বদরুল ইসলাম মাসুদ, বান্দরবান:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি খ্যাত বান্দরবানে পবিত্র ঈদ উপলক্ষে লম্বা ছুটির কারণে এখন পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড়। দেশি-বিদেশি পর্যটকের পদভারে মুখরিত সবুজ ঘেরা অপরূপা বান্দরবানে নানা অঞ্চলের মানুষের পদচারানায় অন্যরকম এক আমেজ বিরাজ করছে। হোটেল-মোটেল-রেস্টহাউস, গেস্টহাউসগুলো এখন পর্যটকে ঠাসা। ভিন্ন পরিবেশ আর উৎসব মুখর পাহাড়ি জনপদে আগ্রহ নিয়েই পর্যটকদের আগমন ঘটে।
ঈদের আগে সাপ্তাহিক ছুটি, পবিত্র শবে কদর ও ঈদের পর পূণরায় সাপ্তাহিক ছুটি- সব মিলিয়ে এবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের লম্বা ছুটি পেয়েছে মানুষ। এ কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ ভীড় জমিয়েছে পাহাড় কন্যা, সবুজ বনানী ঘেরা, পাহাড়ি-বাঙালির বসবাসে বৈচিত্র্যময় বান্দরবানে। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে লোকজন ছুটে যাচ্ছে দল বেঁধে। হৈ-হুল্লোড় করে পর্যটকরা ঘুরে ঘুরে দেখছেন এবং আনন্দ উপভোগ করছেন।
প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে বান্দরবানে পর্যটকদের ভীড় পড়ে যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, খুলনা, বরিশাল, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন ঈদের আগেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বান্দরবানে চলে এসেছেন, মার্কেটে কেনাকাটা সেরে নেন। রান্নার ব্যস্ততা না থাকায় পর্যটকরা বিভিণ লোকেশনে ঘুরে ঘুরেই দিন কাটায়।
জেলা শহরের সব কটি আবাসিক হোটেল-মোটেল-রেস্ট হাউস, গেস্ট হাউস পূর্ণ হয়ে গেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কম-বেশি সব হোটেল-মোটেলই পর্যটকে ঠাসা। তারপরও স্থানাভাবে অতিরিক্ত লোক আসায় একই রুমে কিংবা ডাবল সীটে একাধিক লোক ভাগাভাগি করে থাকছে। এজন্য বাড়তি কিছু টাকা গুণলেও আগত পর্যটকরা কোনো আপত্তি করছেনা।
হোটেল গ্রীণহীলের মালিক ও জেলা আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সেক্রেটারী সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শহরের সব কটি হোটেল-মোটেল-রেস্ট হাউসে রুম বুকিং করা আছে। তাই নতুন করে আসা লোকজন রুমের জন্য গিয়েও কেউ কেউ ফিরে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
বান্দরবানে পর্যটকদের আগমন বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে কয়েকজন পর্যটক জানিয়েছেন, তারা কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে আসেন। বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্ক চালু হওয়ায় এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি না থাকায় হাজার হাজার পর্যটক বান্দরবানে বেড়াতে আসেন। বান্দরবানে বেশ কয়েকটি উন্নত মানের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট এবং গেস্ট হাউস গড়ে উঠায় আবাসন সমস্যা কমেছে। ফলে লোকজন এসময় বান্দরবানে ভীড় জমাচ্ছে।
এখানে রয়েছে অসংখ্য পর্যটন স্পট। জেলা সদরেই রয়েছে মেঘলা পর্যটন কমপ্লে¬ক্স, নীলাচল পর্যটন স্পট, প্রান্তিক লেক, স্বর্ণ জাদি (যা লোকমুখে স্বর্ণ মন্দির হিসেবে অধিক পরিচিত)। যা না দেখলে সৌন্দর্য দেখা অপূর্ণ থেকে যাবে বলে মনে করেন অনেকে। নীলাচলে দাঁড়ালে পাহাড় আর আকাশের মিতালী, দূরে সবুজ বন কিংবা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য আবছা আবছা উপভোগ করা যায়। পাহাড় থেকে শহরের সৌন্দর্য বিমোহিত করে পর্যটকদের। বালাঘাটায় বুদ্ধ ধাতু জাদি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থ স্থান হলেও পাহাড়ের উপর সুন্দর কারুকার্য ও স্বর্ণাভারণে তৈরি হওয়ায় এটিও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্পট হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকায় রয়েছে শৈল প্রপাত নামে দর্শনীয় পর্যটন স্পট। বান্দরবান-থানচি সড়কের শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে রয়েছে দেশের অন্যতম উচ্চতম পর্বত চূঁড়া ও দর্শনীয় স্পট বাংলার দার্জিলিং খ্যাত চিম্বুক পাহাড়। শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে একই সড়কে গড়ে উঠেছে নীলগিরি পর্যটন স্পট। সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত নীলগিরিতে দাঁড়ালে পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দেশের অভ্যতর থেকে উৎপত্তিকৃত সাঙ্গু নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বিজয়। এটি তাজিংডং নামেই পরিচিত। রুমা উপজেলা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পাহাড়ি রা¯তা অতিক্রম করে যেতে হয় তাজিংডং পাহাড়ে। পাশেই রয়েছে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বতচূঁড়া ক্যাওক্রাডং। এছাড়া একই পথে প্রায় ১৮ কিলোমিটার গেলেই কিংবদতীর বগালেক। এটি পর্যটকদের কাছে অত্যত আকষর্ণীয়। বান্দরবানে রয়েছে একসাথে সবচেয়ে বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। মারমা, তঞ্চ্ঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, পাংখো, খুমী, লুসাইসহ ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন ধারা পর্যটকদের কাছে বাড়তি পাওনা। নিরাপত্তা সমস্যা না থাকায় লোকজন বান্দরবানকে পছন্দের তালিকায় অগ্রাধিকার দিয়ে বেড়াতে আসেন।
বান্দরবানে পর্যটনের যে অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে তা স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যে অনুধাবন করে পর্যটন খাতকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান। তিনি এজন্য সরকারের উর্ধতন মহলের আরো বেশি করে এ খাতের উন্নয়নের ব্যবস্থা নিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দিন দিন যে হারে বান্দরবানে পর্যটকের আগমন ঘটছে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন স্পটগুলোকে সাজিয়ে গড়ে তোলা গেলে, দেশের প্রধানতম পর্যটন অঞ্চল হয়ে উঠবে বান্দরবান।

0 Comments