Advertisement

জিল্লুরের পর রাষ্ট্রপতি হতে চান এরশাদ!

প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের পর বাংলা-দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হতে চান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। বিশ্বজুড়ে আলো-চিত ওয়েবসাইট উইকি-লিকসের ফাঁসকৃত মার্কিন নথি থেকে
 এ তথ্য জানা গেছে। মার্কিন তার-বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে- ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন
মুহম্মদ এরশাদ মার্কিন দূতাবাসকে বলেছিলেন,
জিল্লুর রহমানের পর তিনি কোনো এক সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবেন।
এর আগে নির্বাচনী জন-সভায় জনসমক্ষে এরশাদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচনে মহাজোট জয়ী হলে তিনিই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মহাজোটের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান শপথ নিলে তার এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। তবে জিল্লুর রহমানের পর তিনি রাষ্ট্রপতি হতে পারেন বলে মার্কিন দূতাবাসকে জানিয়েছিলেন এরশাদ। এ সংক্রান্ত একটি তারবার্তা ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো হয়। আর এটি গত ৩০ আগস্ট প্রকাশ করে বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগানো ভিন্নধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস।
সে সময় মার্কিন দূতাবাসকে এরশাদ আরো বলেন, পরবর্তীতে সরকার গঠনের জন্য আওয়ামী লীগের জাতীয় পার্টিকে প্রয়োজন হবে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব না পাওয়ার পর তিনি আশা করেছিলেন, পার্লামেন্টে তিনি উপনেতার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। মার্কিন দূতাবাসের গোপন ওই তারবার্তায় মন্তব্য করা হয়, 'যদিও পরে তার সব কথাই ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়।'
একই বছর ৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শেখ হাসিনা যখন কারাগারে ছিলেন, সে সময় জিল্লুর রহমান পার্টির অভ্যন্তরে ঐক্য ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার স্ত্রী আইভী রহমান ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হন।
তারবার্তায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি মন্তব্য করেন, পার্টির জন্য অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিলেও, আওয়ামী লীগের ইচ্ছা এই রাষ্ট্রপতির ভূমিকা দুর্বল করে রাখা ও তা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে রাখা।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসনে জয়ী হয়। মহাজোটে আওয়ামী লীগের প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি ২৭টি আসনে জয়ী হয়। সবমিলিয়ে মহাজোট পায় ২৬২টি আসন। বিরোধী দল বিএনপি সমর্থিত চারদলীয় জোট ৩২টি পায় আসন।
তারাবার্তাটির মন্তব্য অংশে মরিয়ার্টি বলেন, এখনো পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই চিন্তিত হয়ে পড়ছেন, তারা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন কি না। তবে হাসিনা জানিয়েছেন, তার সরকার 'নতুন বোতলে পুরনো মদ' হবে না।
তারবার্তায় আরো বলা হয়, ছোট কয়েকটি প্রশাসনিক অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে ডিসেম্বরের নির্বাচনটি ছিল সবচেয়ে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও বিশ্বস্ত। নির্বাচনটি পর্যবেক্ষণ করে ওয়াশিংটনভিত্তিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট (এনডিআই), ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইন্সটিটিউট (আইআরআই), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও এশিয়া ফাউন্ডেশন।
নির্ঘুম রাত এরশাদের
এদিকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে এক বৈঠকে সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ বলেন, মহাজোট না কি চারদলীয় জোট কোন পক্ষে যোগ দেবেন, তা নিয়ে তার নির্ঘুম রাত কাটছে।
২০০৬ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে গোপন কূটনৈতিক এ সংক্রান্ত একটি তারবার্তা পাঠানো হয়। গত ৩০ আগস্ট তারবার্তাটি প্রকাশ করে সাড়া জাগানো সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস।
২০০৬-এর ৩ জুলাই এরশাদ দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, বিএনপির প্রতি তার দুর্বলতা রয়েছে। তিনি বলেন, আমি মৌলবাদের বিরোধিতা করি। আমি মনে করি, বিএনপি প্রাথমিক অবস্থায় জেএমবিকে সমর্থন দিয়েছিল এবং এর উত্থানের পেছনে সংগঠনটির ভূমিকা আছে।
দূতাবাসকে এরশাদ বলেন, তিনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয় দলের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কাছে তার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উত্থাপন করেছেন। এর মধ্যে তার প্রধান দাবি ছিল রাষ্ট্রপতি হতে চাওয়া।
একই বছর ২ জুলাই এরশাদ ও তার স্ত্রী রওশন এরশাদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গণমাধ্যমের মতে, সাক্ষাতে সে সময়ে তেতো হয়ে ওঠা আবাসন চুক্তি নিয়ে এরশাদ আলোচনা করেন। তবে বিএনপির একটি সূত্র জানায়, বৈঠকের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেয়া প্রসঙ্গ।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন কূটনৈতিক তারবার্তায় বলা হয়, 'এরশাদ বলেন, নির্বাচনে জিততে হলে জাতীয় পার্টিকে শেখ হাসিনার প্রয়োজন হবে। আওয়ামী লীগ যদি তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে, তাহলে তাদের হাতে তিনি যে পরিমাণ অপমাণিত হয়েছেন তার খেসারত দেয়া হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ তার বেশিরভাগ দাবি পূরণ করতে রাজি হয়েছে, তবে বিএনপিও তাকে বিবেচনা করছে।'
তারবার্তায় বলা হয়, 'এরশাদ এও বলেন, তারেক রহমান তাকে হুমকি দিয়েছেন, তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে গেলে তাকে আবারো কারাগারে পাঠানো হবে।'
তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া এ বিউটেনিসকে এরশাদ বলেন, বিএনপি তার ওপর নজরদারি রেখেছে, তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো চুক্তি করতে বাধাও দিচ্ছে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার একই বছর ১২ জুলাই মার্কিন দূতাবাসকে জানান, এরশাদ কোন জোটে যাবেন তা নিয়ে এখনো অনিশ্চিয়তা রয়েছে। আরেকটি বৈঠকে সংগঠনের রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক কাজী ফিরোজ রশিদও একই কথা বলেন।
একই তারবার্তায় বলা হয়, এরশাদের ভাই জিএম কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমতাসীন জোটের নির্বাচনে সম্ভাবনা খুব কম। সে কারণে চারদলীয় জোটে যোগ দেয়া ঠিক হবে না।
তারবার্তাটির মন্তব্য অংশে বলা হয়, 'এরশাদ মনে করেন, তার দলই কিংমেকারের (সরকার গঠনে করতে নির্ধারক) ভূমিকা পালন করবে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে এরশাদের বৈঠক ও তার নেতাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় মনে হচ্ছে, প্রধান দুটি দলের সঙ্গেই এরশাদ আলোচনা চালিয়ে যাবেন। এরশাদ এও জানেন যে, তিনি ভুল সিদ্ধান্ত নিলেই জেলে ফেরত যেতে হবে। একটি ভুল সিদ্ধান্তই তার রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে।

Post a Comment

0 Comments