আবদুর রাজ্জাক,মহেশখালী:
গভীর বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া চ্যানেলে মহেশখালীর একটি ফিশিং ট্রলারে জলদস্যুরা ট্রলারে থাকা ১১ জন মাঝিমাল্লাদেরকে সাগরের নিক্ষেপ করে উক্ত ফিশিং ট্রলারটি ডাকাতি করে নিয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ৬ জন গত ১২ ডিসেম্বর গভীর রাত্রে তীরে ফিরে আসলেও বাকী ৫ জন মাঝিমাল্লা এখনো নিখোজ রয়েছে বলে উদ্ধার হওয়া মাঝিমাল্লা সুত্রে প্রকাশ। ঘঠনাটি ঘটেছে ১১ ডিসেম্বর গভীর রাত্রে বঙ্গোপসাগরের ১২ বিউ নামক স্থানে ।
জানা যায়, গত ৯ ডিসেম্বর উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাংগা এলাকার ওসমান আলীর মালিকানাধীন একটি ফিশিং ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। গভীর বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরা শেষে গত ১১ ডিসেম্বর ফিরে আসার পথিমধ্যে ১২ বিউ নামক স্থানে পৌছলে একদল ডাকাত তাদের ফিশিং ট্রলারটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে অস্ত্রের মুখে মাঝিমাল্লাদের জিম্মী করে সাগরে নিক্ষেপ করে ডাকাতদল ওই ট্রলারটি নিয়ে পালিয়ে যায়। র্দীঘ দুই দিন সাগরে ভাসমান অবস্থায় পাশ্বর্বতী এলাকার একটি ট্রলার ১১ জন মাঝি মাল্লার মধ্যে ৬ জনকে মূর্মূষ অবস্থায় গত ১২ ডিসেম্বর রাত্রে উদ্ধার করে মহেশখালীতে নিয়ে আসে। বাকী ৫ জন মাঝিমাল্লা এখনো নিখোঝ রয়েছে। এ ব্যাপারে ট্রলারের মালিক ১৩ ডিসেম্বর মহেশখালী থানায় একটি নিখোজ ডাইরী করেন।
এ দিকে গভীর বঙ্গোপসাগরে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে মহেশখালীর প্রায় ৪০টি ফিশিং ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে বলে ডাকাত কবলিত আহত মাঝি মাল্লা সুত্রে জানা গেছে। ডাকাতরা ফিশিং ট্রলার গুলো থেকে মাছ,জাল,মেশিনসহ প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় তাদের হামলায় ৩০ জনেরও অধিক জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার অবস্থা আশংকাজনক বলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে।
এ দিকে কক্সবাজারের উপকুলীয় দ্বীপ মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সমুদ্র চ্যানেলে ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ডাকাতি,মাঝি মাল¬াদের অপহরণ,চোরাচালান,দস্যুতা,মুক্তিপন আদায় ও টোকেনের মাধ্যমে চাদাঁবাজীর ঘটনা। সাগরে মাতামুহুরী নদীর মোহনা মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেল ও নদীর মোহনা সন্নিহিত এলাকায় নৌযান নিয়ে চলাচলকারী জেলেরা অতিষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে জেলে পরিবার গুলো সব সময় আতংক, উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠার মধ্যে থাকে । বঙ্গেপসাগরের বিভিন্ন পয়েন্টে অব্যহত ডাকাতি ও চাদাঁবাজির কারনে র্সব শান্ত হয়ে অনেক জেলে এ পেশা পাল্টাতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে সমুদ্রে আন্ত: জেলা জলদস্যু গ্রপের অন্তত ৩/৪শ সদস্য সক্রিয় রয়েছে । ওরা প্রতিনিয়ত সাগরে বিভিন্ন মাছ ধরার ট্রলার ডাকাতি করে চলছে বলে সুত্রে প্রকাশ। কক্রাবাজার ও মহেশখালীর ফিশিং বোট মালিকরা সাগরের মাছ আহরণ করার জন্য ট্রলার পাঠিয়ে দ্বীপে ফিরে না আসা পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়ার আশংকায় থাকে। জলদস্যুদের কবল থেকে ফিরে আসা জেলেরা জানায়, বিশেষ করে সোনাদিয়া,ঘটিভাংগা,ধলঘাটা,মাতারবাড়ী,কালারমার ছড়া,চকরিয়া ও কুতুবদিয়া এলাকার একটি সঙ্গবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব নিয়ন্ত্রন হয় এবং পুলিশের র্সোস পরিচয়দানকারী বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে এ সিন্ডিকেটের যোগসুত্রতা রয়েছে বলে সুত্রে প্রকাশ। জানা গেছে, কালারমারছড়া এলাকার একটি গ্রপের সঙ্গে কুতুবজোম,ঘটিভাঙ্গা,সোনাদিয়া ও ধলঘাট এলাকার খন্ড খন্ড কয়েকটি দস্যু গ্রপের মধ্যে সেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম অব্যহত রয়েছে। গত কিছু দিন আগে এ সিন্ডিকেটটি মহেশখালী,কুতুবদিয়া,বাশঁখালী ও চট্রগ্রামের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি মাছ ধরার ট্রলারে দস্যুতা ও মোটা অংকের চাঁদাবাজি করেছে। অপরদিকে কালারমারছড়ার কালা জাহাঙ্গীর গ্রপ ও সোনাদিয়া মোহনা এলাকায় জাম্বু গ্রপ টোকেন দিয়ে চাঁদাবাজিসহ সমুদ্রে নানা অপকর্ম অব্যহত রেখেছে। সম্প্রতি ওই গ্রপের দলনেতা জাম্বু ও তার বাহিনীকে র্দীঘ দুঘন্টা বন্দুক যুদ্ধের পর পুলিশ গ্রেফতারের পর কিছুদিন শান্ত ছিল কিন্তু তারা ফের জামিনে বেরিয়ে এসে আরো বেপরোয়া হয়ে ডাকাতি ও দস্যুতা শুরু করে দিয়েছে। জলদস্যুদের হাতে জেলে পরিবার গুলো সব সময় জিম্মি থাকে।এব্যাপারে একাধিক ট্রলার মালিকরা জানান, নিয়মিত মাসোহারা দিতে অপারগ হলে পরবর্তি এই ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া মাত্র ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতরা ইঞ্জিন,জাল,আহরন কৃত মাছ,তেল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি লুট করে নিয়ে যায়। খালি ট্রলারটি ফুটো করে সাগরে ডুবিয়ে দেয়। ফলে কিছু মাঝি মাল¬ারা সাতাঁর কেটে তীরে ফিরে আসলেও অনেকে সাগরে প্রান হারায়। এসময় জলদস্যুরা মাঝি মাল¬াদের অপহরন করে মুক্তিপন আদায় করে। তাছাড়া এ চ্যানেল দিয়ে মায়ানমার থেকে আসা বেল্ডার লবন,বিভিন্ন ব্রান্ডের বিদেশী মদ, সিরামিক পণ্যসহ এবং এখান থেকে মায়ানমারে যাওয়া জন্ম নিয়ন্ত্রন বডি,বিভিন্ন প্রকার ওষুধ,চোরাই কাঠসহ বিভিন্ন চোরাচালান নিয়ন্ত্রন করছে এ সিন্ডিকেটটি। মায়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যের দস্যুদের সঙ্গে এদের মোবাইলে যোগাযোগ থাকায় সিন্ডিকেটের সঙ্গে বনিবনা না করে কোন চালান পাচার হতে গেলে দস্যুরা এসব ট্রলার উপকুলে নিয়ে এসে মালামাল খালাস করে নেয়। সম্প্রতি মহেশখালীতে এরকম বেশ কয়েকটি মদের চালান খালাস হওয়ার পর বর্তমানে এলাকায় হাত বাড়ালেই এক থেকে দেড় শ টাকায় বিদেশী মদ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে কুতুবজোম ইউপি চেয়ারম্যান মৌঃ শফিউল আলম জানান, সাগরে জলদস্যুদের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে অনিহা প্রকাশ করছে । এ পর্যন্ত কুতুবজোম ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ টির মত ফিশিং ট্রলার ডাকাত কবলিত হয়েছে এবং ৩০/৪০ জনের অধিক জেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়ে মানবেতর জীবণ যাপন করছে। ফলে জেলে পরিবার গুলোতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। তিনি সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে অবিলম্বে সাগরে নৌ-টহল জোরদার ও কোষ্ট গার্ড ফাঁড়ি স্থাপনের দাবী জানান।

0 Comments