Advertisement

ফাঁসিতো দেবেনই, পরোয়া করি না: সাকা চৌধুরী


মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ কে
উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আমাকে ফাঁসি তো আপনারা দেবেনই, কিন্তু আমি পরোয়া করি না।” সোমবার নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন সাকা চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, “আমার বিচার হচ্ছে উত্তরাধিকার সূত্রে। তাই আমার চাচার (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সঙ্গে আমার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরীর স¤পর্কও আমি আমার সাক্ষ্যে আনতে চাই। কে বঙ্গবন্ধু আর কে ফজলুল কাদের চৌধুরী- সেটাও আনতে চাই।”
বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হকের দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সাকা চৌধুরীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর উপস্থিত ছিলেন না। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন আর সাকা চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন তার দুই আইনজীবী অ্যাডভোকেট এএইচএম আহসানুল হক হেনা ও ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম। সাকা চৌধুরীর পক্ষে তিনি নিজেসহ ৫ জন সাক্ষী সাফাই সাক্ষ্য দেবেন বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সোমবার প্রথম সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন সাকা চৌধুরী। সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত অবস্থায় মঙ্গলবার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার সাক্ষ্য দেওয়ার আগে সাকা চৌধুরীর সঙ্গে তার দুই আইনজীবী অ্যাডভোকেট এএইচএম আহসানুল হক হেনা ও ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় এক ঘণ্টা সাক্ষাতের অনুমতিও দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
ইংরেজিতে দেওয়া প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টার সাক্ষ্যের মধ্যে সোয়া এক ঘণ্টাই নিজের বংশ পরিচয় তুলে ধরেন সাকা চৌধুরী। সাক্ষ্য শুরুর আগে নিয়ম অনুসারে আদালতে শপথ নিতেও অস্বীকৃতি জানান তিনি। এ সময় তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আমি একজন সংসদ সদস্য। আমি কেন এখানে শপথ নেবো?।” পরে শপথ ছাড়াই সাক্ষ্য দিতে শুরু করেন সাকা চৌধুরী।
বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করে সাকা চৌধুরী তার সাক্ষ্যে বলেন, স্বাধীনতার পরে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ভারতীয় সৈন্যদের ফেরত পাঠিয়েছেন। এ সময় তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জাপান ও জার্মানির উদাহরণ দেন। বার বার ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের জন্য দ্বিজাতি তত্ত্বের উল্লেখ করে সাকা চৌধুরী সাক্ষ্যের এক পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনারা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন। দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই যদি বাংলাদেশের জন্ম হয়, তবে এদেশের সংবিধান রক্ষা করাও আপনাদের কর্তব্য। আপনারা সংবিধান রক্ষা করেই বিচার করবেন।”
এক পর্যায়ে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সাকা চৌধুরীকে বলেন, “আমরা আপনাকে সুযোগ দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। অনেক বেশি কথা বলার অভ্যাস আপনার রয়েছে। কারণ, আপনি অনেক বেশি জানেন। দয়া করে উত্তেজিত হবেন না।” এ সময় উত্তেজনার জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমাও চান সাকা চৌধুরী।
তবে অভিযোগের সঙ্গে স¤পর্কহীন ও অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে দীর্ঘ সাক্ষ্য দানের জন্য বার বার আপত্তি জানান প্রসিকিউশন। প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন’ ১৯৭৩ এর ৫১ ধারা তুলে ধরে বলেন, “চার্জ (অভিযোগ) গঠনের সময় তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেসব অভিযোগের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক কোনো সাক্ষ্য দিতে পারেন না তিনি। অভিযোগের বাইরে কোনো বিষয়ে তিনি সাক্ষ্য দিতে পারেন কিনা বা এ সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন কিনা তা ট্রাইব্যুনালের ভেবে দেখা উচিৎ।” তবে ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার থেকে সাকা চৌধুরীকে প্রাসঙ্গিক বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সাক্ষ্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গত বছরের ১৪ মে থেকে গত ১৩ জুন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ নূরুল ইসলাম ঘটনা ও জব্দ তালিকার সাক্ষী মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী। আর ৪ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ঘটনার সাক্ষীরা হচ্ছেন- বাংলা একাডেমীর সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সলিমুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সিরু বাঙালি, শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের ভাতিজা গৌরাঙ্গ সিংহ ও পুত্র প্রফুল্ল রঞ্জন সিংহ, শহীদ পরিবারের সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট নির্মল চন্দ্র শর্মা, আব্বাস উদ্দিন আহম্মেদ (আব্বাস চেয়ারম্যান), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) উপাচার্য মোঃ সালেহ উদ্দিন, ব্যবসায়ী পরাগ ধর (ক্যামেরা ট্রায়াল), চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক ছাত্রনেতা কাজী নূরুল আফসার, মুক্তিযোদ্ধাদের গ্র“প কমান্ডার সৈয়দ মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম, শহীদ পরিবারের সদস্য অরুণাংশু বিমল চৌধুরী ও তার ভাতিজা আশীষ চৌধুরী, অধ্যক্ষ গোপাল চন্দ্র দাশ, সাংবাদিক নিজাম উদ্দীন আহমেদ, ফয়েজ আহমেদ সিদ্দিকী, একজন ক্ষতিগ্রস্ত নারী সাক্ষী (ক্যামেরা ট্রায়াল), শহীদ পরিবারের সদস্য দেবব্রত সরকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা সংগীত শিল্পী সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম জুনু, শহীদ পরিবারের সদস্য শেখ মোরশেদ আনোয়ার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর, শহীদ পরিবারের সদস্য অনিল বরণ ধর, মুক্তিযোদ্ধা বনগোপাল দাশ, শহীদ পরিবারের সদস্য বাবুল চক্রবর্তী বুলবুল, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের চৌধুরী, মো. সোলায়মান, ডা. এ কে এম শফিউল্লাহ, শহীদ পুত্র পরিতোষ কুমার পালিত, শহীদ পরিবারের সদস্য সুবল চন্দ্র শর্মা, শহীদ পরিবারের সদস্য মো. নাজিম উদ্দিন, শহীদ পরিবারের সদস্য সুজিত মহাজন, শহীদের স্ত্রী বাসন্তি ঘোষ, মাহমুদ আলী, বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী, কামাল উদ্দিন এবং শহীদ পরিবারের সদস্য চপলা রাণী।
আর জব্দ তালিকার সাক্ষীরা হলেন- বাংলা একাডেমীর সহকারী গ্রন্থাগারিক এজাব উদ্দিন মিয়া, চট্টগ্রামের রাউজান থানার জিআরও এএসআই মো. এরশাদুল হক, সাবেক জিআরও এসআই মোল্লা আব্দুল হাই ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের বুক শর্টার কাওসার শেখ তাদের জেরা স¤পন্ন করেছেন আসামিপক্ষ।
এছাড়া অন্য ৪ সাক্ষী মৃত জ্যোৎøা পাল চৌধুরী, মৃত জানতি বালা চৌধুরী ও মৃত আবুল বশর এবং ভারতে থাকা বাদল বিশ্বাসের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায়ই সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেফতার করা হয় তাকে। ১৯ ডিসেম্বর একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। পরে ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত দল। একই বছরের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ১৮ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ৫৫ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগের সঙ্গে এক হাজার ২৭৫ পৃষ্ঠার আনুষঙ্গিক নথিপত্র এবং ১৮টি সিডি ট্রাইব্যুনালে জমা দেন প্রসিকিউশন।
গত বছরের ৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ করে গুডস হিলে নির্যাতন, দেশান্তরে বাধ্য করা, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন অপরাধ। ৩ মে ও ৭ মে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন স¤পন্ন করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাকা চৌধুরীর বিচার।

Post a Comment

0 Comments