Advertisement

প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে ডেভেলপার কোম্পানীগুলোর প্লট বাণিজ্য : হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও সেখানে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কাজে নেমেছে কয়েকটি বেসরকারি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। সেন্টমার্টিনের মাটি,পানি ও উদ্ভিদের কোনোরকম ক্ষতিসাধন ও পরিবর্তন না করার আইন বহাল থাকা সত্ত্বেও আরএফ বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। '

কক্সবাজারে ফ্ল্যাট বুকিংয়ে সেন্টমার্টিনে প্লট ফ্রি শীর্ষক সচিত্র বিজ্ঞাপন চার সপ্তাহ ধরে জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় আরএফ বিল্ডার্স প্রকাশ করলেও নির্বিকার পরিবেশ অধিদপ্তর।

পরিবেশ ও প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হলে সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত অবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে বলে পরিবেশবাদীরা আশঙ্কা করছেন। এই দ্বীপে জনসংখ্যা পাঁচ হাজার থাকার কথা হলেও এখন তা সাত হাজারের বেশি বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.আইনুন নিশাত।
তিনি বলেন, 'সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করতে হলে ওখানকার জনবসতি সরিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে সব ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি সরকারকে কিনতে হবে। পর্যটকরা সকালে সেন্টমার্টিনে পৌঁছার পর সন্ধ্যার আগে দ্বীপ ছেড়ে আসবে এ ধরনের পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন।

প্রবাল কীটের ওপর গড়ে ওঠা এই দ্বীপের মাটি ও উদ্ভিদের পরিবর্তন করা হলে দ্বীপের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া।

তিনি জানান, সেন্টমার্টিনে প্রায় হাজারো প্রজাতির জীববৈচিত্র্য রয়েছে।এখানকার মাটি, পানি ও উদ্ভিদের ক্ষতিসাধন করা হলে এসব জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে এবং প্রবালকীটগুলো মারা যেতে পারে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ১২ বছর আগে ১৯৯৯ সালে সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন,সেন্টমার্টিনে কোনো ধরনের স্থাপনা বা ভূমির পরিবর্তন, পরিমার্জন, মাটি ও পানির কোনোরূপ ক্ষতিসাধন বা পরিবর্তন, উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থলের পরিবর্তনসাধন করা যাবে না। কেউ তা লঙ্ঘন করলে পরিবেশ আইনে তিন বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয়দন্ডে দন্ডিত হতে পারে।

আইন অমান্য করে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার বিষয়ে আরএফ বিল্ডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন কিংবা চেয়ারম্যান আহমেদ শফিকের সঙ্গে কথা বলা যায়নি তাঁরা দেশের বাইরে থাকায়। ম্যানেজার সাইফুল হক বলেন, 'আমরাও জানি সরকার সেন্টমার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। তাই ওখানে সরকারি আইন অনুযায়ী উন্নয়ন করতে হবে এই শর্তেই প্লট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএফ বিল্ডার্সের একজন কর্মকর্তা জানান, সেন্টমার্টিনে আরএফ বিল্ডার্সের কেনা বিশাল জায়গা দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কক্সবাজারে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির কৌশল হিসেবেই সেন্টমার্টিনের এই প্লট ফ্রি অফার দেওয়া হয়েছে।গত বছরের ডিসেম্বরে সেন্টমার্টিনে অবৈধ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান চালিয়েছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মুনীর চৌধুরী।

কক্সবাজারে অ্যাপার্টমেন্ট বুকিং দিলে সেন্টমার্টিনে সাফ কবলায় প্লট ফ্রি বিজ্ঞাপন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,এটা শুধু পরিবেশ আইন অমান্য নয়, দেশের আইনকেও চ্যালেঞ্জ করার শামিল। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্লট হস্তান্তর করার অধিকার কোনো ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়নি, এটা সম্পূর্ণ অবৈধ। অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে এবং কলাতলী এলাকার তিনটি বহুতল ভবনে এক হাজার ৭৯৩টি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট থাকার কথা জানিয়েছে আরএফ বিল্ডার্স। ২৪৫ বর্গফুট থেকে ৫৭০ বর্গফুট আয়তনের এসব স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের একটি বুকিং দিলেই সেন্টমার্টিনে দুই কাঠার একটি প্লট ফ্রি বলা হচ্ছে। সেন্টমার্টিনের প্রায় ৮০ একর জায়গায় এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএফ বিল্ডার্সের একজন মার্কেটিং কর্মকর্তা বলেন, কক্সবাজারে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বুকিং দেওয়া হলে সেন্টমার্টিনে দুই কাঠার একটি প্লট দেওয়া হবে। স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে বুকিং দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেন্টমার্টিনে প্লটের দলিল হস্তান্তর করা হবে।তবে সেন্টমার্টিনের কোথায় এই ভূমি রয়েছে,তা তিনি জানেন না, কারণ কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিষয়টি জানায়।

Post a Comment

0 Comments