Advertisement

কক্সবাজারের শুটকী মহালগুলোতে বছরে উৎপাদিত হচ্ছে হাজার কোটি টাকার শুটকী

দেশের সর্ববৃহৎ শুটকী প্রক্রিয়াকরন কেন্দ্র কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক শুটকী মহালে বছরে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি শুটকী মাছ উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে ৭ থেকে ৯ মাস পর্যন্ত শুটকী প্রক্রিয়ার মওসুম থাকে। আর এ মওসুমের শুরুতেই শুটকী ব্যবসায়ীরা পুরোদমে নেমে পড়েছেন শুটকী প্রক্রিয়াকরনে।
গতকাল সরেজমিনে শুটকী মহাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার শ্রমিক শুটকী প্রক্রিয়াকরনে কাজ করছে। নাজিরারটেক মৎস্য ব্যবসায়ী
 বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আতিকুল্লাহ জানান, দেশের এই বৃহৎ শুটকী মহালে দিন দিন উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবারে আরো অর্ধশত শুটকী ব্যবসায়ী বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে শ্রমিকের সংখ্যাও। গত বছর ২৫ হাজার শ্রমিক থাকলেও এবারে তা প্রায় ৪০ হাজারের কাছাকাছি হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা এখন মাছ শুকানোর জায়গা পাচ্ছেন না। সাগরে মাছের অফুরন্ত ভান্ডার রয়েছে। গত ৪/৫ দিন ধরে প্রচুর লইট্যা ও ছুরি মাছ ধরা পড়ছে বলে তিনি জানান। আর এসব মাছ যদি শুটকী করা না হয় তাহলে তা নষ্ঠ হয়ে যাবে।  নাজিরারটেক মৎস্য বহুমুখী সমবায় সমিতির ৮৪০ জন সদস্য সহ সহস্রাধিক শুটকী মাছ ব্যবসায়ী বর্তমানে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি শুটকী মাছ প্রক্রিয়া করে থাকে বলে জানান আতিকুল্লাহ। কিন্তু দীর্ঘদিনেও উক্ত এলাকায় কোন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও মৎস্যজীবীদের মাঝে কোন প্রশিক্ষন এর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
সরেজমিন নাজিরারটেক শুটকি মহাল এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ ৪০ বছর আগে থেকে ধীরে ধীরে নাজিরারটেক এলাকায় শুটকী মহালটি গড়ে উঠে। বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি মৎস্য ব্যবসায়ী বছরে হাজার কোটি টাকার মাছ প্রক্রিয়াজাত করছে এই শুটকী মহালে। এসব শুটকী মাছ চালান করে দেয়া হয় দেশের বৃহৎ দুট্ িশুটকী আড়ৎ চট্রগ্রামের আশুগন্জ ও চাক্তাই এ। আড়ৎ দুটিতে সপ্তাহে শনিবার ও মঙ্গলবার দুটি বাজার বসে। এই দুটি বাজারে নাজিরারটেক শুটকী মহাল থেকে অর্ধশতাধিক ট্রাকে করে প্রায় ৪শ টন শুটকী পাঠানো হয় প্রতি সপ্তাহে।

চট্রগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে নাজিরারটেক শুটকী মহালের মাছ। চাহিদা অনুসারে দেশের ব্ইারেও যাচ্ছে শুটকী। কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকরাও কক্সবাজারের শুটকী না নিয়ে কক্সবাজার ছাড়তে চান না। এছাড়া অনেক শুটকী মাছ ব্যবসায়ী এই মহাল থেকে প্ইাকারী হারে মাছ কিনে তা বিভিন্ন বাজার ও মহল্লায় নিয়ে বিক্রি করে থাকে।

উখিয়ার কোটবাজার এলাকার পাইকারী শুটকী ব্যবসায়ী সুজন বড়–য়া বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে নাজিরার ট্কে থেকে পাইকারী দরে শুটকী কিনে কোটবাজারে বিক্রি করে থাকি। তার মতো শতাধিক খুচরা ব্যবসায়ী প্রতিদিন শুটকী মহালে শুটকী মাছ কিনতে আসেন বলে তিনি জানান। শুটকী ছাড়াও খামারের মাছ ও মুরগীর খাদ্যের জন্য বছরে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন মাছের গুড়িও উৎপাদিত হচ্ছে এই শুটকী মহালে। তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ও মুরগীর খাদ্য তৈরীর মিলে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এসব মাছের গুড়ি বিক্রি হয় প্রতি টন ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা।

শুটকী প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর মওসুমে প্রায় ২৫ হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন  প্রজাতির মাছ শুকানো হয় এই শুটকী মহালে। ৩০ থেকে ৩৫ প্রজাতির এসব মাছ শুকাতে মওসুমে পালাক্রমে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করে । এ শুটকী মহালে কক্সবাজার উপক’লের মাছ ছাড়াও চট্রগ্রাম থেকে ট্রাকে ট্রাকে মাছ আনা হয় শুকানোর জন্য।

গত বছরের তুলনায় শুটকী মহালেই প্রতি কেজি সুরমা(মাইট্যা) ৫২০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০০/৭০০ টাকা, চান্দা ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা, লাক্কা ১৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ২২০০টাকা, বড় ছুরি ৫২০ টাকা থেকে কমে ৪০০/৪৫০টাকা, ছোট ছুরি ১৮০ টাকা, ফাইস্যা ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০টাকা, ছোট পোহা ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০টাকা, অলুয়া ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০টাকা, নারিকইল্যা ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০টাকা, নাইল্যা ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০টাকা, কেচকি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০টাকা, চিংড়ি সাদা ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০০টাকা, কালো চিংড়ি ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০টাকা, লাল চিংড়ি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা, হাঙ্গর ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা, পাতা ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা, বাইলা ১১০ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকা, সাংরাই ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকা, লেজু পোহা ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৪০০ টাকা, ভোত পোহা ৭৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা, লোহামরি ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০ টাকা, পাত্রা ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকা, করইত্যা ২৪০ টাকা দরে পাইকারী হারে বিক্রি  হচ্ছে।

শুটকী ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদ বলেন, আগের তুলনায় মাছের দাম এখন অনেক বেশি। একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকেও এখন নুন্যতম ৬ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসায় নামতে হচ্ছে। মোঃ আতিকুল্লাহ, আমান উল্লাহ , বাদশা মাঝি এবং মৌঃ ছৈয়দ নুর হলেন এই মহালের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী। তারা প্রত্যেকেই বছরে প্রায় ৫ কোটি টাকার শুটকী মাছ প্রক্রিয়াজাত করেন। অন্যদিকে সরকার খাস খালেকশনের মাধ্যমে প্রতি ট্রাক শুটকী থেকে ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা। আর বস্তা প্রতি আদায় করা হয় ২০ টাকা হারে। এভাবে সরকারের কোষাগারে জমা হচ্ছে বছরে ১২ লাখ টাকারও বেশি।

নাজিরারটেক মৎস্য ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ আতিকুল্লাহ জানান, নাজিরারটেক শুটকী মহাল থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার শুটকী উৎপাদিত হচ্ছে। আর এ শুটকী মহালের সাথে জড়িত আছে সহস্রাধিক শুটকী ব্যবসায়ী ও প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক।

অথচ এ শুটকী মহালের উন্নয়নে কোন ভুমিকা নেয়নি সরকার। শুটকী মহালের যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ার কারনে প্রতি ট্রাকে ১৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া গুনতে হয়। এরপরও প্রতি বছর সমিতির তহবিল থেকে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে রাস্তা সংস্কার করা হয়।

তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে যুদ্ধ করেই মৎসজীবীরা জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। এর উপর দেশের এই বৃহৎ শুটকী মহাল উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুটকী মহাল সরানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, দেশের সর্ববৃহৎ শুটকী প্রক্রিয়াকরন কেন্দ্র হিসেবে নাজিরাটেক কে স্থায়ী ভাবে গড়ে তোলা এ উপকুলীয় এলাকার মৎস্যজীবীদের প্রানের দাবী বলে তিনি বনিক বার্তাকে জানিয়েছেন।

Post a Comment

0 Comments