Advertisement

নামাজের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

হাসিনা রশীদ

আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অপরাধ দমনের সর্বাধুনিক প্রচেষ্টা পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ায় শান্তিকামী মানুষ প্রায় নিরাশ ও হতাশ হয়ে পড়েছে। এ পর্যায়ে আসমানী ব্যবস্থা তথা
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রদত্ত ব্যবস্থার প্রতি আজও মানুষ গাফেল। কিন্তু নিরাশ হবার সঙ্গত কোন কারণ নেই।
পৃথিবীর অনেক দেশেই চলেছে হানাহানি, রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি, অরাজকতা ,অবিচার ,ব্যভিচার, দুর্নীতি। এক কথায় মানবতার চরম অবমাননা হচ্ছে অহরহ। মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে পশুত্বের পর্যায়ে নেমে এসেছে। এমনকি বর্বরতার যুগ তথা আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগকেও এই তথাকথিত সভ্যতার যুগের অনেক আধুনিক মানুষ হার মানিয়েছে। মানবতার উৎকর্ষ সাধনের সকল জাগতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার গ্লানি ভোগ করেছে, আজকের পৃথিবীর অগণিত মানুষ জেল হাজত থেকে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত আধুনিক যুগের চরম অপরাধ প্রবণতাকে রোধ করতে পারেনি।
আল্লাহতা’আলা মানুষের চরিত্রকে সুসংহত, সুসংযত করার তথা নৈতিক মান উন্নত করার যে ব্যবস্থা পেশ করেছেন তার বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করা কঠিন। তাই পবিত্র কুরআনে ঘোষণা হলো- ‘পাপ প্রতিরোধ, অন্যায়, অবিচার, পাপাচারের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে হলে গ্রহণ করতে হবে নামাযের কর্মসূচী’।
আধুনিক বিশ্বে সকল সুখ-সামর্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনে শান্তি নেই। জীবন দুর্বিষহ, প্রাণ ওষ্ঠাগত, কেননা মানুষ আজ মানুষের জন্য আতংকের কারণ। এ যুগে বন-জঙ্গলের সাপ, বিচ্ছু ও বাঘসহ অন্যান্য হিংস্র জন্তুকে মানুষ ভয় করে না, ভয় করে সর্বাধুনিক পোশাক পরিহিত ক্রেতা-দুরস্ত, স্বার্থের জন্য অন্ধ হামলায় উদ্যত তথাকথিত মানুষকে।
মানবতার অবমাননায় লিপ্ত সভ্যতার কলংক, দুরন্ত দুরাচার মানুষকে সত্যিকার মানুষরূপে গড়ে তোলা, পথভ্রষ্ট মানুষকে সত্যিকার মানুষ বানাবার, পথভ্রষ্ট মানুষকে পথে আনার শক্তি যে কোন জাগতিক ব্যবস্থায় নেই, এ কথার সভ্যতার প্রমাণ আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস।
এমনি অবস্থায় পবিত্র কুরআন প্রদত্ত ইসলামের নির্দেশিত পথ অবলম্বন অবশ্য কর্তব্য। আর সেই পন্থা হলো যথানিয়মে নামায কায়েম করা। যা মানুষকে কুকর্ম, কুকথা, কুচিন্তা তথা পাপ কার্য থেকে বিরত রাখে।
প্রশ্ন হতে পারে যে, বহু নামাযীকেও অন্যায় বা পাপ কাজে লিপ্ত থাকতে দেখি, নামায যে তাদেরকে অন্যায় বা পাপ কার্য থেকে বিরত রাখে না, এর জবাব নিুে আলোকপাত করা হলো-
ইমরান ইবনে হুসাইন থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ ‘ইন্নাস সালাতা আনিল ফাহশায়ে ওয়াল মুনকার’ আয়াতের অর্থ কী? তদুত্তরে তিনি বললেনঃ অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তিকে তার নামায পাপ(অশ্লীল) ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে না, তার নামায কিছুই নয়।’
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের  রেওয়ায়েতে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন ঃ অর্থাৎ ‘যে ব্যক্তি তার নামাযের আনুগত্য করে না, তার নামায কিছুই নয়। প্রকাশ াকে যে, অশ্লীল ও পাপকার্য থেকে বিরত থাকাই নামাযের আনুগত্য।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ যার নামায তাকে সৎকার্য সম্পাদন করতে এবং অসৎকার্য থেকে বিরত াকতে উৎসাহিত করে না, তার নামায তাকে আল্লাহর কাছ থেকে আরো দূরে সরিয়ে দেয়।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলঃ অমুক ব্যক্তি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং সকাল হলে চুরি করে। তিনি বললেনঃ সত্বরই নামায তাকে চুরি থেকে বিরত রাখবে।
এখানে কেউ কেউ সন্দেহ করে যে, অনেক মানুষকে নামাযের অনুবর্তী হওয়া সত্ত্বেও বড় বড় গুনাহে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। এটা আলোচ্য আয়াতের পরিপন্থী নয় কি?
এর জবাবে কোন কোন মুফাসসির কুরআন ব্যাখ্যা করে বলেনঃ আলোচ্য আয়াত থেকে এতটুকু জানা যায় যে, নামায নামাযীকে গুনাহ করতে বাধা প্রদান করলে সে তা থেকে বিরত ও হবে, এটা জরুরী নয়। কোরান হাদীসও তো সকল মানুষকে গুনাহ করতে নিষেধ করে। কিন্তু অনেক মানুষ এই নিষেধের প্রতি ভ্রƒক্ষেপ না করেই গুনাহ করতে থাকে। তাফসীরের সার সংক্ষেপে এই ব্যাখ্যাই অবলম্বন করা হয়েছে।
কিন্তু অধিকাংশ তাফসীরবীদ বলেনঃ নামাযের নিষেধ করার অর্থ শুধু আদেশ প্রদান করা নয়; বরং নামাযের মধ্যে এই বিশেষ প্রতিক্রিয়াও নিহিত আছে যে, যে ব্যক্তি নামায পড়ে, সে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক প্রাপ্ত হয়। যার এই রূপ তাওফিক হয় না, চিন্তা করলে প্রমাণিত হবে যে, তার নামাযে কোন ত্রুটি রয়েছে এবং সে নামায কায়েম করার যথার্থ হক আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে। এক হাদীস থেকে এই বিষয়বস্তুর সমর্থন পাওয়া যায়।
(ওয়া লাযিকরুল্লাহি আকবারু ওয়ালিল্লাহি ইয়ালামু মা তাসমায়ুল)
অর্থাৎ- আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি তোমাদের রব ক্রিয়াকর্ম জানেন। এখানে আল্লাহর স্মরণ এর এক অর্থ এই যে, বান্দা নামাযে অথবা নামাযের বাইরে আল্লাহকে স্মরণ করে, তা সর্বশ্রেষ্ঠ। দ্বিতীয় অর্থ এরূপ ও হতে পারে যে, বান্দা যখন আল্লাহকে স্মরণ করে তখন আল্লাহ তা’য়ালা ওয়াদা অনুযায়ী স্মরণকারী বান্দাকে ফেরেশতাদের সমাবেশে স্মরণ করেন।
“ফাযকুরুনি আযকুরুকুম”
“আল্লাহর এই স্মরণ ইবাদতকারী বান্দার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত।”
এ স্থলে অনেক সাহাবী ও তাবেঈন থেকে এই দ্বিতীয় অর্থই বর্ণিত আছে। ইবনে জরীর ও ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) একেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এই অর্থের দিক দিয়ে এতে এদিকে ও ইঙ্গিত আছে যে, নামায পড়ার মধ্যে গুনাহ থেকে মুক্তির আসল কারণ হলো আল্লাহ স্বয়ং নামাযীর দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ফেরেশতাদের সমাবেশে তাকে স্মরণ করেন। এর কল্যাণেই সে গুনাহ থেকে মুক্তি পায়।

Post a Comment

0 Comments