ডেস্ক রিপোর্ট
অসুস্থ প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর অপারেশন করা হল না বন্ধু বিভাষ চন্দ্র সাহার। যাওয়া হল না দীর্ঘদিনের কর্মস্থলে। দেখা হল না প্রিয়জন ও সহকর্মীদের। দানব বাসের চাকা কেড়ে
নিল ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এই সিনিয়র করেসপন্ডেন্টের তরতাজা প্রাণ। এ ছাড়া স্ত্রীকে ঢাকায় চিকিৎসা করাতে এসে একইভাবে প্রাণ হারালেন বরিশাল থেকে প্রকাশিত মতবাদ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু। বিয়োগান্তক পৃথক দুর্ঘটনা দুটি ঘটে গতকাল শুক্রবার যথাক্রমে রাজধানীর ধানমণ্ডির সাতমসজিদ রোডে স্টার কাবাবের সামনে ও শাহবাগে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে।
ধানমণ্ডির থানার উপপরিদর্শক খালেদ মনসুর জানান, গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার পর মোটরসাইকেলে করে ধানমণ্ডির ২ নম্বর সড়কে বেল টাওয়ারে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন বিভাষ। এ সময় স্টার কাবাবের সামনে একটি বাস তাকে চাপা দেয়।
দুর্ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে মৈত্রী পরিবহনের বাসটি ভাঙচুর করে। পুড়িয়ে দেয় মৈত্রী পরিবহনের একটি বাস। পুলিশের সঙ্গে জনতার ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বেশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পুলিশ গাড়িচালকদের পক্ষাবলম্বন করে কথা বলায় জনতা আবারও বিক্ষুদ্ধ হয়ে যানবাহনে ভাঙচুরের চেষ্টা করে।
এদিকে দুর্ঘটনার পরপরই বিভাষকে ধানমণ্ডির পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকার জানান, আগেই তার মৃত্যু হয়েছে। সেখানে তার আÍীয়স্বজন ও সহকর্মী-বন্ধুদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ঘটনাস্থলে পুলিশ দেরিতে যাওয়ায় হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তারা কর্তব্যরত পুলিশের অবহেলার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। রাত পৌনে ৮টার দিকে বিভাষের মরদেহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। বিভাষ চন্দ্র সাহা দীর্ঘ ২০ বছর ধরে অপরাধবিষয়ক সাংবাদিকতা করেছেন। নিঃসন্তান এ সাংবাদিক মৃত্যুকালে তার স্ত্রীকে রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে øাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। মালিবাগ খিলগাঁওয়ের বাসা থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে তিনি ধানমণ্ডির বেল টাওয়ারের অফিসে যাচ্ছিলেন।
আজ শনিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিক বিভাষ চন্দ্র সাহার স্ত্রীর অপারেশন হওয়ার কথা। বেলা আড়াইটার দিকে বিভাষের সঙ্গে শেষ কথা হয় সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার পিনাকী দাসগুপ্তের। তিনি জানান, স্ত্রীর অপারেশনের পূর্বপ্রস্তুতি নিতে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অফিসে যাচ্ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিক বিভাষের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নও (ডিইউজে) বিভাষের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে দায়ী চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিসহ সাংবাদিক ইউনিয়ন গভীর শোক প্রকাশ করে। পাশপাশি তারা ঘাতক বাসচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
গতকাল দুপুরে রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে বাসচাপায় নিহত হন বরিশালের দৈনিক মতবাদ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু। সদরঘাট থেকে মিরপুরগামী ইউনাইটেড পরিবহনের একটি বাস টিটুকে বহনকারী রিকশাকে ধাক্কা দিলে তার চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই টিটু নিহত হন। তিনি অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। এ সময় সঙ্গে থাকা তার বন্ধু সাংবাদিক জান্নাতুল ফেরদৌস আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রমনা থানার পুলিশ জানায়, সাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটুকে যে বাস চাপা দিয়েছে, তার চালক নাঈম মোল্লাকে আটক করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। বরিশাল নগরের কালিবাড়ী রোড এলাকার বাসিন্দা টিটু স্থানীয় দৈনিক মতবাদ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক ছিলেন।
প্রসঙ্গত, গত ৮ জানুয়ারি রাজধানীর কাকরাইল চার্চের সামনে বাসচাপায় নিহত হন আমাদের সময়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক দীনেশ দাস। মেয়েকে স্কুলে দিয়ে মোটরসাইকেলে করে ফিরছিলেন তিনি। এ ছাড়া গত ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি বাসের ধাক্কায় পঙ্গু হন কালের কণ্ঠের প্রতিবেদক নিখিল ভদ্র। তার ডান পা গোড়ালি থেকে কেটে ফেলতে হয়।


0 Comments