-প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন:
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে ক্রমশঃ উত্তাল হচ্ছে স্বদেশ। বিশেষ করে একতরফাভাবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও মণিপুর রাজ্যের মধ্যে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের জন্য যৌথ চুক্তি স্বাক্ষর করার খবর শুনে ক্ষোভে ফুঁসছে দেশের মানুষ। বাংলাদেশকে না জানিয়ে কোনো কিছু করা হবেনা, বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবেনামনমোহন সিং এ ধরণের অঙ্গীকার এখন ফাঁকা বুলি
বলেই মনে হচ্ছে। টিপাইমুখ বাঁধ হলে ভারতের মণিপুর রাজ্য, বাংলাদেশের সিলেট সহ আরো পাঁচটি জেলা পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। জীবিকা হারাবে কোটি কোটি মানুষ। ধূলিস্মাৎ হয়ে যাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও আদিবাসীদের নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। অন্যদিকে পকেট ভরবে দুর্ণীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও ঠিকাদারদের।
বলেই মনে হচ্ছে। টিপাইমুখ বাঁধ হলে ভারতের মণিপুর রাজ্য, বাংলাদেশের সিলেট সহ আরো পাঁচটি জেলা পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। জীবিকা হারাবে কোটি কোটি মানুষ। ধূলিস্মাৎ হয়ে যাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও আদিবাসীদের নদীকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। অন্যদিকে পকেট ভরবে দুর্ণীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও ঠিকাদারদের।
ভারতের মণিপুর রাজ্যের টিপাইমুখে বরাক নদীর উপর যে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে তার উচ্চতা হল ১৬৩ মিটার ও দৈর্ঘ্য ৩৯০ মিটার। বারাক নদী ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিভিন্ন নাম নিয়ে পরে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। এই মেঘনা চাঁদপুরের কাছে গঙ্গা ও যমুনার সাথে মিলিত হয়ে পড়েছে বঙ্গোপসাগরে। টিপাইমুখ সহ মেঘনা নদীকে পানি সরবারাহ করে থাকে এমন সব নদীতে বাঁধ দেয়ার যে পরিকল্পনা ভারত করছে, তাতে মেঘনা নদী পদ্মার মত মরুভমিতে পরিণত হবে, যা ভাবলে শিউরে উঠি। ভারত আশ্বাস দিচ্ছে, এই বাঁধ নির্মাণ করা হলে বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হবেনা । একটি চলমান নদীর প্রবাহ রোধ করে প্রায় ষাট তলা উচু বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে অথচ তাতে কোনো ক্ষতি হবেনা, একথা একজন পাগলও বিশ্বাস করবে কিনা জানিনা।
ভারতের কাছ থেকে টিপাইমুখী প্রকল্পের বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে কোনো সমীক্ষা না পেলেও, Institute of Water Modelling (IWM) এর একটি রিপোর্ট থেকে এ সম্পর্কে যা জানা যায়, তা সত্যিই ভয়াবহ (সূত্র ১)। টিপাইমুখ বাঁধের কারণে মেঘনা নদীর মোহনায় পানির গভীরতা কমে যাবে, নোনা পানিতে আক্রান্ত হবে সিলেট শহর। সিলেট সহ ১৬টি জেলার মরুকরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং বিপর্যস্ত হবে কোটি কোটি মানুষ। পানির অভাবে বিল, হাওর শুকিয়ে কৃষি, মাছ, ও নৌ চলাচল বিঘিত হবে; পরিবেশের ভারসাম্য হবে নষ্ট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নীচে নেমে যাবে, ফলে নলকূপে খাবার ও সেচের পানি পাওয়া যাবেনা। এছাড়া বর্ষার সময় জলাধার থেকে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার পর ভাটি এলাকায় হবে দুর্বিষহ বন্যা, নদীভাঙন ও ভূমিধ্বসে ধ্বংস হবে জনপদ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁধ ভেঙ্গে যাবার ঘটনা ঘটেছে বহুবার। টিপাইমুখ বাঁধ নির্মিত হচ্ছে ভারতের সর্বোচ্চ ভুমিকম্পপ্রবণ এলাকায়। টিপাইমুখ বাঁধ থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ্যরে মধ্যে গত ১০০ বছরে শতাধিক ভমিকম্প ঘটেছে। টিপাইমুখ বাঁধের ১৬৩ মিটার গভীর জলাধারের তলদেশে প্রতি বর্গমিটারে পানির চাপ হবে প্রায় ১৬০ টন (১ লক্ষ ৬০ হাজার কিলোগ্রাম !)।ভমিকম্প হলে এই চাপ বেড়ে যাবে আরো কয়েকগুন। ফলে বাঁধ বিধ্বস্ত হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে বহুগুন। আর এই বাঁধ ভেঙ্গে গেলে কি ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বাঁধ ভাঙ্গার এক দিনের মধ্যে ২০০ কিলোমিটারেরও বেশী বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল প্লাবিত হবে। দুর্বার গতিতে ধাবিত জলরাশি, ও আবর্র্জনার নীচে তিন কোটি বাংলাদেশীর সলিল সমাধি ঘটতে পারে। জাপানে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া সুনামীর ভিডিও দেখে এই ভয়ংকর পরিণতির কিছুটা ধারনা পাওয়া যেতে পারে।
ভারতের টিপাইমুখ বাঁধ করার একটি অন্যতম কারণ হল, অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা (সর্বোচ্চ ১৫০০ মেগাওয়াট)। ভারতকে বিশ্বের একটি সুপার-পাওয়ার হিসাবেই এখন গণ্য করা হচ্ছে। ভারতের শিল্প-কারখানার জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন যে রয়েছে তা আমি মানি; কিন্তু সেটা আমাদের নদীর শ্বাসরোধ করে নয়, বাংলাদেশের স্বার্থকে বলি দিয়ে নয়। ভারত সোলার এনার্জি ও পরমানু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাহায্যে সহজেই বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারে।
ছোটবেলায় বাবা সরকারী চাকুরী করতেন বলে শৈশবের বেশ কিছু সময় আমার কেটেছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে কিভাবে চোখের সামনে প্রমত্য পদ্মার নির্মম মৃত্যু হয়েছে তা আমি দেখেছি। ছোট বেলায় আমরা প্রায়ই হার্ডিঞ্জ সেতু পার হয়ে পদ্মার ওপারে যেতাম পিকনিক করতে। এছাড়া চাটগাঁ যাওয়া আসা করার সময় ষ্টীমারে করে নদী পাড়ি দিতে হত। মনে পড়ে পদ্মার ভয়াল রূপের কথা। এপারে দাঁড়ালে থেকে ওপার দেখা যেতোনা। এখন সেই হার্ডিঞ্জ সেতুর নীচে দিগন্ত জুড়ে যখন দেখি ধূ ধূ বালি, তখন খুব কষ্ট হয়। কে যেনো শুষে নিয়েছে সব পানি। বেঁচে থাকার অবলম্বন ফসলী জমি হারিয়ে কত পরিবার রিক্ত, কপর্দকশূন্য হয়েছেন কে জানে? সাধারণ জনগন টিপাইমুখ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ও এর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত না জানলেও ফারাক্কা বাঁধের দুঃস্বপ্ন এখনো তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। টিপাইমুখ নামের আরেকটি মরণফাঁদে বাংলাদেশ পা দিক, এটা কারো কাম্য নয়।
আশা করছি, টিপাইমুখ নিয়ে এবার কোনো রাজনীতি হবেনা। সম্প্রতি বাংলাদেশের পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর হতাশাজনক মন্তব্যের পর, প্রধানমন্ত্রী একতরফাভাবে টিপাইমুখী বাঁধ মেনে নেয়া হবেনা বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আশাব্যঞ্জক। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রীও এই ইস্যুতে সরকারের পাশে দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়েছেন । অষ্ট্রেলিয়ার অভিঞ্জতা থেকে দেখেছি, জাতীয় ইস্যুতে যাবতীয় মত-পার্থক্য পেছনে ফেলে সরকার ও বিরোধী দলগুলো একতাবদ্ধ হয়ে অধিকার রক্ষায় রুখে দাঁড়ায়। বন্ধু রাষ্ট্র হলেও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে চুল পরিমান ছাড় দিতে তারা রাজী নন। এজন্য বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবার ভয়ও তারা করেন না। এ হচ্ছে স্বদেশপ্রেম। ওরা যদি পারে আমরা পারবোনা কেনো ?
টিপাইমুখ ইস্যুকে ফলপ্রসূ করার জন্য দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যমতের প্রয়োজন রয়েছে। এককভাবে কোনো দলের পক্ষে এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। আগে কি হয়নি, কি করা উচিত ছিল,সেটা নিয়ে দোষারোপ করার এখন সময় নয়। তবে টিপাইমুখ ইস্যুতে সবাকেই এক প্লাটফর্মে আনার দায়িত্ব সরকারেরই সবচেয়ে বেশী বলে আমি মনে করি। বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে কৃতিত্ব নেয়ার জন্য সরকার যদি এককভাবে এগিয়ে যান সেটা হবে মারাত্মক ভুল। সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ এমন সুযোগ কাজে লাগালে জনগনের কাছে সরকারের ভাবমূর্তিও যাবে বেড়ে। আমি নিশ্চিত, একথা বোঝার মত বোদ্ধা মানুষ সরকারী দলে আছেন।
টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে জন সংযোগের মাধ্যমে দেশের ভেতরে ও বাইরে এখনই আন্দোলন
গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির এই যুগে ফেসবুক, টুইটার ও অর্ন্তজালে ব্লগিং হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। টিপাইমুখ ইস্যুর পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীরাও চালাতে পারেন সংঘবদ্ধ অভিযান। আসুন, সবাই মিলে প্রতিবাদী কন্ঠে আওয়াজ তুলিঃআর কোনো নদীর মৃত্যু নয়, চাইনা টিপাইমুখ বাঁধ

0 Comments