Advertisement

‘পোশাককর্মীদের অসুস্থতার কারণ মানসিক’

পানি বা খাবারে বিষক্রিয়া থেকে নয়, মানসিক চাপ ও জটিলতা থেকেই গত কিছুদিনে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের বিভিন্ন পোশাক কারখানার বিপুল সংখ্যক শ্রমিক একযোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে মনে করছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) চিকিৎসকরা
তারা বলছেন, ‘সাময়িক’ এ মানসিক সমস্যা সাধারণ চিকিৎসাতেই ভালো হয়ে যায়।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাহমুদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কারখানাগুলোতে নিয়মিত কাউন্সিলিং ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে এ ধরনের সমস্যা রোধ করা সম্ভব।”
২০০৬ সালে একটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের ‘গণ অসুস্থতা’ দেখা দেয়ার পর বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করে আইইডিসিআর।
ইনস্টিটিউটের পরিচালক বলেন, “এ বছরই আমরা প্রথমবারের মতো পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে এ সমস্যা পেয়েছি।”
গত ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩০ শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাটি সারা দেশে পোশাক শ্রমিকদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
মাহমুদুর রহমান বলেন, মানসিক চাপ ও ভীতি থেকে এ ধরনের অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তার পরামর্শ, পোশাক কারখানার কর্মীদের সঙ্গে যেন কঠোর আচরণ করা না হয়।
এছাড়া পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এমন ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
গত ৫ জুন সকালে গাজীপুর সদর উপজেলায় লাবিব গ্রুপের স্টারলাইট স্যুয়েটার কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে হঠাৎ করে ঘন ঘন বমি ও পেটের পীড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এক পর্যায়ে চার শতাধিক শ্রমিককে একই ধরনের অসুস্থতার কারণে গাজীপুরের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায় কারখানা কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয় পুলিশ ও জেলার সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে সে সময় বলা হয়েছিল, কারখানার পানি খেয়েই শ্রমিকরা অসুস্থ হয়েছেন। এতো বেশি সংখ্যায় কর্মীর অসুস্থতার কারণে এর পেছনে নাশকতা থাকতে পারে বলেও সে সময় সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।
এরপর ১৮ জুন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় মাইক্রোফাইবার গ্রুপের লিবার্টি ও মিডল্যান্ড নিটওয়্যার কারখানার বেশ কিছু শ্রমিক একইভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। 
রাতের খাবার হিসেবে ডিম ও রুটি  খাওয়ার পর তাদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয় বলে সে সময় কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. দুলাল চন্দ্র চৌধুরী সে সময় বলেছিলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ‘ফুড পয়জনিং’ থেকে শ্রমিকরা এভাবে অসুস্থ হয়ে থাকতে পারেন।
এরপর গত ২৮ জুন সাভারের জামগড়া এলাকার ‘দ্য রোজ ড্রেসেস লিমিটেড’ কারখানায় দেড়শ শ্রমিক রাতের খাবার খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বমি, মাথা ব্যথা ও খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা যায় তাদের মধ্যে। কেউ কেউ সংজ্ঞাও হারান। কারখানা কর্তৃপক্ষ অসুস্থ কর্মীদের স্থানীয় হাসপাতালে পাঠায়।
৩০ জুন সকালে আবারো একই ঘটনা ঘটে। এবার হাসপাতালে পাঠানো হয় রোজ কারখানার তিন শতাধিক শ্রমিককে।
এরপর  ওই কারখানার পানির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য জাতীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি।
এর পরদিন সাভারের পুকুরপাড় এলাকার জে এল স্যুয়েটার কারখানার ৮০ জন শ্রমিককে হাসপাতালে পাঠানো হয় একই ধরনের অসুস্থতার কারণে। এবারো কারখানার খাবার ও পানির মান নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয় শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার আবারো অসুস্থ হন রোজ ড্রেসেসের কর্মীরা। এবার দুই শতাধিক কর্মীকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আইইডিসিআর পরিচালক মাহমুদুর জানান, বিভিন্ন কারখানা থেকে পাঠানো পানির নমুনা পরীক্ষায় কোনো ধরনের বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
“এ ধরনের অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রভাবিত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পানি শূন্যতায় একজন বা দুজন প্রথমে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাদের দেখে অন্যরাও অসুস্থ বোধ করতে পারেন।”
এছাড়া কারখানা ব্যবস্থাপনায় জড়িতরা যদি এসব ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হয়ে ‘অতি তৎপরতা’ দেখান, সেটি আরো নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। 
“পানিতে দূষণ ঘটেছে মনে করে তারা লাউড স্পিকারে শ্রমিকদের পানি খেতে নিষেধ করেছে। এতে আরো অনেক শ্রমিক অসুস্থ বোধ করা শুরু করেছেন।”
মাহমুদুর বলেন, ২০০৬ সালে মুন্সীগঞ্জের একটি স্কুলে এ ধরনের ‘গণ হিস্টিরিয়া’ দেখা যায়। পরের বছর দেশের বেশ কয়েকটি স্কুলে তা ছড়িয়ে পড়ে।
“আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৯ শতাংশই কিশোরী। শারীরিক বা মানসিক দুর্বলতা বা বিষণ্নতার কারণে তাদের এ সমস্যা হয়ে থাকতে পারে।”
এ ধরনের অসুস্থতা বিশ্বে ‘বিরল’ নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের মাসিক সমস্যার কারণে বমি, মাথা ব্যথা, ঝাপসা দেখা, শরীর ব্যথা, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হওয়া এবং কখনো কখনো খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পোরে।
সাভারে শ্রমিক অসুস্থতার ঘটনাটির অনুসন্ধানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এম মুশতাক হোসেন।

Post a Comment

0 Comments