সৈয়দুল কাদের,কক্সবাজার :
স্বাধীনতার ৪০ বছরে দেশের অধিকাংশ সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান একাধিকবার মহেশখালীতে পদার্পন করেছে। এর পরও কাঙখিত উন্নয়ন না হওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছে ৪ লক্ষ মানুষ। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪০ বছর অতিবাহিত হলেও মহেশখালীর কাংখিত উন্নয়ন হয়নি। প্রাকৃতিক ভাবে চরম ঝুকিপুর্ণ হলেও নির্মিত হয়নি স্থায়ী বেড়ীঁবাধ। ১৯৯১ সালে প্রলয়ংকরি ঘুর্ণী ঝড়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ নিহত হওয়ার পর। বেসরকারি সংস্থা কতৃক ৪৬ টি আশ্রয়ান কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও তার অধিকাংশ অবৈধ দখলে চলে গেছে।
জেলার সবচেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য ঝুকিপুর্ণ হিসাবে চিহ্নিত ধলঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আহচান উল্লাহ বাচ্চু জানান, এই ইউনিয়নের ২০ হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত চরম আতংকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সমুদ্রে গর্জনে রাতের বেলায় মানুষ ঘুমাতে পারেনা। ৯১ এর ঘুর্নীঝড়ে দেশের সবচেয়ে বেশী মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই ইউনিয়নে। প্রায় দুই শতাধীক পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। এর পরও এই ইউনিয়নের তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। ৯৭ সালে প্রয়াত জহিরুল ইসলাম চেয়ারম্যান থাকা কালে অবকাঠামোগত কিছু উন্নয়ন হলেও আর উন্নয়নে ছোঁয়া লাগেনি। বছরের অধিকাংশ সময় সমগ্র এলাকা জোয়ার ভাটায় পতিত হলেও স্থায়ী বেড়ীঁবাধ নির্মাণের প্রয়োজন বোধ করেননি কেউ। যোগাযোগ ব্যাবস্থার কোন উন্নয়ন না হওয়ায় বৃহৎ সুটকী মহালটিও বন্ধ হয়ে গেছে। ধলঘাটার ঘাটটিও এখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা শওকত আলী জানান, যে কটি আশ্রয়ান কেন্দ্র রয়েছে তৎমধ্যে খাতুরপাড়া ও সরাইতলার দুইটি এখন নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। আর অন্য আশ্রয়ান কেন্দ্র গুলোতে গড়ে উঠেছে অবৈধ বসতবাড়ি। আশ্রয়ান কেন্দ্র না থাকায় ৯১ এর ঘূর্ণীঝড়ে আমার পিতা মাতা সহ অনেককেই হারিয়েছি। এই ইউনিয়ন টি জেলার সবচেয়ে অবহেলিত। বর্তমানে ধলঘাটার পশ্চিমে হাসের চর ও লালদিয়ার চর এখন স্থায়ী ভুমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানিয় লোকজন ওই চর গুলোতে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক ঝাউগাছের চার রোপন করেছে। এটিকে সেন্টমার্টিনের মত পর্যটকদের আকর্ষনীয় স্থানে পরিণত করাযায়। কিন্ত এই পর্যন্ত কোন সরকার চর গুলোর উন্নয়নে কোন উদ্যেগ গ্রহন করেনি।
মহেশখালী উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট মোস্তাক আহমদ জানান, মাতারবাড়িতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার এসে জনসভা করেছেন। এসেছিলেন বিগত জোট সরকার ও বিএনপি সরকারের সময়ের একাধিক মন্ত্রী। তারা সকলে ৭০ হাজার মানুষের বসতি এলাকার জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে গেলেও উন্নয়নে কোন কাজ করেননি। এলাকার পশ্চিমাংশে সামন্য স্থায়ী বেঁড়ীবাধ নির্মিত হলেও অধিকাংশ এলাকা রয়েছে জোয়ার ভাটা। অনেক তোড়জেড়ের পর মাতারবাড়ি সংযোগ সেতু নির্মিত হলেও সংযোগ সড়ক নির্মাণে বিলম্বের কারণে তাও অচল হয়ে পড়েছে। চলছে প্যারবন দখলের মহড়া। নতুন ভাবে সৃজিত হয়নি কোন প্যারবন।
কালারমারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মীর কাসেম চৌধুরী জানান, মহেশখালীবাসীর প্রধান দাবি গোরকঘাটা জনতা বাজার সড়ক এখনো পুর্ণতা পায়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন না হওয়ায় বাণিজ্যের দিকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়েছি। চিংড়ি ও পান উৎপাদন করে মহেশখালীর মানুষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্ব পুর্ণ অবদান রাখলেও এই খাত গুলোতে বিনিয়োগে কোন সরকার কার্যকর কোন উদ্যেগ নেয়নি। মহেশখালীর মিষ্টিপান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোতে অবাদে রপ্তানীর সুযোগ সৃষ্টি হলে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার মুল্যের বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
হোয়নক ইউনিয়ন আওমীলীগের সাধারণ সম্পাদক জাফর আলম জফুর জানান,বিগত জোট সরকার,জাতীয় পার্টির সরকার ,জিয়ার শাসনামল ও স্বাধীনতা পরবর্তী ৪ বছর সরকার দলীয় এমপি থাকলেও তারা এলাকার জন্য কি পরিমান কাজ করেছে তা বিবেচনার বিষয়।এরশাদ সরকারের সময়ে মহেশখালী জেটী ও মহেশখাললী কলেজ প্রতিষ্টাই উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বিরোধী দলের এমপি হয়েও একক প্রচেষ্ঠায় হোয়ানক ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্টা করেছেন প্রয়াত ইসহাক মিয়া। সাবেক এমপি আলমগীর ফরিদ নিজের নামে একটি টেকনিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ট করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিনি বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসাবে প্রথম মহেশখালীতে এসেছিলেন। উদ্ভোধন করে ছিলেন মুদিরছড়া এলাকায় খালখনন কর্মসূচী। তা এলাকার মানুষের কোন কাজে না আসলেও এর পরবর্তিতে কোন উন্নয়ন মুলক কাজ হয়নি। ১/১১ এর পরবর্তি সময়ে ৩/৪ মাস মহেশখালীর প্রধান সড়কে বিলাস বহুল বাস চলাচল করলে রাস্তা সংষ্কার না করায় তা স্থায়িভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
শাপলাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এডভোকেট আবদুল খালেক চৌধুরী জানান, বিগত সময়ে নানা প্রতিশ্রতি দিয়ে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর সকলেই এলাকার উন্নয়নে কোন ভুমিকা রাখেননি। ৪০ বছরের অধিকাংশ সময় সরকারি দলের এমপি থাকা সত্বেও কেন কাজ হয়নি তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। শাপলাপুর সড়কটি অতি গুরুত্বপুর্ণ হলেও তা সম্পুর্ণ জরাঝির্ণ হয়ে পড়েছে। মহাজোট সরকারের সময়ে মহেশখালী কতুবদিয়ায় প্রতিনিধি শুন্যতা বিরাজ করছে। অতীতেও কোন নেতা আন্তরিকতার রহিত মহেশখালীর উন্নয়নে যথাযত ভুমিকা রাখেনি। দায়িত্ব প্রাপ্ত মহিলা এমপিও বহু আগে নিজ থেকে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। প্রাকৃতিক ভাবে চরম ঝুঁকিপুর্ণ একটি দ্বীপ হওয়া সত্বেও মহেশখালীর চারপাশে কোন স্থায়ী বেঁড়ীবাধ নির্মিত হয়নি। যুগযুগ ধরে মহেশখালী কক্সবাজার পারাপার ঘাটে মানুষ নানা ভাবে হয়রানির শিকার হলেও এর কোন সুরাহা হয়নি। বাকঁখালী নদীর মোহনায় লঞ্চডুবিতে এডভোকেট রফিকুল্লাহ চৌধুরী সহ অনেক প্রতিবাবান রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু হয়েছে। এই ঘাট পারাপারে মানুষের নিরাপত্তা বিধানে কেউ কোন উদ্যেগ গ্রহন কনেনি। মহেশখালী আদিনাথ জেটী থেকে চৌফলদন্ডি সংযোগ সেতু নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত একটি ফেরীঘাট চালু করলে এ সমস্যা আর থাকেনা।
মহেশখালী পৌর এলাকার মোহাম্মদ নুরুল আলম জানান, আদিনাথ মন্দির ও মহেশখালী পৌর এলাকাকে গড়ে তোলাযায় পর্যটকদের আকর্ষনীয় স্থান হিসাবে। চৌফলদন্ডী মহেশখালী সংযোগ সেতু নিমার্ণের একটি পরিকল্পনা বিগত আওয়ামীলীগ সরকার গ্রহন করলেও এক যুগ পরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এটি বাস্তবায়িত হলে মহেশখালী পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষনী স্থানে পরিণত হতে পারে। সঠিক নেতৃত্ব গড়ে না উঠায় এর কিছুই বাস্তবায়িত হচ্ছেনা। নেপাল সরকারের অর্থায়নে নির্মিত আদিনাথ জেটীও রক্ষানাবেক্ষণের কারণে এখন অচল হতে চলেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কোন উন্নয়ন না হওয়ায় আদিনাথে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকের আগমন দিনদিন কমে যাচ্ছে।
কুতুবজুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌঃ শফিউল আলম জানান, এই ইউনিয়নের আওতায় রয়েছে সোনাদিয়া,ঘটিভংগা ও তাজিয়াকাটা এলকা। বিগত ঘূর্ণিঝড়ের সময় এখানে ব্যাপক লোকের প্রাণ হানি ঘটেছে। এর পরও নির্মিত হয়নি স্থায়ি বেড়ীঁবাঁধ এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়ান কেন্দ্র। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ এখনো শুরু না হওয়ায় মানুষের মাঝে হতাশা বেড়েছে। এই ইউনিয়নটি কক্সবাজারের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা যায়।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ টি এম কাউচার জানান, সরকারি উন্নয়ন পরিকল্পনা যথাযত ভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে কথা বলার কেউ না থাকায় এলাকার উন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্ধ পাওয়া যাচ্ছেনা। সরকার দেশের সকল উপজেলার জন্য যা বরাদ্ধ দেয় তা আমরা যথাযত ভাবে বাস্তবায়ন করেছি।

0 Comments