Advertisement

চট্টগ্রামের জনসমুদ্রে বেগম জিয়া : আ'লীগের ইতিহাস দূভর্ীৰ ও লুটপাটের : ওয়াদা না রাখার জবাব দিতে প্রস্তুত হোন :১২ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ

মোবারক উদ্দিন নয়ন, চট্টগ্রাম থেকে ফিরে 
মহাজোট সরকারকে বিদায় করতে আগামী ১২ মার্চ রাজধানীতে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে চট্টগ্রাম রোডমার্চের শেষে সোমবার বিকেলে পলোগ্রাউন্ড মাঠের জনসভায় তিনি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, "আমরা ফেরেশতা নই, মানুষ। অতীতে আমাদের কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে। অতীতের সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে দেশের জন্য কাজ ক বো।"
জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আপনারা সস্নোগান দিচ্ছেন এই মুহূর্তে দরকার খালেদা জিয়ার সরকার। আমি বলতে চাই 'খালেদা জিয়ার নয়, এই মুহূর্তে দরকার জনগণের সরকার।' আমরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের সরকারই কায়েম করবো।'' 

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি'র সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়া বলেন, "এই সরকারের বয়স তিন বছর। তারা তিন বছরে দেশ ও মানুষের জন্য কোন কাজ করেনি। নির্বাচনের সময় যেসব ওয়াদা দিয়েছিলো তা একটিও পূরণ করেনি। মঈন উদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সময় চাল ডাল তেলের দাম বেড়েছিল। তখন তারা ওয়াদা করেছিল দাম কমাবে। কিন্তু কমায়নি।" তিনি বলেন, এখন ডাল ১২০ টাকা, তেল দেড়'শ টাকা, মোটা চাল কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। মানুষ খেতে পায় না। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা লাখ লাখ টাকা খরচ করে তাদের সন্তানদের বিয়ে দেয়। দিনের পর বাড়িঘরে আলোকসজ্জা করে রাখে।" তিনি বলেন, "দশ টাকা কেজি চাল, ঘরে ঘরে চাকরি, দেয়া কথা ওয়াদা করেছিল। কিন্তু দিতে পারেনি।"
তিনি বলেন, "এখন বিদেশে তাদের কোন বন্ধু নেই। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক যাচ্ছে না। মালয়শিয়াতেও শ্রমিক নেয়া বন্ধ। প্রতিনিয়ত বিদেশ থেকে মানুষ ফিরে আসছে। তাই উন্নয়নের কথা আওয়ামী লীগের মুখে শোভা পায় না।" তিনি বলেন, "ফখরুদ্দীন-মঈন উদ্দিনের সময় ব্যাপক দুনর্ীতি হয়েছে। আর আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। আজকে সারা দেশে দুনর্ীতি ছড়িয়ে পড়েছে। উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সবাই দুনর্ীতির সঙ্গে জড়িত। বিনা টেন্ডারে কুইক রেন্টাল পাওয়ার প?ান্ট নিজেদের দলের লোকদের দিয়েছে। এই খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে গেছে। বিদ্যুতের এই ভতর্ুকির জন্য দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।" খালেদা জিয়া বলেন, "এখন অনেক মিল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই চট্টগ্রামের মানুষও বিদ্যুৎ পায় না। সরকারের পরিকলনা হলো আমাদের শিল কারখানা বন্ধ হবে আর ভারতের লোকেরা এসব কিনে নেবে।" তিনি বলেন, "যারা ফ?াটের ব্যবসা করেন তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফ?াট বানিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যুতের জন্য ফ?াট ভাড়া দিতে পারছেন না।"
ট্রানজিটের নামে করিডোর দেয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, "ক্ষমতায় আসার জন্য ভারতীয়দের যেসব কথা দিয়েছিলো সব তারা রক্ষা করেছে। নদীর উপর বাঁধ দিয়ে ভারতের গাড়ি চলার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের রাস্তায় আমাদের গাড়ি চলতে পারবে না। সেখানে ভারতের গাড়ি চলবে। তিতাস নদীতে বাঁধ দিয়ে ভারতে গাড়ি চলার জন্য রাস্তা বানিয়েছে। এতে কৃষি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে। সেখানের মানুষ প্রতিবাদ করায় তাদের ওপর নিযর্াতন চালাচ্ছে।" তিনি বলেন, "সরকার ভারতকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আপনারা কি বন্দর ব্যবহার করতে দিবেন। তখন জনগণ না সূচক উত্তর দেয়।" বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, "প্রতিনিয়ত সীমান্তে ভারতীয়রা বাংলাদেশের মানুষ গুলি করে হত্যা করছে। ফেলানীকে হত্যা করে লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছে। এই সরকার তার প্রতিবাদ করতে পারে না। এদেরকে কি আপনারা দেশপ্রেমিক সরকার বলবেন?" তিনি বলেন, "এ সরকার জনগণের সরকার নয়। এরা ভারতের পুতুল সরকার। এরা বিডিআরকে ধ্বংস করেছে। সেখানে সেনাবাহিনীর ৫৭ জন দক্ষ ও চৌকস অফিসারকে হত্যা করেছে। এখন সাজানো বিচার করছে। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিচার একদিন হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রকৃত দোষীদের বিচার করা হবে।"
খালেদা জিয়া বলেন, "আওয়ামী লীগের ইতিহাস একদলীয় শাসনের ইতিহাস, গণতন্ত্র ধ্বংসের ইতিহাস। আওয়ামী লীগের ইতিহাস মানুষ হত্যার ইতিহাস, দুর্ভিক্ষের ইতিহাস। স্বাধীনতার পরে লাল বাহিনী, নীল বাহিনী, রক্ষী বাহিনী গঠন করে তারা ৪০ হাজার রাজনৈতিক নেতাকমর্ীকে হত্যা করেছিলো। সিরাজ সিকদারকে হত্যা করেছে।" খালেদা বলেন, "একদিকে হত্যাকারীদের বিচার করবেন অন্যদিকে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ছেড়ে দেবেন, তা হবে না। এই দ্বৈতনীতি পরিহার করতে হবে।" তিনি বলেন, "এখন প্রতিনিয়ত মানুষ গুম হচ্ছে। সেনাবাহিনীর অফিসারও গুম হচ্ছে। লাশ পাওয়া যাচ্ছে না।" তিনি বলেন, "স্বাধীনতার পরে ভারতীয়রা বলেছিল বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সেনাবাহিনীর দরকার নেই। ৭১-৭৫ সালে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ছিল ছোট আকারে। তখন মাত্র ৪টি ব্রিগেড ছিল। তখন তাদের ইউনিফরম ছিল না। থাকার জায়গা ছিল না। অথচ রক্ষীবাহিনীর জন্য সুন্দর সুন্দর ইউনিফরম দিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নামমাত্র সেনাবাহিনী থাকবে। আর নিয়ন্ত্রণ করবে ভারত।" তিনি বলেন, "আমরা পিন্ডির শৃঙ্খল ভেঙে দিলি?র শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য দেশ স্বাধীন করিনি। ভারতে সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধিতা নেই। তাদের সঙ্গে আমরাও বন্ধুত্ব চাই। তবে তা হবে সমমযর্াদার ভিত্তিতে। সব তাদেরকে দিয়ে দেবো বিনিময়ে কিছু পাবোনা, তা হবে না। তারা প্রতিটি নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশকে মরুভূমিতে পরিণত করেছে। এসব ঠেকাতে হবে।" পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও শেখ হাসিনার মধ্যে মধুর সম্পর্ক থাকেলও তিস্তার পানি দেয়নি উলে?খ করে খালেদা জিয়া বলেন, "হাসুদির সঙ্গে মমতাদির এতো সম্পর্ক, তারপরও তিস্তার পানি পেলেন না কেনো?" এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রটোকল ভেঙে ভারতে গেলেন। মমতাদি'র জন্য ইলিশ মাছ, মিষ্টি, জামদানি শাড়ি নিয়ে গেলেন। তারপর তারা বললো বষর্াকালে পানি দেবে। কিন্তু বষর্াকালে আমাদের তো পানি দরকার নেই।"
খালেদা জিয়া বলেন, "আওয়ামী লীগ নিজেদের অধীনে নির্বাচন করতে চায়। তাদের অধীনে কখনো ফেয়ার ইলেকশন হয়নি। ৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রায় সব সিট পাওয়ার পরও কয়েকটি সিটের জন্য হেলিকপারে করে ব্যালট নিয়ে এসে নিজেদের দলের লোকদের জিতিয়ে ছিল। যারা হেলিকপারে ব্যালট আনে তাদের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না।" তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, "সাহাব উদ্দিন, হাবিবুর রহমান ও লতিফুর রহমানের সময় নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে। তারা ফখরুদ্দিন সরকারের কথা বলে। আমরা ফখরুদ্দিন সরকারকে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলি না। তারা ছিল একটি অবৈধ সরকার। ২২ জানুয়ারি ২০০৭ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না যাওয়ার কারণেই দেশের তখন ওই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এজন্য আওয়ামী লীগের একদিন বিচার হবে।"
১৯৯৫ সালের একটি ইনকিলাব পত্রিকা দেখিয়ে তিনি বলেন, "এই পত্রিকায় লেখা রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না: শেখ হাসিনা। এই ছিল তার দাবি। তাহলে এখন আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাচ্ছি তাতে দোষের কি আছে।" এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য শেখ হাসিনা জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি'র বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। তখন জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ছিল না, ভালো ছিল। এখন তারা খারাপ হয়ে গেছে।"
এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা বানানোর পরিকল্পনা সফল হবে না উলে?খ করে তিনি বলেন, "১৯৮৬ সালে লালদীঘির ময়দানে শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন যারা নির্বাচনে যাবে তারা জাতীয় বেঈমান। তার কয়েক ঘণা পরই ঢাকায় গিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সেই নির্বাচনেও জামায়াতকে সঙ্গে নিয়েছিল। তখন এরশাদ ক্ষমতায় গিয়েছিল আর হাসিনা ছিল বিরোধী দলে। এখন আবার পরিকলনা করছে হাসিনা ক্ষমতায় যাবে আর এরশাদকে বিরোধী দলের নেতা বানাবে। এরশাদের ঋণ পরিশোধ করবে।"
খালেদা জিয়া বলেন, "কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। সরকার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের উদাহরণ দেয়। এগুলো কোনো বিষয় নয়।" তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে লোক দেখানো সংলাপ করছে। আসলে রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা নেই। আওয়ামী লীগ যা বলবে রাষ্ট্রপতি তার বাইরে কিছু করতে পারবে না। সার্চ কমিটি বানিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করার পাঁয়তারা করছে। সেনাবাহিনী যাতে মোতায়েন করা না যায় সেজন্য আইন করেছে।" সেনাবাহিনী কারো পক্ষে চুরি করে না উলে?খ করে খালেদা জিয়া বলেন, "সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থেকে চুরি পাহারা দেয়। সেজন্য সেনাবাহিনীকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করে কি করে আবার ক্ষমতায় আসবে তার পরিকল্পনা করছে।" তিনি বলেন, "চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ কোনো উন্নয়ন করেনি। যা উন্নয়ন হয়েছে সব আমাদের সময় হয়েছে। এখানে একজন মেয়র ছিলো যার জন্য কোনো কাজ করা যায়নি। কর্ণফুলি সেতুর ভিত্তি প্রস্তর করার দিনও হরতাল দিয়েছিল।" তিনি বলেন, "কর্ণফুলি সেতু, গোমতি সেতু, ভৈরব সেতু, যমুনা সেতু, লালন সেতুসহ সব বড় বড় সেতু আমরাই করেছি। তারা শুধু উদ্বোধন করতে পারে। কোনো কাজ করতে পারে না। বলেছিল পদা সেতু করবে, তখন মনে করেছিলাম এবার মনে হয় আওয়ামী লীগ কিছু করে দেখাবে। কিন্তু দুনর্ীতির কারণে তাও পারেনি। এই পদা সেতু একটি নয়, আমরা মাওয়া ও দৌলতদিয়ায় দুটি পদা সেতু করবো।"
তিনি বলেন, "বিএনপি সবসময় জনকল্যাণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগ শুধু দেশকে ধ্বংস করেছে। এই দেশকে আবার নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।"যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "আমরা ক্ষমতায় গেলে তোমাদের জন্য কাজ করবো। তোমাদের জন্য কর্মসংস্থান ও ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যবস্থা করবো। আমরা নবীন প্রবীণের সমন্বয়ে একটি সুন্দর দেশ গড়ে তুলবো।" দুনর্ীতি দূর, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, যানজটমুক্ত শহর, কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, "আগামিতে ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ বিএনপি নয় বরং একটি শক্তিশালী নিরপেক্ষ প্রসাশন গড়ে তুলবো। প্রশাসনের যাদের চাকরি গেছে তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেয়া হবে। পুলিশ সেনাবাহিনীসহ সবাইকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হবে।" খালেদা জিয়া বলেন "আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করবো। এতে বাধা দিলে দায়দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হবে।" এসময় তিনি সরকারকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। কর্মসূচি: ২৯ জানুয়ারি ঢাকাসহ সকল বিভাগীয় শহরে গণমিছিল। ফেব্রুয়ারি মাসে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ। ১২ মার্চ 'চল চল ঢাকা চল' কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকায় মহাসমাবেশ।

Post a Comment

0 Comments