-প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন:
আল কায়দার শীর্ষনেতা ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকান্ডের এক বছর পূর্ণ হল ২০১২ সালের ২রা মে। গত বছরের এই দিনে পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদ শহরের একটি কম্পাউন্ডে ঝটিকা আক্রমন চালিয়ে ওসামাকে হত্যা করে মার্কিন সিল কমান্ডো বাহিনী। আমেরিকার প্রতাপ, প্রযুক্তি ও গোয়েন্দাকে ফাঁকি দিয়ে ওসামা দীর্ঘ দশটি বছর লুকিয়ে ছিলেন। ওসামাকে খুঁজে বের করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলো আমেরিকা ও তার দোসরেরা। এ জন্য বিশ্বজুড়ে চলছিল অঘোষিত যুদ্ধ। ওসামাকে ধরতে গিয়ে আমেরিকাকে দখল করতে হয়েছে দুটি দেশ, খরচ হয়েছে প্রায় ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে নিহত হয়েছে লক্ষ লক্ষ
নিরীহ মানুষ।
নিরীহ মানুষ।
ওসামার খোঁজ কিভাবে পাওয়া গেলো সে নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে ওসামার খুব কাছের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে মনে হয়না। তাই যদি হতো, সাদ্দামের মতো অনেক আগেই ধরা পড়তেন তিনি। বিশ্বস্ত সহচর আবু আহমদ আল-কুয়েতীর মাধ্যমেই ওসামা বর্হিবিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। পাকিস্তানের খ্যাতনামা জার্নালিষ্ট নজম শেঠি থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনী নিয়মিত ফোনে অঁড়িপেতে সন্ত্রাশীদের কর্মকান্ড জানার চেষ্টা করত। এ্যাবোটাবাদের ঘটনার ৬-৯ মাস আগে একটি সিম থেকে প্রায় ৬ বার আরবীতে কথাবার্তা ধরা পড়ে। ওই ফোন কলের একটি ছিল এ্যাবোটাবাদের কম্পাউন্ড থেকে যা অবশেষে আমেরিকাকে ওসামার ঠিকানায় নিয়ে যায়। কুয়েতী এ্যাবোটাবাদের কম্পাউন্ডেই থাকতেন এবং তিনি ভুলক্রমে একবার এ্যাবোটাবাদের বাড়ী থেকে ফোন করে বসেন, যা ওসামার কাল হয়ে দাঁড়ায়। তবে অপারেশনের আগে ওসামার অবস্থান সস্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হবার জন্য সিআইএ, পাকিস্তানী ডাক্তার শাকিল আফ্রিদির সাহায্য নেয়। আমেরিকার নির্দেশে টিকাদান কর্মসূচীর নামে ডাঃ অফ্রিদি ওসামার বাড়ীর সদস্যদের রক্ত নমুনা সংগ্রহ করে সিআইএর হাতে তুলে দেয়। অতঃপর ২০১০ সালে বোষ্টনে মারা যাওয়া ওসামার বোনের ডিএনএর সাথে এ্যাবটোবাদের কম্পাউন্ডে বসবাসরত সদস্যদের রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবে আমেরিকা ওসামা ও তার পরিবারের অবস্থান নিশ্চিত করে।
১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা গঠনের পর থেকে ওসামা আমেরিকার রাডারে চলে আসেন। তবে ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে লিখিত ফতোয়া দিয়ে আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করার পর, আমেরিকার এক নম্বর শত্রুতে পরিনত হন ওসামা। ফতোয়ায় কুরআনের আয়াত (৯ঃ৫) এবং হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে আমেরিকা ও তার সহযোগী দেশের সামরিক ও বেসামরিক নাগরিকদের যে কোনো দেশে হত্যা করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য বলে দাবী করা হয়। অথচ কুরআনের আনুষঙ্গিক বানীটির অবতীর্ন হবার কারণ, ওই সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, এবং বর্তমান সময়ে তার উপযোগীতা ইত্যাদি হাদিসের আলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ওসামার ব্যাখার সাথে মেলেনা। জিহাদের নামে বেসামরিক মানুষ হত্যার ফতোয়া দিয়ে ওসামা সন্ত্রাশের পথেই পা বাড়িয়েছিলেন। নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কুরআনের বানীর এ ধরণের অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আফগানী মুজাহিদদের হাতে সোভিয়েত রাশিয়ার পরাজয় ওসামাকে আমেরিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে মনোবল যুগিয়েছিলে বলে জানা যায়। কিন্তু একটি সুপার পাওয়ারকে মোকাবিলা করার জন্য অদম্য সাহসই যে যথেষ্ট নয় তা ওসামার শেষ পরিণতি দেখেই বোঝা যায়। উল্লেখ্য, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ দিয়ে আফগানদের সাহায্য করেছিল আর পাকিস্তানে মাটিতে ছিল আফগানী মুজাহিদদের নিরাপদ আশ্রয়। যুদ্ধ বিশারদদের মতে, আমেরিকার দেয়া ষ্টিঙ্গার মিসাইলই যুদ্ধের ভারসাম্য মুহজাহিদের পক্ষে নিয়ে যায়। ষ্টিঙ্গার মিসাইলের আঘাতে প্রায় ৩০০ রাশিয়ান যুদ্ধবিমান ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে, আফগানিস্তানের আকাশে রাশিয়ার আধিপত্য খর্ব হয়ে যায়। কিন্তু এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল-কায়দার যোদ্ধাদের না আছে উন্নত মানের অস্ত্র, না আছে নিরাপদ আশ্রয়। ড্রোনের আঘাত থেকে বাঁচার জন্য এক আস্তানা থেকে অন্য আস্তানায় পালিয়ে বেড়াতেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আল-কায়দা যোদ্ধাদের যাবতীয় শক্তি। শীর্ষ নেতা ওসামাকেই যদি পলাতক হয়ে দিনের পর দিন বন্দী জীবন কাটাতে হয়, তাহলে তিনি দিক নির্দেশনা দেবেন কিভাবে ?
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, আমেরিকা নিজের মাটিতে বিদেশী আক্রমন কখনোই মেনে নেয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান পার্ল হারবার আক্রমন করলে আমেরিকা কেবল সর্বাত্মক যুদ্ধেই ঝাঁপিয়ে পড়েনি, এটম বোমা ফেলে জাপানকে নতজানু করতে বাধ্য করে। যদিও ওই সময় জাপানকে পরাজিত করার জন্য পারমানবিক বোমার কোনো প্রয়োজন ছিলনা। ৯/১১ পর তাই আমেরিকা বিশাল ঝুঁকি নিয়ে ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমন করতেও দ্বিধা করেনি। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের দীর্ঘ ১০ বছর পরও আল-কায়দার বিরুদ্ধে আমেরিকার লড়াই চালিয়ে যাবার সঙ্কল্প লক্ষ্যণীয়। এ ধরনের শক্তির সাথে লড়াইয়ে নামার আগে নিজের শক্তির দৌড়টা যাচাই করে নেয়া উচিত।
ওসামা হত্যার প্রতিশোধ সরূপ আল-কায়দা, আমেরিকার বিরুদ্ধে বড় আকারের আক্রমনের অঙ্গীকার করলেও পাকিস্তানে তালেবানদের কিছু বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি ছাড়া তেমন কোনোকিছু করতে সমর্থ হয়নি। ইদানিং ইয়ামেনে আল-কায়দাকে কিছুটা সক্রিয় দেখা গেলেও, কিছুদির আগে ড্রোনের ঘাঁয়ে নিহত হয়েছেন তাদের তাত্ত্বিক গুরু, তুখোড় বক্তা আনোয়ার আল-আওলাকি। মোল্লা ওমর সহ তালেবান ও আল-কায়দার শীর্ষনেতাদের হত্যা করতে আমেরিকা এখনও বদ্ধপরিকর। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন যন্ত্রে হাজারেরও বেশী সিএইএ এজেন্ট কাজ করছে। আল-কায়দার নেতারা এখন মূলতঃ আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই পাকিস্তানের এ্যাবোটাবাদে আল-কায়দার সমাপ্তির যে শুরু হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
১৯৭৯ সাল ওসামার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট বলে ধরা হয়। ওই বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী শেষ করেন। আর ১৯৭৯ সালেই ঘটে ইরানের ইসলামিক বিপ্লব এবং আফগানিস্তানে রাশিয়ার আগ্রাসন। সৌদি আরবকে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য ওই বছরই হজ্জ্বের সময় একদল সশস্ত্র বিদ্রোহী ক্কাবা ঘর দখল করে নেয়। একের পর এক এসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রবাহ ওসামাকে ভীষনভাবে প্রভাবিত করে। ওসামা সোভিয়েত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আফগানী মুজাহিদদের সাহায্য করার জন্য পাকিস্তানে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানে যাবার সাথে সাথেই তিনি রাইফেল কাঁধে নিয়ে আফগানিস্তানের ফ্রন্ট লাইনে ছুটে যাননি। ১৯৮৬ সালের পর থেকেই কেবল তিনি সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে সন্মুখ সমরে অংশ নিতে শুরু করেন। আশি দশকের প্রথম পাঁচ বছর ওসামা আফগানী মুজাহিদদের অর্থনৈতিক সাহায্য, অস্ত্র সরবরাহ, আরব দেশগুলো থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ, মুজাহিদদের জন্য রাস্তা ঘাট ও বাঙ্কার নির্মাণ, যুদ্ধে আহতদের সেবার জন্য অস্থায়ী হাসপাতাল, এবং রিফুজীদের ক্যাম্প নির্মাণের কাজে নিরলস পরিশ্রম করে যান। এ ধরণের জনসেবামূলক কাজের মধ্য দিয়ে সাধারণ আফগানী জনতার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নেন ওসামা। তাইতো ২০০১ সালে আমেরিকার কর্তৃক আক্রান্ত হলেও শুভাকাংখী ওসামাকে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়নি আফগানিস্তান।
লাদেনের হত্যা ও শেষকৃত্যের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার মাক্সিষ্ট বিপ্লবী চে গুয়েভেরার বেশ কিছু মিল দেখা যায়। চে গুয়েভেরাকে ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ার জঙ্গলে ধরে হত্যা করা হয়। চের সমাধি যাতে পরে তীর্থস্থানে পরিণত হতে না পারে সে জন্য সিআইএর পরামর্শে একটি গোপন স্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। ওসামাকে হত্যার পর তার মরদেহ কিভাবে সমাহিত করা হবে সে নিয়ে আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা চে গুয়েভেরার কথাই হয়ত স্মরণ করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকার কাছে বিন লাদেন আরো ভয়ংকর ছিল বলেই হয়তো তাকে ভূপৃষ্ঠেও সমাহিত করার ঝুঁকি নেয়নি। মৃত্যুর প্রমান হিসাবে চে গুয়েভেরার মরদেহের ছবি পত্রিকায় ছাপানো হলেও বিন লাদেন ফোবিয়ায় আক্রান্ত আমেরিকা তাও করেনি।
চে গুয়েভেরা এবং ওসামা, দুজনেই বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন বলে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের চোখে তারা যেমন ছিলেন একজন ভয়ংকর সন্ত্রাশী, তেমনি আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য অনেকের কাছে তারা ছিলেন বিদ্রোহের প্রতীক। চে গুয়েভেরা মতো বড় আকারের বুদ্ধিজীবি না হলেও, ওসামার বিরল সাহসিকতা এবং চরিত্রের কারিশমা মানুষকে আকৃষ্ট করতো। বিন লাদেন বহুবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। বিখ্যাত সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের দি গ্রেট ওয়ার ফর সিভিলাইজেশান বই থেকে জানা যায় আফগান যুদ্ধের সময় অন্ততঃ চারবার গোলাবর্ষণের মধ্য থেকে বেঁচে গেছেন ওসামা। একবার বিন লাদেনের কয়েক মিটারের মধ্যে কামানের গোলা পড়েও সেটা ফাটেনি। ১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের ট্রেনিং ক্যাম্পে আমেরিকার ক্রুজ মিসাইল ও ২০০১ সালে আফগানিস্তানের তোরাবোরা পর্বতের গুহায় এক বিধ্বংসী বিমান হামলা থেকেও তিনি অল্পের জন্য রক্ষা পান। মৃত্যুর হাত থেকে অলৌকিকভাবে বারবার বেঁচে যাওয়ার কারনে ওসামা তার অনুসারীদের কাছে জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হন।
গন-জাগরণের জোয়ারে ভাসছে এখন আরব বিশ্ব। আরব দেশগুলিতে আমেরিকা সমর্থিত শাসকদের উৎখাত করে সাত শতকের আদলে ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন ওসামা। যদিও জনগনের বিদ্রোহের মুখে বেশ কটি আরব দেশে ইতিমধ্যে স্বৈারাচারী সরকারের পতন হয়েছে, তবে ওই সব দেশে ওসামার ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলামী খিলাফাত প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম হয়নি। আরব জনগন রাস্তায় নেমেছে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। খোদ আরব জাহানের বিপ্লবে ওসামা দর্শনের অনুপস্থিতি আল-কায়দার জন্য একটি বিশাল রাজনৈতিক পরাজয়ই বটে।
মৃত্যুতে মিল থাকলেও, একজন সফল বিপ্লবী হিসাবে চে গুয়েভেরার সাথে ওসামার তুলনা করা হয়তো সাজেনা। তবে লাদেন ডাইনাস্টির একজন উত্তরসূরী হিসাবে সম্পদের মোহ ছুড়ে ফেলে কাঁধে রাইফেল তুলে নিয়ে তিনি স্বেচ্ছায় যেভাবে দুর্গম গুহার জীবন বেছে নিয়েছিলেন, জীবন বাজী রেখে রশিয়ার বিরুদ্ধে যেভাবে লড়েছেন; সেকথা বিবেচনা করলে ওসামাকে কেবল একজন সন্ত্রাশী হিসাবে ভাবতে দ্বিধা হয় বৈকি ।
(লেখকঃ সিডনী প্রবাসী প্রাবন্ধিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব)


0 Comments