আবদুর রাজ্জাক,মহেশখালী:
কক্সবাজারের উপকূলীয় দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার প্রায় চার লক্ষাধিক জনসংখ্যার একমাত্র চিকিৎসা সেবার স্থান এই সরকারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলে ও বিভিন্ন অনিয়ম,অব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার ও নার্স সহ প্রায় ৭৭টি গুরুত্বপূর্ন পদ শুন্য থাকায় আধুনিক স্বা¯হ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হচেছ উপকুলীয় এলাকার জনগন।যার ফলে স্বাস্থ্য সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে।দূর-দূরান্ত থেকে আসা গরিব অসহায় রোগীরা চিকিৎসা সেবা নিতে এসে প্রতিনিয়ত সীমাহীন দূর্ভোগের শিকার হচেছন।পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় হাসপাতালে আগত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের হিমশিম খেতে হচেছ।প্রশাসনিক কাজকর্ম ও ব্যাহত হচেছ।হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের মারাতক সংকট রয়েছে।মাঝে মাঝে অক্সিজেনের ও সংকট দেখা দেয়। এই হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পদ গাইনি ও শৈল্য চিকিৎসক না থাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসূতি সেবা ও অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। হাসপাতাল প্রতিষ্টার প্রায় ৩০ বছর ধরে এই পদ দুইটি শুন্য থাকায় প্রসূতি রোগিরা সেবা না পাওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের সেবা থেকে এই এলাকার চার লাখ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তবে জরুরি কোন প্রসূতি রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে তাদেরকে কক্সবাজার সদর অথবা চট্রগ্রাম হাসপাতালে রেফার করছে। ফলে মহেশখালী থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার সাগর পাড়ি দিয়ে কক্সবাজার নেওয়ার পথে অনেক জরুরি প্রসূতি রোগী অকালে মৃত্যু বরণ করারও মত ঘটনা ঘটছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, জরুরি কোন প্রসূতি রোগি এলে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু স্বাভাবিক প্রসূতি রোগী এলে তাকে সেবিকা দিয়ে কোন রকম প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালে উপজেলায় ৩১ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্টা করা হয়। প্রতিষ্টা পর থেকে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গুরুত্বপূর্ণ গাইনি বিশেষজ্ঞ ও শৈল্য চিকিৎসকের পদ থাকলেও এই পদে কোন গাইনি বিশেষজ্ঞ ও শৈল্য চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ কারণে এই দ্বীপ এলাকার প্রসূতি সেবা পাচ্ছে না নারীরা। বন্ধ রয়েছে হাসপাতালের অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। এছাড়া এই দ্বীপে বেসরকারি ভাবে প্রসূতি সেবা দেওয়ার জন্য কোন ক্লিনিক গড়ে উঠেনি। ফলে উপজেলার একটি পৌরসভার ও ৮টি ইউনিয়নের লোকজন প্রসূতি সেবা থেকে নানা ভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০০৭ সালে ৩১ শয্যা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যা উন্নত করা হয়। এতে ২৮টি পদের মধ্যে গুরুত্ব পদ গাইনি বিশেষজ্ঞ ও শৈল্য চিকিৎসক পদ। এর পরও এই পদ দুইটি শুন্য। কিন্তু নামে মাত্র ৫০ শয্যা হাসপাতাল থাকলেও কার্যক্রম চলছে ৩১ শয্যা হাসপাতালে। ফলে লোকবলের অভাবে হাসপাতাল চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। ২৮টি পদের মধ্যে আছে ৬ জন চিকিৎসক। ১৪ জন সেবিকার মধ্যে ২জন সেবিকা রয়েছে। ফলে গাইনী চিকিৎসক ও সেবিকা সংকটের কারণে গর্ভবতী মহিলারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে জরুরি প্রসূতি সেবা পাচ্ছে না । মাসে ১০ থেকে ১৫ জন জরুরি প্রসূতি রোগি হাসপাতালে সেবার জন্য এলে তাদেরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। আর সাধারণ প্রসূতি রোগি এলে তাদেরকে সেবিকার মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারি করানোর চেষ্টা করা হয়। মহেশখালী হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মাহফুজুল হক বলেন, হাসপাতাল প্রতিষ্টার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ গাইনী বিশেষজ্ঞ ও শৈল্য চিকিৎসকের পদটি শুন্য থাকায় এলাকার জরুরি প্রসূতি রোগি সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, গত ৩০ বছরের মধ্যে তিনজন গাইনি চিকিৎসক এই হাসপাতালে নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা আবার এক মাস যেতে না যেতেই তদবির করে অন্যত্র বদলী হয়ে যায়। এ কারণে প্রসূতি রোগিদের পাশাপাশি বড় ধরনের অপরেশন করার মতো রোগী আসলে তাদেরকে বাধ্য হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করতে হয়। তিনি বলেন, গাইনী বিশেষজ্ঞ ও শৈল্য চিকিৎসক সহ অন্যান্য লোকবল নিয়োগ দেওয়ার জন্য উপরে অনেক লেখালেখি করেও কোন কাজ হচ্ছে না। ফলে লোকবল সংকটের কারণে ৫০ শয্যা হাসপাতালটি চার বছর ধরে চালু করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। অপরদিকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের পানির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, পানির সমস্যাটা এতই প্রখট যে তা দেখে মনে হয় দেখার জন্য যেন কোন কর্তৃপক্ষ নেই। ৪ লক্ষ মানুষের জন্য ৩১ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা সদরে অবস্থিত হাসপাতালটি চিকিৎসার একমাত্র সহায় সম্বল। এ চিকিৎসা ব্যবস্থা দেখার কেউ নেই বললেই চলে।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, মহেশখালী হাসপাতালের আগত রোগীদের জন্য একটি মাত্র টিউবওয়েল সচল ছিল ১ বছর পূর্বে । আর বিগত ১৫ দিন পূর্ব থেকে এ টিউবওয়েলটি বিকল অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৫ দিন থেকে খাবার পানির বিষয়ে কোন খোজ খবর রাখেনি। খাবার পানির সংকট রোগীরা পার্শ্ববর্তী জৈনক কন্ট্রাকটর এর বাসা থেকে খাবার পানি সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে। এ টিউবওয়েলটি বন্ধ হয়ে গেলে অনেক রোগী মহেশখালী থানা কম্পাউন্ড থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্ল¬াষ্টিক বোতল নিয়ে খাবার পানি ও স্যালাইন তৈরীর পানি সংগ্রহের দৃশ্য চোখে পড়ার মত। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোন খেয়াল নেই বললেই চলে। একপাশে পূরাতন ভবনের টয়লেটের দূর্গন্ধ, অন্য দিকে নতুন ভবনের টয়লেট গুলোও বন্ধ। চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য দীর্ঘ ৬বৎসর আগে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল তৈরি হলেও আনুষ্টানিক কার্যক্রম চালু হয়নি। দেখা গেছে, এ ভবনে জনসাধারণের ব্যবহারের টয়লেট অনুপযোগী, আর পানির টেপগুলি পানিবিহীন। কর্মচারীদের জন্য ব্যবহারের টয়লেট তালাবদ্ধ থাকে। দিনের বেলায় আগত রোগীদের টয়লেট ও প্রশ্রাব সারানোর জন্য হাসপাতাল বাদ দিয়ে পার্শ্ববর্তী মসজিদ, ও হোটেলের দিকে ছুটতে হয়।
মহেশখালী হাসাপাতালে ভর্তি, সড়ক দুর্ঘটনার রোগী জানান- সে প্রায় একমাস পূর্বে ভর্তি। টাকা না দিলে কোন ষ্টাফ তাদেরকে ইনজ্কেশন পুশিং করেনা। ডিউটি পরিবর্তন হলে পুনরায় টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে ঔষধ ও পাওয়া যায়না, টাকা দিয়ে স্যালাইন ও পাওয়া যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত রোগীদের জন্য যন্ত্রপাতি যততত্র রেখে গ্যাস প্রদান করতে হয়। এমন অবস্থার পরিবর্তন চায় আগত রোগীরা। টাকা দেওয়ার জন্য অকট্য ভাষায় কথা বলে জানান হয়রানীর স্বীকার রোগীরা । টয়লেটের দরজায় নিচের অংশ ভাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে অনেকদিন। একজন রোগী টয়লেটে যাওয়ার সময় নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য স্পেয়ার একটি পর্দা নিতে হয়। এব্যাপারে উপজেলা স্থাস্থ কর্মকর্তা আব্দুল মাবুদ জানান,টিউবওয়েলের সমস্যাটা সামাধান করা হয়েছে। টয়লেটসহ অন্যান্য সমস্যাগুলো সামাধানের চেষ্টা চলছে। হাসপাতাল এলাকা পরিদর্শন কালে অনেক ভুক্তভোগী রোগী প্রাশাসনিক ভাবে মহেশখালী হাসপাতালের রোগীদের পানিসহ সরকারী প্রদত্ত অধিকার পাওয়ার ব্যবস্থা নিতে উর্ধ্বতন সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী জানান।
সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বা¯হ্যকমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে বিগত জোট সরকারের আমলে উক্ত ভবন উদ্বোধন করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল আসবাবপত্র,বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও অবকাটামোগত সমস্যার কারনে এখনও পর্যন্ত চালু করা সম্ভব হয়নি।এই স্বা¯হ্য কমপ্লেক্সের শুন্য পদগুলি হল,স্বা¯হ্য ও পরিবারপরিকল্পনা কর্মকর্তা-১জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট(সার্জরী),জুনিয়র কনসালটেন্ট(চক্ষু)১জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট(এনেস)১জন,জুনিয়র কনসালটেন্ট(মেডিসিন)১জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট(গাইনি)১জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট(শিশু)১জন,জুনিয়র কনসালটেন্ট(অর্থো:)১জন,জুনিয়র কনসালটেন্ট(কার্ডিওগ্রাফি)১জন, জুনিয়র কনসালটেন্ট(ইএনটি)১জন,ডেন্টাল সার্জন ১ জন,মেডিকেল অফিসার ৪জন,সহকারী সার্জন(আইএমও) সহকারী সার্জন(প্যাথলজিষ্ট)১জন, সহকারী সার্জন(এনেসথেসিয়া) সহকারী সার্জন(রেডিওগ্রাফি),হিসাব রক্ষক,পরিসংখ্যান,এক্স-রে ম্যান,এম্বুলেন্স ড্রাইভার,নার্স সুপারভাইজারসহ ২৩জন,২য় শ্রেণী(নার্স সুপার) ১ জন,২য় শ্রেণী(নার্স)১০ জন,ওয়ার্ড বয়,সুইপারসহ ৩য় শ্রেনী ৩৩জন,৪র্থ শ্রেনী ২৪ প্রতিটি পদসহ সর্বমোট ৭৭টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শুন্য রয়েছে যার ফলে উপজেলার প্রায় চার লক্ষ জনসাধারনকে চিকিৎসা সেবা নিতে বিভিন্ন সমস্যা ও চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচেছ।এই হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন ও এম্বুলেন্স থাকলে ও সেগুলো রোগীদের কোন কাজে আসছে না টেকনেশিয়ান/ড্রাইভার না থাকার কারনে।
সুত্রে জানায়,এই হাসপাতালে প্রতিদিন শয্যা সংখ্যার অতিরিক্ত রোগী ভর্তি থাকে।বেডের অভাবে তাদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।অতিরিক্ত ভর্তি রোগীদের হাসপাতাল থেকে খাবার ও ওষুধপত্র সরবরাহ করা হয় না।শুধুমাত্র বরাদ্বকৃত রোগীদের হাসপাতাল থেকে বিনামুল্যে চিকিৎসা সেবা ও খাবার দেওয়া হয়।এছাড়া হাসপাতালে ভর্তি প্রত্যেক রোগীর সাথে একাধিক এটেনডেন্ট থাকে।রোগীর এটেনডেন্ট ও বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানীর রিপ্রেজেনটেটিভদের চলাফেরা ও কথোপকথন হাসপাতালে বাজারের অবস্থা সৃষ্টি হয়। অপর দিকে হাসপাতালে জরুরী বিভাগে রুগীদের নিকট থেকে বিভিন সময় টাকা নেওয়া হয় টাকা না দিলে জরুরী বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয় না। এই ব্যাপারে হাসপাতালের টি,এইচ ডা: আবদুল মাবুদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এর ৭৭টি শুন্য পদের বিষয়ে উর্ধতন কতৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করার পর ও কতৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা নিচেছ না বলে তিনি ইনানীকে জানান। এ ব্যাপারে মহেশখালীর প্রায় চার লক্ষ জনসাধারন মামনীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

0 Comments