Advertisement

নাইন ইলেভেন :১০ বছর পূর্তি আজ

ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর: যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার ১০ বছর পূর্তি আজ। ২০০১ সালের এই দিনে দেশটির কয়েকটি স্থাপনায় সিরিজ আত্মঘাতী হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এই একটি দিন মার্কিন নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছে, সেইসঙ্গে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতিরও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশক্তি হিসেবে নিজের এক নম্বর স্থানটি পাকা করে নেয়া যুক্তরাষ্ট্র স্বার্থ রক্ষায় স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকেই
 প্রিএম্পটিভ মেজারস বা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আগেই পদক্ষেপ নেয়ায় বিশ্বাসী। আর সেখানে নাইন-ইলেভেনের হামলায় গুড়িয়ে যায় বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রতীক টুইন টাওয়ার, আংশিক বিধ্বস্ত হয় পেন্টাগন।

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে বুশ প্রশাসন। প্যাট্রিয়ট অ্যাক্টের মতো আইন জারি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী যেকোনো মানুষের জীবনে অনুপ্রবেশের ক্ষমতা দেয়া হয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে। সেইসঙ্গে সন্দেহের ভিত্তিতে যে কাউকে আটকের অনুমতিও দেয়া হয়।

জঙ্গি দমনের নামে প্রথমে আফগানিস্তান ও পরে ইরাকে আগ্রাসন এবং পাকিস্তানে অভিযান চালানোর অভিযোগে বুশকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে বারাক ওবামার কাছে।

নাইন ইলেভেন-পরবর্তী ১০ বছরে পৃথিবী দেখেছে জঙ্গিবাদের আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠা। ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধে সামরিক অর্থনীতি লাভবান হলেও লোকসান গুণেছে মানবতা।

তাই ১০ বছর পরও নাইন ইলেভেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে একটি কথাই: সংঘর্ষে সমাধান নেই।

নাইন-ইলেভেনে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসের আশঙ্কা
নাইন-ইলেভেনের দশম বার্ষিকীতে আল-কায়েদা ওয়াশিংটন অথবা নিউ ইয়র্কে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে এবং সেজন্য বাইরে থেকে হামলাকারী পাঠিয়েছে, বলছেন সরকারি কর্মকর্তারা৷

মার্কিন কর্মকর্তাদের এ খবর অংশত সিআইএ’র সূত্রে৷ সরকারি এক কর্মকর্তা বলেছেন, আল-কায়েদা তিনজন হামলাকারি পাঠিয়েছে, যাদের মধ্যে দু’জন মার্কিন নাগরিক হতে পারে৷ তাদের লক্ষ্য হলো, ওয়াশিংটন কিংবা নিউ ইয়র্কে একটি গাড়ি-বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো৷ এবং তা সম্ভব না হলে, যতটা সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি ঘটানো৷ গত সপ্তাহের মাঝামাঝি নাকি এ খবর মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায়৷ সিআইএ’র এক অতীতে আস্থাজনক ইনফর্মার বিদেশে গুপ্তচর বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায় যে, আল-কায়েদার নতুন নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরি স্বয়ং এই আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছে৷

গোপন ওই তথ্যদাতার খবর, সম্ভাব্য আক্রমণকারীরা জাতিতে আরব হবে এবং সম্ভবত আরবি ছাড়াও ইংরেজি বলতে পারবে৷ যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ দফতরের কর্মকর্তারা নাকি কিছু কিছু বিশেষ নামের ওপর নজর রাখছেন- যদিও সেগুলো মেকিও হতে পারে৷ কর্মকর্তারা হুমকিটা কতদূর সত্য, তা নির্ধারণ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারেননি৷ কিন্তু ওয়াশিংটন এবং নিউ ইয়র্কে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় এ্যাসল্ট রাইফেল হাতে পুলিশ, বিভিন্ন স্থানে মোটরচালকদের জন্য পুলিশি চেকপয়েন্ট৷

সব সত্ত্বেও নিউ ইয়র্কের মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ সাবওয়ে ধরে সিটি হলে তার অফিসে গেছেন৷ নগরবাসীদের প্রতি তার বক্তব্য: সতর্ক থাকুন,  কিন্তু নিজেদের কাজকর্ম ঠিকই করে যান৷ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও রবিবার নিউ ইয়র্কে গিয়ে নাইন-ইলেভেনের স্মারক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার পরিকল্পনা বজায় রাখছেন৷ বলা যেতে পারে, নাইন-ইলেভেনের বার্ষিকী সন্ত্রাসবাদীদের জন্য যে একটি লোভনীয় সুযোগ হতে পারে, মার্কিন কর্তৃপক্ষকে সেটা নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই৷ বিশেষ করে যখন ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর প্রতিশোধও তার একটি উদ্দেশ্য হতে পারে৷

প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেছেন, নাইন-ইলেভেনের ১০ বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়েও শক্তিশালী৷ মার্কিনিরা যাবতীয় সন্ত্রাসের হুমকি সত্ত্বেও ‘‘কাজ চালিয়ে যাবে”৷ স্বদেশ নিরাপত্তা মন্ত্রী জ্যানেট ন্যাপোলিটানো সব মার্কিনিদের সজাগ থাকতে বলেছেন এবং সন্দেহজনক কোনো কিছু দেখলেই, পুলিশকে তা জানাতে বলেছেন৷ রুডল্ফ জুলিয়ানি, যিনি ১০ বছর আগে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইট টাওয়ারের উপর আক্রমণের সময় শহরের মেয়র ছিলেন, তিনি বলেছেন, ‘‘লোকে আমাকে প্রায়ই জিগ্যেস করে: অ্যামেরিকা কি আজ এগারোই সেপ্টেম্বরের চেয়ে বেশি নিরাপদ? উত্তর হল: হ্যাঁ, কিন্তু যতোটা নিরাপদ হতে পারত, ততোটা নয়৷”

পাকিস্তানে এর প্রভাব
নাইন ইলেভেনের পর বদলে গিয়েছে বিশ্ব সন্ত্রাসের চিত্র। এক দশকে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে পাকিস্তান। আমেরিকার ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’তে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পাকিস্তান। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর প্রায় ৩০০ আত্মঘাতী বোমা হামলার শিকার হয়েছে দেশটি। এমনকি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হন।

প্রায় ৩০০বোমা হামলায় ১০ বছরে নিহত হয়েছে চার হাজার ৭০০। হামলার শিকার প্রায় সাত থেকে ১০ হাজার লোক বরণ করে নিয়েছে পঙ্গুত্ব।

২০০১ সালের আগে ১৯৯৫ সালে পাকিস্তানের মিসরীয় দূতাবাসে আত্মঘাতী হামলা ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য হামলা। সে ঘটনায় ১৫ জন নিহত হয়।

অথচ ১০ বছর ধরে আত্মঘাতী হামলা পাকিস্তানের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ হামলা ব্যাতিত আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও ক্রমাগত ড্রোন হামলা পাকিস্তানে হতাহতের ঘটনাকে নিত্যনৈমিত্তক করে তুলেছে।

৭ সেপ্টেম্বর ভারতের দিল্লি হাইকোর্টের সামনের গেটে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয় এতে ১২ জন নিহত ও ৫৬ জন আহত হয়। আত্মঘাতী এ বিস্ফোরণের পর সমগ্র ভারতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। এবং সব আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই দিন পাকিস্তানের কোয়েটায় গভর্নর ভবনের সামনে আত্মঘাতী গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে ২৪ জন আহত ৮৭ জন। ঘটনাটি এতটাই নিত্যনৈমিত্তিক ছিল তেমন কোনো উৎৎকণ্ঠাই লক্ষ করা যায়নি। এমনি করে পাকিস্তানের মানবতা বার বার বিস্ফোরিত হচ্ছে আত্মঘাতী হামলায়।

৯/১১’র পর ভারতেও এ ধরনের হামলার ঘটনা একেবারে কম নয়। ভারতীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামি  জিহাদের অজুহাতে ভারতে সন্ত্রাসবাদ ও আত্মঘাতী হামলা বেড়ে গিয়েছে। ২০০৭ সালে রীতিমত ই-মেইলে জানিয়ে বোমা হামলা করা হয় উত্তর প্রদেশে।

ভারতীয় জিহাদকারীদের ইশতেহারে লেখা ছিল “আমাদের সংগ্রাম তাদের বিরুদ্ধে, যারা আমাদের বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছে। আমাদের বোনদের ধর্ষণ করেছে, আমাদের শিশুদের হত্যা করেছে।”

“ইসলাম কায়েম করা ও ভারতকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা” জিহাদের অন্যতম স্লোগান। এবং এই জিহাদকে পুঁজি করে ভারতে সন্ত্রাসবাদ দিন দিন বাড়ছে। সর্বশেষ আক্রমণ ছিল ৭ সেপ্টেম্বর ২০১১। এই হামলার দায় স্বীকার করে ইতোমধ্যে হরকাতুল জিহাদ ইসলামি নামক একটি ইসলামিক সংগঠন ই-মেইল করেছে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে।

নাইন ইলেভেনের পরে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাকিস্তান সীমান্তবর্তী দেশ হবার কারণে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের ভারতে প্রবেশ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছে। আল কায়েদা আফগানিস্তান ও পাকিস্তানী সংগঠন হবার পরও ভারতে নানা নামে এরা আগ্রাসন চালিয়েছে।

এক বাক্যে নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বে ধর্মভিত্তিক সন্ত্রাসবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। এর সবচেয়ে বড় স্বীকার পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতেও এর জের রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু।

বার্তা২৪ ডটনেট

Post a Comment

0 Comments