Advertisement

সংসদ থেকে শালীনতা বিদায়! নোংরা ভাষা ব্যবহারে প্রতিযোগিতা

 ঢাকা: জাতীয় সংসদ থেকে বিদায় নিয়েছে শালীনতা! আলোচনার নামে চলছে নোংরা ভাষায় খিস্তিখেউড়। অশালীন, অমার্জনীয়, অসংসদীয় ও প্রকাশের অযোগ্য ভাষার ব্যবহার দেখে স্তম্ভিত দেশবাসী। এ কোন ভাষায় কথা বলছেন দেশের আইন প্রণেতারা? বেশকিছু দিন ধরেই বিরোধী দল ও সরকারী দলের কয়েক নারী সংসদ সদস্য কে কত বেশি খারাপ ভাষা কথা বলতে পারেন, এরই যেন প্রতিযোগিতা চলছে গণতন্ত্রের সূতিকাগার জাতীয় সংসদে। স্পীকারের রুলিংকে প্রতিদিনই বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করছেন দু’পক্ষই। প্রথমে শুরু করেছিল বিএনপির তিন নারী সদস্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সরকারী দলেরও কোন কোন নারী সদস্য। সংসদে তাঁদের রুচিহীন ‘অমিয় বচন’-এর অনেকটাই রুচিশীল পাঠকের কথা চিন্তা করে তা প্রকাশ করাও সম্ভব নয়।


বিরোধী দল ও সরকারী দলের খিস্তিখেউড় এবং নোংরা ভাষার আক্রমণাত্মক বক্তব্যে চলাকালে বিরত রাখার তো দূরের কথা অনেক সংসদ সদস্যই টেবিল চাপড়িয়ে উৎসাহিত করতেও দেখা যায়নি। রবিবার বিএনপির নারী সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হেয় করতে কল্পকাহিনী রচনা করে দেয়া বক্তব্যে উত্তাল হয়ে ওঠে অধিবেশন। অশ্লীল ও কদর্যভাষায় আক্রমণাত্মক বক্তব্যে থেকে বিরত রাখতে স্পীকার রেকর্ডসংখ্যক সাতবার মাইক বন্ধ করেও রানুকে নিবৃত্ত করতে পারেননি। সংসদে অশ্লীল শব্দ চয়ন, অশোভন বাচনভঙ্গিতে গত কয়েকদিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যান রানু।


ফলে সংসদ সংসদ্যদের লজ্জাজনক আচরণ আবারও দেখতে হয়েছে জাতিকে, আইনপ্রণেতাদের মুখে শুনতে হয়ছে অশ্রাব্য ভাষা। সরকারী দলের সদস্য ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পিরও পাল্টা আক্রমণাত্মক বক্তব্যে থেকে নিবৃত্ত করতে তাঁর মাইকও দু’বার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হোন স্পীকার। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের তীব্র হৈ হট্টগোলে অশান্ত রূপ নিয়েছিল। সরকার ও বিরোধী দলের কিছু সংসদ সদস্যের মারমুখী আচরণে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছিলেন দেশের প্রথম এই নারী স্পীকার।


জিয়াউর রহমানকে ‘ঠা-া মাথার খুনী’ বলার প্রতিবাদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল সংসদ থেকে কিছু সময়ের জন্য ওয়াকআউট করে পুনরায় ফিরে আসলেও আরেকটি রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে রবিবারের অধিবেশনে। সংসদ সদস্যদের অশ্লীল, অভদ্র ভাষায় বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারী দলের সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ বাজেট আলোচনায় অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করে নিজ আসন ছেড়ে চলে যান।


বাজেটের ওপর বক্তব্যে রাখার জন্য স্পীকার তাঁকে ফ্লোর দিলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আবদুল লতিফ বলেন, পবিত্র সংসদে এমন অশ্লীল বক্তব্যে শুনে সংসদ সদস্য হিসেবে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে। সংসদে যেভাবে অশালীন ও কদর্যভাষায় বক্তব্যে দেয়া হচ্ছে, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সারাদেশের মানুষের কাছে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। পবিত্র সংসদে অশালীন ভাষা প্রয়োগের প্রতিবাদে আমি বক্তব্যে না দিয়ে এই স্থান ত্যাগ করছি।’ এই বলে তিনি সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে গেলে বিরোধী দলের সদস্যরা বিদ্রƒপ করে হাততালি দিলে আরও ক্ষীপ্ত ওয়ে ওঠেন আবদুল লতিফ। তিনি বলেন, ‘আপনাদের লজ্জিত হওয়া উচিত, অথচ আপনারা হাততালি দিচ্ছেন!’ প্রতিবাদে আবদুল লতিফ বাজেটের ওপর বক্তব্য রাখা থেকে নিজেকে বিরত রেখে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সরকারী দলের অন্যান্য সিনিয়র সদস্য ও মন্ত্রীরাও সংসদের মতো জায়গায় বিরোধী দলের কিছু নারী সংসদ সদস্যের অশ্লীল বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন।


স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে রবিবার বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নেন সরকারী দলের মন্ত্রী আফসারুল আমিন, আবুল কালাম আজাদ, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, জুনায়েদ আহমেদ পলক, জাতীয় পার্টির এইচ এম গোলাম রেজা, হোসেন মকবুল শাহরিয়ার বিএনপির রেহেনা আক্তার রানু ও নজরুল ইসলাম মঞ্জু।


বিএনপির রেহানা আক্তার রানু বার বার অনুচ্চারণযোগ্য নোংরা ভাষায় বঙ্গবন্ধুকে আক্রমণ করে বক্তব্য রাখতে থাকেন। স্পীকার কয়েকবার মাইক বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে সতর্ক করলে এ সময় বিএনপির এম কে আনোয়ার, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি দাঁড়িয়ে রানুকে মাইক দিতে বলেন। এ সময় সরকারী দলের সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তারানা হালিম, আসলামুল হক আসলাম রানুকে মাইক না দেয়ার জন্য জোর দাবি জানান। এ সময় স্পীকার কার্যপ্রণালী বিধি ২৭০ অনুসরণ করে বক্তব্য দেয়ার আহ্বান জানিয়ে রানুকে মাইক দেন। মাইক পাওয়া মাত্রই আবারও তিনি অশ্রাব্য ভাষায় বক্তব্য চালিয়ে যান। রানুর বক্তব্য শেষ হলে মাগরিবের নামাজের বিরতি শুরু হলে সরকারী দলের আসলামুল হক আসলাম এবং বিএনপির শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির মধ্যে অধিবেশন কক্ষের ভেতরেই উত্তপ্ত বাকযুদ্ধে লিপ্ত হতে দেখা যায়।


বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ববিএনপির সংরক্ষিত আসনের মহিলা সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হেয়প্রতিপন্ন করার দুঃসাহস দেখিয়ে বলেন, ‘এক পুলিশের কর্মকর্তা আমাদের শুয়োরের বাচ্চা বলেছে। ওনারা বলেন শেখ মুজিব তথা জাতির জনক আমাদের সবার আব্বা, উনি যদি আমাদের আব্বা হোন আমরা যদি শুয়োরের বাচ্চা হই, শেখ মুজিব তাহলে কী? প্রধানমন্ত্রীকে ‘মাতালের মা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মেঘ দিয়ে যেমন সূর্যের আলো ঢেকে রাখা যায় না, তেমনি তারেক জিয়ার নামে কুৎসা রটনা করে জয়ের কলঙ্ক ঢেকে রাখা যায় না। কখনও তারেক রহমানের সঙ্গে জয়ের তুলনা করবেন না। জয়ের সার্টিফিকেটের কথা বলেন, বিদেশে গেলে অর্থ দিয়ে অনেক সার্টিফিকেট কিনতে পাওয়া যায়। সজীব ওয়াজেদ জয় মাতাল জেল খাটা আসামি। মাতাল অবস্থায় রাস্তা থেকে ধানম-ি ও গুলশান থানা কয়েকবার তাকে গ্রেফতার করেছে। আমেরিকাতে মাতাল অবস্থায় কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। আজ মাতালের মায়ের বড় গলা।


বঙ্গবন্ধুর জন্মকাহিনীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে বিএনপির এই সাংসদ বলেন, এক হিন্দু লোকের অবৈধ সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। তার বয়স যখন ৩ বছর তখন তাঁর হিন্দু মাকে অবৈধ পিতার মুসলিম মুহুরী বিয়ে করে স্বীকৃতি দেন। পরে তাদের মুসলমান নাম রাখা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি যে অশ্লীল ও কল্পকাহিনীপূর্ণ বক্তব্য রাখেন তা ছাপারও অযোগ্য বিধায় লেখা সম্ভব হলো না। এর আগের দিন বক্তব্যে রাখা সরকারী দলের সংসদ সদস্য অপু উকিলকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ বাংলাদেশ। এটা ভারতের পার্লামেন্ট নয়। গত ২০ জুন একজন হিন্দু সংসদ সদস্য ফেনসিডিল ও ইয়াবা খেয়ে আমাদের নেত্রীকে নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, তা কুৎসিত, নোংরা, অন্ধকার জগত থেকে উঠে আসা নর্দমার কীটের পক্ষেই সম্ভব।


প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াত স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে ‘পুরুষ নির্যাতনের শিকার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যিনি স্বামীকে শান্তি দিতে পারেন না, তিনি কিভাবে দেশের মানুষকে শান্তি দেবেন? ওয়াজেদ মিয়া আমাদের কাছে অনেকবারই এ নিয়ে আফসোস করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, সংসদের এক নম্বর ব্যক্তি যদি ঠিক হয়ে যান, তবে আমরাও ঠিক হয়ে যাব। তিনি সংসদে বসে এমপিদের চিরকুট পাঠান এমপিদের অশালীন ভাষায় কথা বলার জন্য। যিনি আমাদের নেত্রীর পরিবার নিয়ে এখানে কুৎসা রটনা করেন, তিনি রাজনৈতিক ‘বেশ্যা’ (পলিটিক্যাল প্রসটিটিউট)। তাঁর ১৭ মিনিটের অশ্লীল বক্তব্যের সময় সংসদদের ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক সাতবার মাইক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হোন স্পীকার। স্পীকার বার বার অসংসদীয়, অশ্লীল মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালেও তাতে ন্যূনতম কর্ণপাত করেননি বিএনপির ওই মহিলা সংসদ সদস্য। উল্টো তার মাইক বন্ধ করার কারণে বিএনপির জুনিয়র নেতাদের সঙ্গে সিনিয়র নেতারাও স্পীকারের প্রতি লক্ষ্য করে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।


মাগরিবের বিরতির পর বিএনপির রেহানা আক্তার রানুর অশ্লীল বক্তব্যের জবাব দিতে উঠে সরকারী দলের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি পাল্টা অশ্লীলভাষায় আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাখেন। স্পীকার বাপ্পির বক্তব্যের সময়ও দু’বার মাইক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হোন। বাপ্পি বলেন, বিরোধী দলের নেতার ৫টি জন্মদিন। ইহুদী পিতার ঔরসে জন্মেছেন বলেই জন্মের দিনের ঠিক নেই। আর মক্ষী রানী মারমার নাতি তারেক রহমানের ইতিহাসও মানুষ জানে। দুর্নীতিবাজ তারেক রহমান মুচলেকা দিয়ে রাজনীতি করবেন না জানিয়ে বিদেশে পালিয়ে গেছেন। তারেক রহমান এক আতঙ্কের নাম। সেই আতঙ্কের মুখ বাংলাদেশের জনগণ আর দেখতে চান না। দাউদ ইব্রাহিম ও ছোটা শাকিলের সঙ্গে দুবাইয়ে অস্ত্র চুক্তি করতে গিয়ে বাংলাদেশকে আফগানিস্তান ও জঙ্গীবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।
- See more at: http://www.bengalinews24.com/citizen-journilism,-new-media-journalism/2013/06/25/8614#sthash.48MpK77t.dpuf

Post a Comment

0 Comments