ঢাকা: লক্ষ্মীপুর সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল কবে ঠিক মনে নেই। বোধ করি নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি। সেই সম্মেলনে কবি মতিউর রহমান মল্লিক ও আমি গিয়েছিলাম সম্মাননা নিতে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয় ইত্যাদি। তো মঞ্চে উঠে এলো একদল শিল্পী। তাদের হাতে ব্যানার। ব্যানারে লেখা—ইন্নালিল্লাহ বাস সার্ভিস। তারা গান ধরলো—
‘ইন্নালিল্লাহ মাইজদীর বাস
বোত্ বোত্ করি যায়,
কন্ডাক্টরে লডকি লডকি
হিসিঞ্জতার বুলায়।’
গান শুনে তো আমরা হেসে খুন। আরও হাসি পেল, যাকেই ওই বাস সার্ভিসে ওঠার জন্য বলা হচ্ছিল, সেই-ই সার্ভিসের নাম দেখে দে দৌড়। সে এক মজার কাণ্ড।
তো বহুদিন পর এই ইন্নালিল্লাহ বাস সার্ভিসের নাম মনে এলো বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের লেখা পড়ে।
আবারও তার কথা দিয়েই লেখা শুরু করতে হচ্ছে। গত ১৮ জুন সহযোগী এক পত্রিকায় তিনি তার ‘আলহামদুল্লািহ’য় লিখেছেন—“চার মহানগরে আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয়ে দয়াময় প্রভুর প্রতি গভীর বিশ্বাসে সব অন্তরাত্মা একত্র করে সব অস্তিত্ব দিয়ে উচ্চারণ করেছি ‘আলহামদুলিল্লাহ’। তবে ইন্নালিল্লাহ উচ্চারণের সুযোগও আমার পরম প্রভু অবশ্যই দেবেন।”—কথাগুলো পড়ে খানিকটা হেসে আমি জোরে জোরে বললাম ‘আমিন’। তারপর কথাগুলো ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল পার্লামেন্টে অপু উকিল নামে আওয়ামী লীগের জনৈক মহিলা সদস্য যে নোংরা, কুিসত, অশ্রাব্য, অসভ্য, অশ্লীল, হিংস্র, জঘন্য, শিষ্টাচারবর্জিত, বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে, তা শুনে দেশ-বিদেশ থেকে ত্যক্ত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, ব্যথিত ডজনডজন মানুষ ফোনে-ইমেইলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাদের বক্তব্য, এ ধরনের অসভ্য, অমানুষ জন্তু-জানোয়ারের দাঁত ভেংচি দেখার জন্যই কি আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলাম? রাষ্ট্রের টাকায় রাষ্ট্রনায়কদের বিরুদ্ধে এরকম ইতর ভাষা ব্যবহার করার জন্যই কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? আর কতদিন এদের সহ্য করতে হবে? ইত্যাদি।
একজন বললো, আওয়ামী লীগের জাতির পিতা মরহুম শেখ মুজিব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে একবার একজন ‘বঙ্গবন্ধু’ সম্বোধন ব্যবহার করেনি। এই অপরাধে তার জিহ্বা কেটে নিয়েছিল সেই সময়কার ‘বঙ্গবন্ধু সৈনিকরা’। এটা ’৭২-৭৫ এর কথা। বঙ্গবন্ধুর সেসব সৈনিকের অনেকেই এখন বয়োবৃদ্ধ প্রবীণ। অনেকে স্মৃতি রোমন্থন করে কাল কাটান। বশংবদ মিডিয়া তাদের দুঃখে মায়াকান্না কাঁদে। কারণ তাদের অনেকেই বর্তমান মহাজোট মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। তো তাদের অনুসারীরা তো আছে।
এই অনুসারীরা ‘বঙ্গবন্ধু’, শেখ হাসিনা (বেগম খালেদা জিয়ার দেশনেত্রীর অনুকরণে তিনি অবশ্য মাঝে মাঝে নামের আগে ‘দেশরত্ন’ লাগিয়ে পরখ করেন খাপ খায় কি না) এবং ‘বাবা সজীব ওয়াজেদ জয়’-এর বিরুদ্ধে কিছু বললে হাড়-মাংস কিমা ও কাবাব বানিয়ে ফেলেন। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই অপু উকিলকে বুঝিয়ে দিতেন কত ধানে কত চাল। কিন্তু আমি জিহ্বা কর্তনের মতো নৃশংসতার কথা বলতে পারবো না। আমি বলবো এদেরকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করতে হবে। এমনভাবে নির্মূল করতে হবে যাতে কখনও কোনো কালে অপু উকিলদের মতো নরকের পোকা কিংবা রাস্তার প্রাণীগুলো পার্লামেন্টে ঢুকতে না পারে। পার্লামেন্ট দেশপ্রেমিক, বিচক্ষণ, বিবেকবান, গণতন্ত্রমনা দায়িত্বশীল মানুষের জন্য। সেখানে যদি রাস্তার প্রাণী ঢুকে পড়ে শোরগোল বাধায়, কেউ ঘেউ ঘেউ করে জানপ্রাণ অস্থির করে ফেলে, মুখ দিয়ে নর্দমার মতো বদগন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশকে বিষাক্ত করে ফেলে, তাহলে সেটা হবে মানব জাতির জন্য অপমান। সেটা কোনোভাবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসকারী দেশপ্রেমিক পরিমার্জিত রুচিসম্পন্ন জনসাধারণ মেনে নিতে পারে না।
বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মধ্যে বসবাসকারী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী, ধর্মে বিশ্বাসী, ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধ যার মধ্যে আছে, তাদের কারও মুখ এত জিঘাংসা-উন্মত্ত হতে পারে না।
সেদিক থেকে বলা যায়, অপু উকিলের পূর্বপুরুষরা পলাশীর মাঠের ‘রাজাকার’ ছিল। এদের সবাই ছিল রাজবল্লভ ও রায়দুর্লভের চাপরাশি। এদের আদিপিতার নাম হলো জগেশঠ। এই শেঠদের মিরকাসিম মুঙ্গেরের পাহাড় চূড়া থেকে বস্তাবন্দি করে গঙ্গাবক্ষে নিক্ষেপ করে ডুবিয়ে মেরেছিল। সে সময় যে ক’জন চাকর-বাকর পালিয়ে বেঁচেছিল, তাদেরই অধস্তন বংশধর অপু উকিলরা। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর যখন কলকাতায় পতিতালয়ের ব্যবসায় নামলেন, তখনই অপু উকিলদের অনেকেই সেখানে নাম লিখিয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছিল। ১৮৫৭ সালেও এরা ইংরেজদের রাজাকার ছিল। এই কারণেই এদের মুখ ও পায়ুপথের মধ্যে পার্থক্য খুবই কম।
যা হোক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর লেখা পড়ে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন এসব প্রেত ও গৃধিনীর চিত্কার ও খেয়োখেয়ে দেখে আমার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে, এই মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। ইন্নালিল্লাহ পড়ার জন্য আর দেরি করা যায় না। পুরো জাতিকে সচেতন করে, সতর্ক করে, জ্ঞাত করে তাদের মাধ্যমেই এই মানসিক ভারসাম্যহীন সরকারকে আজিমপুর গোরস্থানে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে কবর দিতে হবে। এমনভাবে কবর দিতে হবে, যাতে এরা আর কোনোদিন অশুভ আত্মার ওপর ভর করে জাতির জীবনকে দুর্বিষহ করার জন্য মঞ্চে আবির্ভূত হতে না পারে। যদি বাংলাদেশের মাটি এদের দূষিত গলিত পচা দুর্গন্ধযুক্ত লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে তাহলে এদের বস্তাবন্দি করে নিক্ষেপ করতে হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাছে। পদ্মা যদি ঘৃণা করে এদের উগড়ে দেয়, তাহলে ওই বস্তাবন্দি পদার্থগুলোকে পাঠিয়ে দিতে হবে আধিপত্যবাদের উঠানে। বলতে হবে—“বাংলাদেশের পবিত্র জমিনকে অপবিত্র করার জন্য যেসব ‘মাল’ আপনারা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, এগুলো হলো তাদেরই অবশিষ্টাংশ, ফিরিয়ে দিয়ে গেলাম।”
এই কাজগুলো বাংলাদেশের মানুষ যত দ্রুত সম্পন্ন করতে পারবে ততই দেশের জন্য মঙ্গল। নইলে এই ঔদ্ধত্যপরায়ণ, দাম্ভিক, হিংস্র, স্বার্থপর, দুর্নীতিগ্রস্ত, ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী সরকার বাংলাদেশকে পুরোপুরি উন্মাদ, বিকারগ্রস্ত, প্রতিশোধপরায়ণ পাগলের দেশে পরিণত করে ফেলবে। বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরকে ঘৃণা, বিদ্বেষ, হিংসা, হানাহানি, বিভেদ ও বিভক্তির পুঁজ দিয়ে ভরে ফেলবে। সেই দুর্যোগ ও অভিশপ্ত অবস্থা দেখার জন্য নিশ্চয়ই আমরা কেউ অপেক্ষা করবো না।
দুই.
শুধুই কি অপু উকিল? না, আরও পাগল এবং ধান্ধাবাজ আছে। এই গোত্রেরই একজন সরকারি মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। কথায় বলে পুরান পাগলে ভাত পায় না, নতুন পাগলের আমদানি। এই নতুন আমদানিকৃতদের অন্যতম জনাব মিজান। মহাজোট সরকার তাকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বানিয়েছে। তার যোগ্যতা আছে কি নেই সে বাছ-বিচার করেনি নিয়োগের সময়। তো কৃতজ্ঞতা বলে তো একটা কথা আছে? এই কৃতজ্ঞতার জন্যই তিনি মাঝে মধ্যে সরকারের পক্ষে হম্বিতম্বি করেন। হম্বিতম্বি করে তার নিয়োগের যথার্থতা প্রমাণ করেন। তার নিয়োগদাত্রী এতে খুশি হন।
কারণ তার খুশির ওপরই নির্ভর করছে তার মানবাধিকারে থাকা না থাকা প্রসঙ্গ। অর্থাত্ মহা নিমকহালাল তিনি। এই মহা নিমকহালাল ব্যক্তিটি আবার মাঝে মধ্যেই তার সীমারেখার আইল বাতর ভেঙে হামলে পড়েন অন্যদের সীমানায়। তখন বেধে যায় দক্ষ যজ্ঞকাণ্ড। কিন্তু তার পোশাক-পরিচ্ছদ, কথাবার্তা শুনে ও দেহভঙ্গি দেখে অনেকেরই ধারণা হয়েছে—এটিও আবুলের মতো ‘দেশপ্রেমিক’ এবং আরেক আবুলের মতোই ‘মাল’। ফলে সে কি বললো, তাতে গা করে না কেউ। টিভি সেটের সামনে বসে থাকা বাচ্চারা বরং ‘নব্য ভাঁড়ের’ নর্দন-কুর্দন দেখে হেসে মরে।
সেই ড. মিজান ৪ সিটি করপোরেশনে তার প্রভুর ভরাডুবি দেখে মাত্রাজ্ঞান বজায় রাখতে পারেননি। ফলে দেশের ৯০ ভাগ মানুষের ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দাবিটি তার কাছে অসহ্য মনে হয়েছে। এ কারণেই বলেছেন, ‘এ (চার সিটি করপোরেশন) নির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব।’
বুঝুন ঠেলা! কোথায় মানবাধিকার, কোথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। উনি রাষ্ট্রের টাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বই প্রকাশ করেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর মানবাধিকার দর্শন’। শেখ মুজিব একজন জাতীয় নেতা ছিলেন। তার এ ব্যাপারে দর্শন থাকতেই পারে। কিন্তু কথাবার্তা নেই, হঠাত্ তার মানবাধিকার দর্শন গ্রন্থ প্রকাশের দরকার পড়লো কেন? শেখ মুজিবের আগে এ দেশে শহীদ সিরাজদৌলা ছিলেন, ছিলেন জ্ঞানী শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা, ছিলেন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, ছিলেন ঈশা খাঁ, শহীদ তিতুমীর, হাজী শরীয়তুল্লাহ, ছিলেন সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী এবং মওলানা ভাসানীর মতো বটবৃক্ষতুল্য ব্যক্তিত্ব।
ছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ছিলেন আরও অনেকে। যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, স্বাধীনতার জন্য নিজেদের সব শক্তি ও সামর্থ্য উত্সর্গ করেছিলেন। তাদের সবাইকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধু বন্দনার হেতু কি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তেল’।
ঠিক আছে। করুন রচনা গ্রন্থ। কিন্তু গ্রন্থ রচনার সময় এই অতি বাকমুখর ডক্টর সাহেবের কি মনে পড়েনি শেখ মুজিবের দুঃশাসনে তার লাল বাহিনী, নীল বাহিনী, রক্ষী বাহিনী, দলীয় ক্যাডারদের হাতে নিহত ৪০ হাজার নিরপরাধ মানুষের কথা। কী তাদের অপরাধ ছিল? কেন তাদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছিল? মহান সাম্যবাদী নেতা কমরেড সিরাজ সিকদার কি মানুষ ছিলেন না? তার কি মানবাধিকার থাকতে নেই? তো মুজিব বন্দনার কালে তার হাতে নিহত সেই মানুষদের মানবাধিকার নিয়ে কি একটা শব্দও আজ অবধি উচ্চারণ করেছেন মিজান সাহেব? কেন করেননি? আপনার বিবেচনায় যারা আওয়ামী লীগ করে না, তাদের কি মানবাধিকার থাকতে নেই? কেন থাকবে না?
আপনি বর্তমান সরকারের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাস নিয়ে নিঃশব্দ কেন? এই যে প্রতিদিন শত শত মানুষ বিনা বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে, শিকার হচ্ছে গুমের, শিকার হচ্ছে অপহরণের, নারী হারাচ্ছে সম্ভ্রম—তাদের বিষয়ে ঠোঁটে তালা লাগিয়ে বসে আছেন কেন? এই যে বিরোধী দল দমনে উন্মত্ত সরকারি তাণ্ডব, রিমান্ডের ভয়াবহতা, র্যাব-পুলিশের হত্যাযজ্ঞ, বিভীষিকাময় নির্যাতন, লাখ লাখ মিথ্যা মামলা, কয়েক লাখ লোকের বিনা কারণে কারাবাস, ডাণ্ডাবেড়ি, এই যে শাহবাগিদের দাঁত ও নখে ক্ষতবিক্ষত মুসলমানদের হৃদয়, এই যে হেফাজতে ইসলামের ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড—সেসব বিষয়ে আপনার ঠোঁট প্রগলভ হয়ে ওঠে না কেন?
ওই নিয়ে কথা বলাই তো আপনার কাজ। ওগুলোই আপনার ক্ষেত্র। কিন্তু নিজের কাজ ফেলে রেখে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও যৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে আপনার জিহ্বা এত ব্যগ্র কেন? কারণ এগুলো আপনার প্রভুর খায়েশের সঙ্গে সামঞ্জ্যপূর্ণ নয়। আর বিরোধী দলকে গাল দিলে তিনি আপনার ওপর খুবই সন্তুষ্ট থাকেন, এই তো বিষয়টি। সেজন্যই কি এত লাঙ্গুল নাড়ানো?
তো আপনার লাফ-ঝাঁপ ও বক্তৃতাবাজিতে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
তিনি হঠাত্ মুখ ফসকে বলে বসলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বেশি কথা বললে নির্বাচনই দেব না।’ আবার বলেছেন, ও নিয়ে বেশি কথা বললে কেয়ামত পর্যন্ত নির্বাচনই হবে না।
মিজান সাহেব, আপনার দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মাথায় গোলমাল বাধিয়ে দিয়েছে। সেজন্যই উনিও আপনার মতোই ভেবে দেখছেন না, এটা তার এখতিয়ার নয়। নির্বাচন দেয়া না দেয়ার তিনি কেউ নন।
তবে তত্ত্বাবধায়ক শব্দ শুনলেই নাকি আওয়ামী লীগ মন্ত্রীদের অনেকের মাথা খারাপ হয়ে যায়। মুখ দিয়ে খালি খিস্তি বের হয়। তারা গণহিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বেসামাল উক্তি করতে থাকেন? পাকিস্তানের জিয়াউল হকের নাকি ‘গণতন্ত্র’ শব্দ শুনলেই এমন হতো। তার নাকি চুল খাড়া হয়ে যেত। এজন্য তার ব্যক্তিগত নাপিত তার চুল কাটার সময় খালি গণতন্ত্র গণতন্ত্র শব্দ করতো। আর জিয়াউল হকের চুল দাঁড়িয়ে যেত।
এতে চুল কাটা খুব সহজ হতো।
মুজিবী খানদানের চার-চারটি গরু কোরবানি করে বিরোধী দলকে খাইয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ধরে নিয়েছিলেন, এবার বিরোধী দলগুলো তার তত্ত্বাবধানেই নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু বিরোধী দলগুলো তার মনের মতো ‘সুবোধ’ নয়। সেজন্যই তো এত গোস্বা। সেজন্যই তো তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে সব নির্বাচন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সেজন্য তত্ত্ববধায়ক সরকারের আর কোনো যৌক্তিকতাই নেই। আমরা যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার চেয়েছিলাম, তখন তার একটা যুক্তি ছিল। এখন তো কোনো যুক্তি নেই। তারপরও এবার যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে, তাহলে তারা নির্বাচনই দেবে না। আর জ্ঞানী-গুণী, যিনি এক সময় আমাদের ছিলেন, ঘর ভেঙে চলে গেছেন, তিনি সার্টিফিকেট দিয়ে দেবেন কেয়ামত পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকবে।
তারপরও যদি আমাদের কথা শুনে জনগণ ভোট দিয়ে দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের ক্ষমতায় আনে, তবে হায় আফসোস করার কিছু নেই। তার ফল জনগণই ভোগ করবে।
তিনি অবশ্য স্বীকার করেছেন, চোর ধরতে এসে নিজেরাই চোর হয়ে গেছেন। তার ছেলের স্ত্রীও ইহুদি নয়, খ্রিস্টান আর খ্রিস্টানরা হলো আহলে কিতাব। ওমা, ইহুদিরা কি তাহলে আহলে কিতাব নয়? আর জাতি জানতে পারলো তার নয় আসলে কামাল হোসেনের জামাই হলেন ইহুদি। নিতান্তই ঘরের কথা!
প্রধানমন্ত্রীর যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি দেখানোর বুকের পাটা আমার নেই। আমি তাকে দেখার আগে তার পুলিশ, র্যাব ও দলীয় ঠেঙ্গাড়েদের দেখেছি। দেখেই আমার বুকের রক্ত কলকাতার ভাষায় ‘জল’ হয়ে গেছে।
সেজন্যই হেফাজতের সাধারণ নিরীহ ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিরুদ্ধে তিনি যখন লেলিয়ে দিয়েছিলেন তার ঘাতক বাহিনীগুলোকে, আমার মতো ছাপোষা অনেকেই গর্তে লুকিয়ে ছিলাম।
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, ফজরের নামাজ পড়ে কোরআন তেলাওয়াত করে দিন শুরু করি, আর আমরা হয়ে যাই নাস্তিক। আর যিনি বোতল খেয়ে ঘুমিয়ে ঘুম থেকেই উঠেন দুপুর ১২টার পরে, তারা হলো আস্তিক। আর যাব কোথায়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাহাকার দেখে আম জনতার কষ্ট লাগে। তিনি আফসোস করে বলেছেন, চোর ধরতে এসে আমরা নিজেরাই চোর হয়ে যাচ্ছি। আহা!
আমাদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের জনগণ এসব আর্তনাদের অর্থ জানে! জানে বলেই তারা বলে, বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলে পরিচয়। এই ‘ফলের’ অন্তর্গত তাত্পর্য অনুধাবন করা এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ক্ষমতা আওয়ামী ঘরানার আর কারও মধ্যে নেই। নেই বলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চারদিকে ‘চাটার দল’ (তার মরহুম পিতার ভাষায়)। এই চাটার দলের সৃষ্ট কুয়াশা ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তিনি আর রাখেন না। সেজন্যই তার সরকারকে বাংলাদেশের মানুষ আর চাচ্ছে না। একেবারেই চাচ্ছে না। তাকে যেতে হবে তার ভুল ও অন্যায়ের খেসারত দিতে।
তিন.
চার সিটি করপোরেশনে সরকারি জোটের ভরাডুবির কারণ অনুসন্ধানে নেমে বেশিরভাগ আওয়ামী লেখক কলামিস্ট বুদ্ধিজীবী, তাদের কদমবুচি সংবাদপত্র ও চ্যানেলগুলো বারবার এক কথা বলার চেষ্টা করেছে যে, আওয়ামী লীগ অপপ্রচারের শিকার। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক লোকেরা অপপ্রচার করেছে। এই কাতারে সবার ওপর নাম লিখিয়েছেন আওয়ামী ঘরানার ‘কালো বিড়াল’ নামে খ্যাত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি অতি উচ্চ কণ্ঠে বলেছেন, সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী একত্র হয়ে যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল, তার ফলেই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে আওয়ামী লীগ। এসব বালখিল্য ও সত্য গোপনকারীর কথা শুনে মনে হচ্ছে, সামনে আওয়ামী লীগের জন্য আরও বিপদ আছে। কারণ এসব লোক হলো শেখ সাদীর সেই গল্পের যুবক। যার হীরার আংটি হারিয়েছিল সমরখন্দ শহরে, আর তা খুঁজতে এসেছে বাগদাদে। এরা সবসময় বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পথে প্রবল বাধা তৈরি করে নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে। মাঝখান থেকে ভরাডুবি হয় দলের।
নইলে যারা খোলা চোখের মানুষ তারা জানে, আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করছে তার প্রবল ধর্মবিদ্বেষ। আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা বলেছে, দুর্নীতি, অপশাসন, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনরোষ তৈরি হয়েছে।
কথা তো সত্য। আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস’ বাতিল করে দিয়েছে। পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে মতিয়া, মেনন, সুরঞ্জিত, ইনু, লেনিন, নাহিদদের। দিলীপ বড়ুয়ার মতো ফালতু জিনিসকে সে মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর নিজে হয়ে উঠেছে তাবত্ খোদাদ্রোহী, বেঈমান, নাস্তিক, মুরতাদ ও বেদীনদের পৃষ্ঠপোষক। আধিপত্যবাদের পায়ের কাছে দেশকে ঠেলে দিয়েছে, অপমান করেছে মুক্তিযুদ্ধের, স্বাধীনতার।
আবার তার মুখেই বেশি বেশি স্বাধীনতার বাণী। মুনতাসির, শাহরিয়ার, আনোয়ার হোসেন, রামেন্দু, নাসিরউদ্দিন বাচ্চু, আসাদুজ্জামান নূররা কবে আওয়ামী লীগার ছিল? এরা তো একেবারেই পাশের বাড়ির বরকন্দাজ। বাংলাদেশের মূলধারার সঙ্গে এদের কি কোথাও কোনোদিন কোনো সম্পর্ক ছিল? তারপরও এসব বরকন্দাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ধর্মদ্রোহী ব্লগারদের জামাই আদরে লালন-পালন করেছে এই সরকার। তাদের উপাধি দিয়েছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ। ধর্মপ্রাণ জাতিকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে, উপহাস করে, তারপর চার স্তর নিরাপত্তা দিয়ে দেশের কোটি কোটি মানুষের সামনে তাদের দিনের পর দিন পোলাও কোরমা বিরিয়ানি খাইয়ে তৈরি করেছে শাহবাগিদের। আর অন্যদিকে পাশ্চাত্যের বাহ্বার লোভে ধর্মপ্রাণ মানুষদের বছরের পর বছর করেছে অপমান। ধর্মীয় নেতাদের বানিয়েছে জঙ্গি, আল কায়দা। শাপলা চত্বরে হেফাজতের নিরীহ নিরপরাধ মানুষদের ওপর চালিয়েছে চেঙ্গীশীয় নৃশংসতা।
দুর্নীতিকে বানিয়ে নিয়েছে নীতি। আওয়ামী লীগ করলেই সাত খুন মাফ। ছাত্রলীগের ভয়াবহতার চাপে ধ্বংস হয়ে গেছে শিক্ষাঙ্গন। দুঃশাসন, দাম্ভিকতা, অহমিকা, নিষ্ঠুরতাকে করেছে অঙ্গের ভূষণ। শিক্ষাঙ্গন, ব্যাংক, বীমা—সর্বত্র ছড়িয়েছে দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের লালা। পদ্মা সেতুর নামে ডুবিয়েছে দেশ। সোনালী ব্যাংককে হলমার্ক দিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে। বিসমিল্লাহ, কালো বিড়াল আর শেয়ারবাজার ধ্বংস করে পথে বসিয়েছে ৩৩ লাখ মানুষকে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে করেছে হতবাক করা আচরণ। মরিয়া হয়ে পড়েছে গ্রামীণ ব্যাংক ধ্বংস করে দেয়ার জন্য। ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীতে ভারত বাঁধ দিয়ে পানি লুট করলেও এই সরকার সে সম্পর্কে পালন করেছে নীরবতা। তিতাস নদী হত্যা করে ক্ষমতার জোরে ভারতকে দিয়েছে ট্রানজিট-করিডোর। টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে মেঘনা হত্যার আয়োজন সম্পন্ন করলেও আমাদের সরকারের মন্ত্রীদের কথাবার্তা গেছে নিজ দেশের বিপক্ষে। তিস্তা চুক্তি করতে না পেরে নিশ্চুপ হয়ে গেছে। সীমান্তে বিএসএফ প্রতিদিন বাংলাদেশের মানুষ হত্যা করলেও প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সব মন্ত্রী ভারতকেই সমর্থন করেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নের নামে চালিয়েছে ভয়ানক নির্যাতন। হাজার হাজার মানুষকে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে তোলা হয়েছে রাজবন্দিদের। রিমান্ডের রক্ত হিম করা নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি কেউ। গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরেছে। বন্ধ করে দিয়েছে আমার দেশ, দিগন্তসহ ইসলামিক টিভি। মাহমুদুর রহমানের মতো সত্যনিষ্ঠ মানুষের ওপর হিংস্র আক্রোশে বারবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে সরকার।
বাংলাদেশ হলো আবহমান কাল ধরে পলিমাটির দেশ। এখানে ফকির বিদ্রোহ, ওহাবি ও ফারায়েজি আন্দোলন হলেও এ দেশের মানুষ ইসলামের মরমী আলোতে উদ্ভাসিত। তারা ধর্মান্ধ নয়, ধর্মপ্রাণ। তারা হিংসা ও হানাহানি পছন্দ করে না। তারা সবাইকে বঞ্চিত করে এক নেতা এক দেশে বাংলাদেশকে পরিণত হতে দিতে চায় না। তারা শৃঙ্খলা ও সম্মান দিতেও চায়, পেতেও চায়। কিন্তু এই সরকার অবস্থান নিয়েছে সম্পূর্ণ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে। এই বিপরীত অবস্থান তার জন্য প্রলয় ডেকে এনেছে। ভবিষ্যতে ডেকে আনবে মহাপ্রলয়। কারণ তারা এখন বুঝতে পারছে, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা দেশের জন্য একটা বিপর্যয়, আর আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতাসীন হয় তখন যে কোনো দেশের জন্যই তা মহাবিপর্যয়ের কারণ হয়।
তো এই কথাগুলো যদি বিরোধী দল বলে তখন তা অপপ্রচার হবে কেন? এগুলো তো সূর্যের মতো সত্য। বরং আওয়ামী লীগের উচিত তার রাজনৈতিক চরিত্র সংশোধন করা। মরহুম শেখ মুজিবের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’টা বার বার পড়া। তাদের জন্য মঙ্গল হবে যদি তারা আবুল মনসুর আহমদের ‘বাংলাদেশের কালচার’ বইটা প্রতিদিন একবার করে পড়ে। তাহলে তারা যেমন বাংলাদেশকে বুঝতে পারবে, তেমনি বুঝতে পারবে বাংলাদেশের মানুষের মনমানসিকতা ও তাদের সংস্কৃতিকে। এগুলো পাঠ করলে তারা নিজেদের ভুলগুলোও কিছু কিছু ধরতে পারবে। অন্যদিকে পাঠাভ্যাসের কারণে ধীরে নরম হয়ে আসবে তাদের শক্ত চোয়ালগুলো। সূত্র: আমার দেশ

0 Comments