Advertisement

মিয়ানমারে গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু চট্টগ্রামে


ফরিদুল মোস্তফা খান, কক্সবাজার
চট্টগ্রাম, ১২ জুন: মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) প্রদেশে সহিংসতায়  আহত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের একজন চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা
গেছেন। স্থানীয় পুলিশ ধারণা করছে, বার্মিজ সরকারি বাহিনীর গুলিতে সম্ভবত এই ব্যক্তি আহত হন।  আহত আরো কয়েকজন চিকিৎসাধীন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে, আহত শরণার্থীদের চিকিৎসায় দরকারি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ও বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় আরাকানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার মধ্যে গত সোমবার আরাকান থেকে ফেরত আসা ৫৫ বাংলাদেশী ব্যাবসায়ী দাবি করেছেন, সীমান্তবর্তী মংডু শহরাঞ্চলেই তারা কমপক্ষে শতাধিক লাশ দেখেছেন। তবে দেশটির সরকারি হিসাবে গত শুক্রবার থেকে মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে ২৫। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ‘ইসলাম ধর্মালম্বী রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মালম্বী রাখাইনদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি’। রোহিঙ্গাদের জন্য কাজ করা সংগঠন, ‘দ্য আরাকান প্রজেক্ট’এর দাবি হচ্ছে, সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা কয়েক ডজন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রামে যে শরণার্থী মারা গেছেন, তার নাম কালা হোসেন। পুলিশের উপ-পরিদর্শক নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, পেটে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মিয়ানমার থেকে আসা এই ব্যক্তি। আহতাবস্থায় কালা হোসেন জানিয়েছিলেন, তিনি গত ৮ জুন মিয়ানমারের মংডু শহরে জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হন। বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমার’এর এই শহর থেকে আহত অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেন তিনি।
নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে আরো দুই গুলিবিদ্ধ রোহিঙ্গা শরণার্থী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর, তার মাথায় গুলি লেগেছে। আরাকান প্রদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় গৃহহারা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরনার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার জন্য এলে কক্সবাজারের টেকনাফে কোস্টগার্ড ও বিজিবির ধাওয়ার মুখে নৌকা ও ট্রলারে করে নাফ নদীর মোহনায় অবস্থান করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের সরকারকে আহবান জানিয়েছে, দেশটি যেন মিয়ামনমার থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে দেয়। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সরকার আরাকান প্রদেশে (রাখাইন) রোববার রাত থেকে সামরিক আইন জারির পর সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী প্রদেশটি থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুরা নৌকায় ও ট্রলারের করে সাগর পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারের টেকনাফ ও সংলগ্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করছে।
বহু জাতি ও সম্প্রদায়ের দেশ মিয়ানমারের বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী আরাকান প্রদেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলমানদের নাগরিক স্বীকৃতি নেই দেশটির সংবিধানে। প্রদেশটিতে জাতিসংঘের ভাষায় ‘বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়’ মুসলিম ধর্মালম্বী রোহিঙ্গাদের চলাফেরার ওপর সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রাখে। দেশটির প্রশাসন প্রায়ই এদের ‘বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী’ বলে প্রচারণা চালায়। মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্যমতে, ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠাপোষকতায় দমন-পীড়ন সহ নানা নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে শুরু করে। সেই থেকে কয়েক দফায় বাংলাদেশ ও থ্যাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীরা আশ্রয় নেয়। এখনো ২ লাখের মত শরনার্থী চট্টগ্রাম বিভাগে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সংখ্যাগুরু বার্মিজ সামরিক জান্তার অধীনে মিয়ানমারের অন্যান্য অবার্মিজ জনগোষ্ঠি- শান, কাচিন, কারেনরাও নির্যাতিত হলেও বৌদ্ধ ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা ও পরিধি অনেক বেশি বলে দাবি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের।

Post a Comment

0 Comments