আবদুর রাজ্জাক,মহেশখালী-৯ ফেব্রুয়ারী॥
বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুরা ফের দুইটি ফিশিং ট্রলারে হামলা চালিয়ে মাছ,জাল ও মেশনসহ প্রায় ১০ লক্ষ টাকার মালামাল ডাকাতি করে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এ সময় ডাকাতদলের এলোপাতাড়ী গুলি বর্ষণে ১৫ মাঝি-মাল্লা গুলি বিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত ৯ ফেব্রুয়ারী ভোর রাত্রে বঙ্গোপসাগরের লাশের ধার নামক স্থানে।
আহত মাঝি মাল্লা সুত্রে জানা যায়, গত ৯ ফেব্রুয়ারী ভোর রাত্রে মহেশখালী পৌরসভার পুটিবিলা ইউনিয়নের মো: ইয়াছির ও মো: ছৈয়দ এর মালিকানাধীন এফ.বি তাসিম ও এফ.বি রিসা মনি নামের ফিশিং ট্রলার দু’টি সাগর থেকে মাছ ধরা শেষে ফিরে আসার পথে মধ্যে সোনাদিয়া চ্যানেলে লাশের ধার নামক স্থানে পৌছলে অজ্ঞাতনামা ৩০/৪০ জনের একদল সশস্ত্র জলদস্যু ট্রলার দুটির চারিদিকে ঘিরে ফিলে এলোপাতাড়ী গুলিবর্ষণ করে মাঝিমাল্লাদের ব্যাপক ভাবে মারধর করে ট্রলারে থাকা বিপুল পরিমান মাছ,জাল ও মেশিনসহ প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তাদের গুলিবর্ষণে ১৫ মাঝিমাল্লা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে আবদুর রহিম,নাসির উদ্দিন,মো: মনির মাঝি,সাহাব উদ্দিন,গিয়াস উদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আলমের অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় তাদেরকে জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরন করেন। এ ব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। জানা যায়,কক্সবাজারের উপকুলীয় মহেশখালী-কুতুবদিয়া সমুদ্র চ্যানেলে সম্প্রতি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ডাকাতি,মাঝি মাল্লাদের অপহরণ,চোরাচালান,দস্যুতা,মুক্তিপন আদায় ও টোকেনের মাধ্যমে চাদাঁবাজীর ঘটনা। সাগরে মাতামুহুরী নদীর মোহনা মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেল ও নদীর মোহনা সন্নিহিত এলাকায় নৌযান নিয়ে চলাচলকারী জেলেরা অতিষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে জেলে পরিবার গুলো সব সময় আতংক, উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠার মধ্যে থাকে । বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে অব্যহত ডাকাতি ও চাদাঁবাজির কারনে র্সব শান্ত হয়ে অনেক জেলে এ পেশা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে সমুদ্রে আন্ত: জেলা জলদস্যু গ্রুপের অন্তত ৩/৪’শ সদস্য সক্রিয় রয়েছে । ওরা প্রতিনিয়ত সাগরে বিভিন্ন মাছ ধরার ট্রলার ডাকাতি করে চলছে বলে সুত্রে প্রকাশ। কক্রাবাজার ও মহেশখালীর বোট মালিকরা সাগরের মাছ আহরণ করার জন্য ট্রলার পাঠিয়ে দ্বীপে ফিরে না আসা পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়ার আশংকায় থাকে। জলদস্যুদের কবল থেকে ফিরে আসা জেলেরা জানায়, বিশেষ করে সোনাদিয়া,ঘটিভাংগা,ধলঘাটা,মাতারবাড়ী,কালারমার ছড়া,চকরিয়া ও কুতুবদিয়া এলাকার একটি সঙ্গবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রন হয়। জানা গেছে, কালারমারছড়া এলাকার একটি গ্রুপের সঙ্গে কুতুবজোম,ঘটিভাঙ্গা,সোনাদিয়া ও ধলঘাট এলাকার খন্ড খন্ড কয়েকটি দস্যু গ্রুপের মধ্যে সেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে। অপরদিকে কালারমারছড়ার কালা জাহাঙ্গীর/বজল গ্রুপ ও সোনাদিয়া মোহনা এলাকায় জাম্বু/নাগু গ্রুপ টোকেন দিয়ে চাঁদাবাজিসহ সমুদ্রে নানা অপকর্ম অব্যহত রেখেছে। সম্প্রতি ওই গ্রুপের দলনেতা জাম্বু ও তার বাহিনীকে র্দীঘ দু’ঘন্টা বন্দুক যুদ্ধের পর পুলিশ গ্রেফতারের পর কিছুদিন শান্ত ছিল কিন্তু তারা ফের জামিনে বেরিয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে ডাকাতি ও দস্যুতা শুরু করে দিয়েছে। এব্যাপারে একাধিক ট্রলার মালিকরা জানান, নিয়মিত মাসোহারা দিতে অপারগ হলে পরবর্তি এই ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া মাত্র ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতরা ইঞ্জিন,জাল,আহরন কৃত মাছ,তেল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি লুট করে নিয়ে যায়। খালি ট্রলারটি ফুটো করে সাগরে ডুবিয়ে দেয়। ফলে কিছু মাঝি মাল্লারা সাতাঁর কেটে তীরে ফিরে আসলেও অনেকে সাগরে প্রান হারায়। এসময় জলদস্যুরা মাঝি মাল্লাদের অপহরন করে মুক্তিপন আদায় করে। অপরদিকে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের ভয়ে মহেশখালী উপজেলার অন্তত ১৫ হাজার জেলে সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছে না। এ কারণে জেলে পল্ল¬ীর অন্তত ৩০ হাজার লোকজন অর্ধহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে বলে জানা গেছে। জানা যায়, গত নভেম্বর মাসের শুরুতেই মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপের পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে জলদস্যূদের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন এলাকার ফেরারি,চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ডাকাতরা সাগর দ্বীপ সোনাদিয়ায় আশ্রয় নিয়ে ৫টি গ্রুপে ভাগ হয়ে সাগরে জলদস্যূতা চালাচ্ছে। গত ২০ নভেম্বর থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটিভাঙ্গা ও তাজিয়াকাটার অন্তত ৫০টি ফিশিং বোট জলদস্যূদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে এখন পথে বসেছে জেলে ও বোটের মালিকরা। আহত হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক। স্থানীয় জেলেরা জানান, গত মাস থেকে সাগরে জলদস্যূদের তৎপরতা আশংকা জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে জলদস্যূদের ভয়ে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পাচ্ছি না। কুলে ফিরে আসা আহত ফিশিং বোটের মাঝি মনির বলেন, সম্প্রতি সাগরে জলদস্যূরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। এতে প্রতিনিয়ত সাগর থেকে ফিশিং বোট কুলে ফেরারপথে জলদস্যূদের কবলে পড়ে স্বর্বশ্ব হারাচ্ছে। জলদস্যূদের হামলায় আহত হচ্ছে ফিশিং বোটের শ্রমিকরা। এনিয়ে জেলেদের মাঝে চরম আতংক বিরাজ করছে।
এ ব্যাপারে কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা শফিউল আলম বলেন, বিভিন্ন এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও ফেরারী আসামীরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সোনাদিয়া আশ্রয় নিয়েছে এবং সোনাদিয়ার পেশাদার জলদস্যূরা মিলে ওই বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ৫টি গ্রুপে ভাগ হয়ে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যূতা চালাচ্ছে। এতে সাগরে জলদস্যূতা বন্ধের জন্য প্রশাসন এনিয়ে কোন ব্যবস্থা না নেওয়ায় জেলে ও ফিশিং বোটের মালিকদের মাঝে চরম ভাবে আতংক বিরাজ করছে। আর অর্ধহারে-অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে এই এলাকার ২০হাজার মানুষ। মহেশখালী থানার অফিসার্স ইচার্জ রনজিত কুমার বড়–য়া বলেন, এনিয়ে ফিশিং বোটের মালিকদের পক্ষে থানায় কোন অভিযোগ করেননি। তবে জলদস্যূতা বন্ধে মহেশখালী চ্যানেলের আশে পাশে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এটিএম কাউসার হোসেন বলেন, সম্প্রতি সাগরে জলদস্যূরা বেপরোয়া হয়ে ওঠায় জেলে ও ফিশিং বোটের মালিকরা আতংকিত হয়ে পড়েছে। তাই ডাকাত কবলিত এলাকায় নৌ-বাহিনী ও কোষ্টগার্ডের অভিযান জোরদার করার জন্য জেলা প্রশাসক সহ কোষ্টগার্ড ও নৌবাহিনীকে জানানো হয়েছে।


0 Comments