভাবে পর্যালোচনায় অনস্বীকার্য হয়ে উঠবে, পণ্যের মূল্য তথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো সফলতাই দেখাতে পারেনি সরকার। সুচিন্তিত ঔদাসীন্যের আড়ালে সরকারের প্রশ্রয় বরং ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া করে তুলেছে, যার মাশুল গুনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের তো বটেই, নাভিশ্বাস উঠছে এমনকি মধ্যবিত্তদেরও। আমরা মনে করি, এখনও সময় রয়েছে। টাউট ব্যবসায়ীদের প্রশ্রয় ও সহযোগিতা দেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত কঠোরতার সঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ও পণ্যের মূল্য কমিয়ে আনা। চিনি, সয়াবিন ও ছোলার মতো জরুরি পণ্যগুলো ওএমএসের মাধ্যমে বিক্রির ব্যবস্থা নিলেও মানুষের উপকার হতে পারে। মনিটরিং করা এবং যথেচ্ছভাবে দাম বাড়ানোর কার্যক্রমকে প্রতিহত না করা গেলে পণ্যের দাম আরও বাড়তেই থাকবে এবং মন্ত্রীদের ‘কঠোর নজরদারি’র কোনো সুফলই মানুষ ভোগ করতে পারবে না। রমজানে মানুষকে বরং কোনোভাবে একবেলা খেয়ে রোজা রাখতে হবে।

0 Comments