Advertisement

১০ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক চাই: খালেদা


ঢাকা, মার্চ ১২ : ‘বাধার’ পরও বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থকের উপস্থিতিতে বহুল আলোচিত মহাসমাবেশে নতুন জোটের ঘোষণা দিয়ে আগামী ১০ জুনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি পুনর্বহালের জন্য সরকারকে সময় বেঁধে দিয়েছেন খালেদা জিয়া।
এই সমাবেশে বাধা ও গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ২৯ মার্চ সারাদেশে হরতালও ডেকেছেন তিনি। 
সোমবার বিকাল ৪টা ৪০ মিনিট থেকে ৬টা পর্যন্ত টানা বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে চারদলীয় জোট স¤প্রসারণের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা। 
এরপর তিনি বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ছাড়া কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। নতুন জোটের পক্ষ থেকে বলছি, আগামী ১০ জুনের মধ্যে তত্ত্ববধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধানে পুনঃস্থাপন না করা হলে ১১ জুন জোটের পক্ষ থেকে ঢাকায় সমাবেশে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।” 
বর্তমান সরকারকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে কী কী করবে, তা জনসভায় তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন। 
তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিদের হাতে আরো ক্ষমতা দেব। দ্রব্যমূল্য ক্রয় ক্ষমতায় আনা হবে। প্রাথমিকভাবে ১ কোটি গরিব মানুষকে রেশন ব্যবস্থায় আনা হবে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। ইসলামী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। 
নতুন কলকারখানা চালু এবং বন্ধগুলো চালু করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে খালেদা বলেন, “কীভাবে দেব, সেই টেকনিক আমাদের আছে, এখন বলব না। সময় হলেই বলব।” 
যুবকদের কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়ে তা পূরণের বিষয়েও একই কথা বলেন তিনি। 
বক্তব্যে এর আগে সরকারের সমালোচনা করে খালেদা বলেন, “এই সরকারের আমলে সীমান্তে নিরাপত্তা বলে কিছুই নেই। বিএসএফ ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশিদের হত্যা করেছে। এই সরকার প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি।” 
ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “তিস্তা চুক্তির কথা বলা হয়েছিল, কোথায় চুক্তি, কোথায় চুক্তির পানি? 
“আমরা বলতে চাই, আমরা প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই। কিন্তু একতরফা দিয়ে যাব, বিনিময়ে কিছুই পাব না, সেটা হবে গোলামি। এই সরকার গোলামির চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। এই দুর্বল-নতজানু সরকারকে বিদায় করতে হবে।” 
গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরানো সরকারের প্রতিহিংসামূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশ বলে দাবি করেন তিনি। 
খালেদা জিয়া বলেন, “লোডশেডিংয়ে আজ জীবন অতিষ্ঠ। অথচ কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের নামে দলীয় লোকজন ও আত্মীয় স্বজনদের লুটপাটের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ দিতে নয়, লুটপাটের জন্যই এই কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টের কাজ বিনা দরপত্রে দেওয়া হয়েছে।” 
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাড়ানোর সমালোচনাও করেন তিনি। 
পুঁজিবাজারের অর্থ লুটপাট হয়েছে দাবি করে খালেদা বলেন, “শেয়ার মার্কেটে এতবড় লুট হয়ে গেল, তাদের কারো বিচার হয়নি, বরং তাদের আরো অধিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বললেন, যারা লুট করেছে, তারা এত ক্ষমতাবান, তাদের নাম প্রকাশ করার ক্ষমতা তার নেই। তাহলে বুঝতে বাকি থাকে না, এই ক্ষমতাবান ব্যক্তি কারা। 
“এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের লোকজন যারা জড়িত, তাদের জনগণ চিনে ফেলেছে,” বলেন তিনি। 
অর্থনীতিতে সঙ্কট চলছে দাবি করে বিরোধী নেতা বলেন, “তারা ১০ টাকা কেজিতে চাল দিতে পারেনি, কৃষকদের বিনামূল্যে সার দিতে পারেনি, শুধু তাই নয়, প্রতিটি কৃষি উপকরণের দাম বাড়িয়েছে। সারের দাম তিন গুণ বাড়িয়েছে।” 
সরকার গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছে দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “সত্য খবর দেয় বলে গণমাধ্যমকে ভয় পায় সরকার। এই সময়ে ১৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সবশেষ খুন হয়েছে সাগর-রুনি। এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার-টিচার আর হবে না। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দায়িত্ব নিয়ে এখন বলছেন, আলামত মুছে গেছে। আলামত মুছে ফেলে এখন বলেন, মুছে গেছে!” 
সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যেতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়ে তাতে বিএনপির সমর্থন থাকবে বলে জানান তিনি। 
খালেদা জিয়া বলেন, “বিএনপির এই মহাসমাবেশ লাইভ টেলিকাস্ট করতে চেয়েছিল এনটিভি, ইটিভি ও বাংলাভিশন। কিন্তু তাদের লাইসেন্স বাতিলের হুমকি দেওয়া হয়েছে।” 
খালেদা বলেন, “বিচার বিভাগ আজ সম্পূর্ণ দলীয়করণ করা হয়েছে। অনেক বিচারক চাইলেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। এই জন্য ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, দেশে আজ মুখ চেয়ে রায় দেওয়া হয়।” 
“এখন আওয়ামী লীগের জন্য এক বিচার, অন্যদের জন্য আরেক বিচার,” বলেন তিনি। 
দেশে একদলীয় শাসন চলছে দাবি করে খালেদা বলেন, “দেশে এখন বাকশাল চলছে। গণতন্ত্র এখন বন্দি, এক জনের শাসন চলছে। এই গণতন্ত্র উদ্ধার করতে হবে।” 
সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনারা মুখ খুলুন, নইলে পরে জনরোষে পড়বেন। জনগণের হাতে লাঞ্ছিত হবেন।” 
আইএসআইয়ের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে নির্বাচন করার সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমাদের বিদেশি টাকার প্রয়োজন হয় না। আমাদের জনগণ রয়েছে।” 
উল্টো আওয়ামী লীগই বিদেশি অর্থে নির্বাচন করেছিল বলে দাবি করেন তিনি। 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, “এমন কিছু বলবেন না, যাতে দেশের মানুষ লজ্জা পায়। প্রধানমন্ত্রীর পদের একটি মহিমা আছে, তা নষ্ট করবেন না।” 
মহাসমাবেশে পদে পদে বাধা দেওয়া হয়েছে দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, “সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, তাই তাদের এত ভয়। সরকার এখন আতঙ্কে ভুগছে। তাদের ভয় এখন জনগণকে। এতই যদি ভাল কাজ করেন, উন্নয়ন করেন, তবে কেন এত ভয়?” 
বক্তব্যের শুরুতেই খালেদা বলেন, “এই মহাসমাবেশে বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। তিন দিন ধরে ঢাকা অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ব্যাপক বাধা উপেক্ষা করে তারপরও আপনারা এখানে উপস্থিত হয়েছেন, এ জন্য ধন্যবাদ। বাধা দিয়েও জনস্রোত ঠেকানো যায়নি।” 
“সরকার যদি এতই জনপ্রিয়, তবে কেন তাদের এত ভয়,” সমাবেশে বাধার প্রতিক্রিয়ায় বলেন তিনি। 
বর্তমান সরকার একদলীয় বাকশালের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দাবি করে খালেদা বলেন, “এই সরকার অন্ধ, বধির, চোখে দেখে না, কানে শোনে না। আমরা বলতে চাই সমাবেশ-সভা-মিছিল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এতে বাধা দেওয়া বাংলার জনগণ মেনে নেবে না।” 
মহাসমাবেশের আগে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে অন্তরীণ সবার মুক্তি দাবি করেন তিনি। “এই সরকার জনগণের সরকার নয়, মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার,” বলেন তিনি। 
দুপুর দেড়টার দিকে শুরু হওয়া এই জনসভায় এর আগে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতারা বক্তব্য দেন। সাদেক হোসেন খোকার সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই সমাবেশে বেলা আড়াইটায় পৌঁছান বিএনপি চেয়ারপারসন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Post a Comment

0 Comments