আবদুর রাজ্জাক,মহেশখালী:
কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলায় ক্ষুদ্র ঋণের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠি। ক্ষুদ্র ঋণ দানকারী বিভিন্ন এনজিও থেকে তারা অহরহ ঋণ নিচ্ছে। জানা গেছে একবার যে দরিদ্র লোকটি এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছে সে আর বছরের পর বছর পার হলেও ঐ ঋণের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পায়নি। গ্রামের দরিদ্র সহজ সরল মানুষ এক এনজিওর ঋণ পরিশোধ করার জন্য আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছে। এভাবে একজন দরিদ্র লোক ৭-৮ টি এনজিওর ঋনের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ঋণের টাকা দিতে না পেরে অনেকেই ঋণের টাকা বকেয়া রেখেই গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভিটে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে।
মহেশখালী উপজেলায় ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা, গ্রামীন ব্যাংক, উদ্দীপন, দীপ, ব্যুরো বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনসহ আরো বেশ কিছু এনজিও দরিদ্রদের মাঝে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করছে। অভিযোগ রয়েছে কাগজ পত্রে এসব এনজিওর ঋণের সুদের হার ১৫% দেখানো হলেও বাস্তবে এরা ৩৬% থেকে ৪৫% সুদ নিচ্ছে। কোন কোন এনজিওর সুদের হার ৫০% ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ঋণ গ্রহনকারী দরিদ্র মানুষের পক্ষে যা পরিশোধ করা নিঃসন্দেহে কষ্টকর।
এ প্রসঙ্গে ঋণদান প্রদানকারী এনজিওর ব্র্যাক ম্যানেজার বলেন, আমরা ১৫% সুদ নিচ্ছি। কাউকে ৫ হাজার টাকা দিলে এক বছরে ৫ হাজার ৭ শত ৫০ টাকা নিচ্ছি। এর বেশি নিচ্ছি না। কিন্তু ঋণ গ্রহণকারীরা বলেছেন, এনজিওরা কিস্তি উঠানোর কৌশলেই আমাদের কাছ থেকে বেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আমরা এক বছর এই টাকা খাটানোর সুযোগই পাই না। কখনও কখনও অন্য এনজিও থেকে টাকা এনে কিস্তির মেয়াদ শেষ হবার পূর্বেই আমরা প্রথম যে এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি সেই টাকা পরিশোধ করে আবারও ঐ একই এনজিও থেকে পুনরায় ঋণ নিয়ে দুটি এনজিওর কিস্তি দিতে থাকি। এভাবে একের পর এক এনজিওর সাথে ঋণের বেড়াজালে আটকা পড়ে যাই।
ক্ষুদ্র ঋণ নেয়া দরিদ্র মানুষের কথা জানতে সরেজমিনে খোজ নিয়ে জানা যায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল মহেশখালী উপজেলার পৌরসভা,ছোট মহেশখালী,শাপলাপুর,কুতুবজোম,নতুনবাজার,হোয়ানক,কালারমারছড়া গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে দরিদ্র মানুষেরা বিভিন্ন এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়েছে এবং এখনও নিচ্ছে। একজন লোক একাধিক এনজিও থেকেও ঋণ নিয়েছে। গ্রামবাসির সাথে কথা বলে জানা যায় এই গ্রামগুলোর শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ এনজিওর ঋণ নিয়েছে। ডেইল পাড়া গ্রামের আবুল হোসেন নামক এক ব্যক্তি ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তার স্ত্রীকে নিয়ে শহরে পালিয়ে গেছে। কয়েকমাস আগে এই গ্রামেরই একটি হিন্দু পরিবার ঋণের টাকা বকেয়া রেখে ভারতে পালিয়ে য়ায়।
এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহনকারীরা বলেন, ১৫% সুদের কথা বলা হলেও এনজিওর ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে আরেকটি এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এভাবে ৭টি এনজিওর ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছি। তিনি আরো বলেন, এনজিওরা টাকা দেয় ঠিকই কিন্তু সে টাকা খাটাবার সুযোগ দেয় না। তারা যে সপ্তাহে ঋণ দেয় তার পরবর্তী সপ্তাহ থেকে কিস্তি উঠানো শুরু করে। গ্রামের দরিদ্র অনেকেই জানান, অনেক এনজিও আবার এক হাজার টাকা জমা রেখে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ দেয়। মহেশখালী উপজেলার গ্রামগুলোতে দেখা দেয়, অনেকলোক একাধিক এনজিওর ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে বসত-ভিটা বিক্রি করে ঢাকা চলে গেছেন। ছোট মহেশখালীর সেতারা বেগম ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে এখন শহরে গৃহপরিচারিকার কাজ করছেন। পুঠিবিলা গ্রামের রহিমা খাতুন ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে স্বামীর রিকশা বিক্রি করে দিয়েছেন। এসব ঋণ গ্রহিতা হতভাগ্য মানুষ বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। গ্রামের লোকেরা জানায়, এনজিওগুলো ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ শুরুর পর হতেই গ্রামের লোকদের সঞ্চয়ের মনোভাব দূর হয়ে গেছে। এখন কারো ঘরে জমানো টাকা নেই সকলেই এনজিওর ঋণের কারণে পিছুটানে রয়েছে।
একাধিক জনপ্রতিনিধিরা বলেন, এনজিওর টাকা নিয়ে কখনো কাউকে স্বাবলম্বী হতে দেখিনি। বরং এনজিওর টাকা নিয়ে নিঃস্ব হয়ে চোখের পানি ফেলতে দেখেছি।
কোন ধরনের নিয়ন্ত্রন ছাড়া এ অবস্থা চলতে থাকলে কয়েক বছরের ব্যবধানে উপজেলার গ্রামাঞ্চলে এর সুদুর প্রসারী প্রভাবে গ্রামীন অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়বে বলে আশঙ্কা করেছেন এলাকার সচেতন নাগরিকরা।

0 Comments