-মুহম্মদ নূরুল ইসলাম:
গত ১৭ সেপ্টেম্বর২০১১ কক্সবাজার থেকে প্রকাশিক কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় একটি ছোট্ট সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদের শিরোনাম উখিয়ায় আড়াই বছরের শিশু ধর্ষিত। একই সাথে সংবাদটি কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত একটি ওয়েভ সাইড ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটি খুবই ছোট তবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। উক্ত সংবাদটি হচ্ছে, উখিয়ার চাকবৈঠা গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের আড়াই বছরের শিশু কন্যাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেছে একই গ্রামের পাষণ্ড মোস্তাফিজ (২০)। ১৫ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩টায় এ ঘটনাটি ঘটেছে। এ ব্যাপারে থানায় একটি অভিযোগ করেছে শিশু কন্যার পিতা ছৈয়দ নুর। থানায় দায়েরকৃত অভিযোগ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঐদিন আড়াই বছরের শিশু কন্যাকে বাড়ীতে রেখে পিতা-মাতা উভয়ে কাজের সন্ধানে বাহিরে চলে যায়। এ সময় লম্পট মোস্তাফিজ বাড়ীতে ঢুকে শিশু কন্যাকে ধর্ষণ করে চলে যায়। পরে পিতা-মাতা বাড়ীতে রক্তাক্ত অবস্থায় শিশু কন্যাকে উদ্ধার করে উখিয়া হাসপাতালে ভর্তি করেন। এ ঘটনা নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এটা হচ্ছে সংবাদের বক্তব্য। সংবাদটি পড়ে আমি স্বাভাবিক থাকতে পারিনি। বলা যায় প্রকাশিত সংবাদটিকে আমি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারিনি। আমি কেন যে কোন সচেতন, বিবেকবান মানুষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারে না। অন্তত যাঁরা সন্তান-সন্ততির পিতামাতা। তবে প্রকাশিত সংবাদে কয়েকটি অসঙ্গতি দেখে মনে খটকা লাগল। এই অসঙ্গতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ১. আড়াই বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হতে পারে কিনা, ২. আড়াই বছরের শিশু যেখানে মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করার কথা তাকে একা ঘরে রেখে কোন পিতা-মাতা কাজের সন্ধানে বাইরে যেতে পারে কিনা, ৩. ধর্ষণের পরে আড়াই বছরের শিশু স্বাভাবিক ছিল কি ভাবে?
সংবাদটি পড়ার দীর্ঘক্ষণ পরে আমি দৈনিক আজকের দিশবিদেশ পত্রিকার সম্পাদক জনাব আয়ুবুল ইসলামকে মোবাইলে বিষয়টি অবহিত করি। তাঁকে বিষয়টি অবহিত করার কারণ হচ্ছে তিনি ঐ গ্রাম বা ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধি। তিনি বললেন, ঘটনাটি সঠিক নয়। তবু আমি তাঁকে বিষয়টির ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানার জন্য অনুরুধ করলাম। একই সাথে থানায় দায়ের করা অভিযোগ দেখা, উখিয়া হাসপাতালে যোগাযোগ করে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া এবং যে চিকিৎসক শিশুটিকে চিকিৎসা দিয়েছে তাঁর সাথে কথা বলা। আমাদের উখিয়া প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম বাবুল অসুস্থ সে জন্য সম্পাদককে বিষয়টি অবহিত করে অন্যান্য তথ্য জানার অনুরোধ করা। পরে আমি মোবাইলে বিষয়টি কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে অবহিত করলাম। তিনি সাথে সাথে বললেন ঐসব পত্রিকা আমার কাছে আছে। তিনি একটি পত্রিকার সংবাদটি এক নিঃশ্বাসে পড়া শেষ করলেন। আমি পুলিশ সুপারকে বিষয়টির ব্যাপারে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। আমার অনুরোধে তিনি সাথে সাথে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেন ঘটনাস্থলে গিয়ে বিস্তারিত জেনে তাঁকে (পুলিশ সুপারকে) অবহিত করতে।
আমি আমার আরো কয়েকটি মাধ্যম থেকে বিষয়টি জানার চেষ্ঠা করলাম। সংবাদটি পাঠ করে আমি মন্তব্য করলাম হয়তো সংবাদটি মিথ্যা, নয়তো শিশুর বয়স আড়াই বছর নয়। দৈনিক আজকের দেশবিদেশ সম্পাদক আয়ুবুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার মহোদয় সন্ধ্যায় নিশ্চিত করলেন যে সংবাদটি ভুঁয়া ও মিথ্যা। কথিত ধর্ষিত শিশুর পিতা স্থানীয় কোন সংবাদকর্মিকে দিয়ে উক্ত সংবাদটি প্রকাশের ব্যবস্থা করেছে। খবর নিয়ে জানা গেছে, উক্ত শিশুকে উখিয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি বা বাইরের কোন চিকিৎসকের কাছেও নেয়া হয়নি। পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশ পেয়ে একজন দারোগা কথিত ধর্ষিত শিশুর বাড়ীতে গেলে শিশুর দাদা অকপটে বলেই ফেলেন এধরণের কোন ঘটনা আমাদের বাড়ীতে ঘটেনি। শুধু তাই নয়, পত্রিকার ভাষায় কথিত পাষান্ড ধর্ষক মোস্তাফিজের বয়স ২০ নয়, তার বর্তমান বয়স ১০। খবর নিয়ে জানা গেছে, কথিত ধর্ষিত শিশু কন্যা এবং মোস্তাফিজের পরিবার পরস্পর আত্মীয়। দুই পরিবারের মধ্যে পূর্ব বিরোধ রয়েছে। মোস্তাফিজের পরিবারকে হয়রানি করার কৌশল হিসেবে সাংবাদিককে দিয়ে এ ধরণের সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এধরণের ভূঁয়া, ভিত্তিহীন, মিথ্যা সংবাদ যখন প্রকাশিত হয় তখনই প্রশ্ন আসে আমরা সংবাদকর্মিরা কতটুকু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করছি?
একজন সংবাদকর্মি হিসেবে উক্ত সংবাদটি পত্রিকায় প্রেরণের আগে বিষয়টি ভাল ভাবে যাচাই-বাচাই করা উচিত ছিল। তেমনি ভাবে পত্রিকার অফিসে বা ডেস্কে বসা বড় সাংবাদিকদেরও উচিত ছিল উক্ত সংবাদটি অফিসে পৌঁছার পরে আরো যাচাই-বাচাই করে নিশ্চিত হয়ে ছাপাবার ব্যবস্থা করা।
একজন সচেতন সাংবাদিক হিসেবে এধরণের একটি সংবাদ হাতে আসার পরে প্রথমে মনে প্রশ্ন আসা উচিত এক. আড়াই বছরের শিশু ধর্ষণের শিকার হতে পারে কিনা? মানুষ যদি পশুও হয়ে গেলেও আড়াই বছরের শিশুকে ধর্ষণ করতে পারে কি? দুই. একটি আড়াই বছরের শিশু যেখানে মায়ের স্তন থেকে দুধ পান করে সেই শিশুকে বাড়ীতে একা রেখে কোন পিতা-মাতা কাজের সন্ধানে বাইরে যেতে পারে কিনা?
সংবাদপত্রকে বলা হয় জাতির দর্পণ। বলা হয় চতুর্থ রাষ্ট্র। আমরা কলম সৈনিক। আমরা সাংবাদিকদেরকে বলা হয় জাতির বিবেক। সাংবাদিককেরা নিজের জীবন বাজি রেখে সত্যকে প্রকাশ করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সত্য ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকেরা প্রাণ হারাচ্ছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা বিভিন্ন মহলের নিপিড়নের শিকার হচ্ছেন। সত্য ও বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশ করার কারণেই একজন সাংবাদিকের জীবনে নেমে আসছে হুমকি, ধমকি। সত্যি কথা বলতে কি, একজন সত্যিকার সাংবাদিকের কোন বন্ধু থাকতে পারে না। কিন্ত আমাদের দেশে আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তার উল্টো চিত্রও দেখা যায়। গুটি কয়েক সাংবাদিকের জন্য সমগ্র সাংবাদিক সমাজ কলঙ্কিত হচ্ছে। এধরণের কিছু সাংবাদিক কোন কোন সময় বিশেষ সুবিধা নিয়ে সাংবাদিক সমাজকে কলঙ্কিত করছে। জাতির বিবেকের কলম যদি ভুল তথ্য নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং প্রচার করে তার দায়িত্ব কে নেবে? এধরণের সংবাদ প্রচার ও প্রকাশ করা কতটুকু সমিচিন? এটা কোন অবস্থাতেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হতে পারে না। যত্রতত্র সংবাদপত্র প্রকাশ করে এভাবে দায়িত্বহীন সংবাদ প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা মোটেই সমিচিন নয়। সংবাদপত্র প্রকাশ করার সাথে সাথে সাংবাদিক নিয়োগে পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। যেমন তেমন একজনকে পত্রিকার কার্ড একটি ধরিয়ে দিয়ে সাংবাদিক বানিয়ে ফেলা খুবই সহজ কিন্তু সাংবাদিকতার নীতিমালা মেনে সাংবাদিকতা করা খুবই কঠিন। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের ভাব-মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করা খুবই সহজ। কিন্তু তা রক্ষা করা খুবই কঠিন। আজকাল সংবাদপত্র ও সাংবাদিককে মানুষ ভাল চোখে দেখে না। একজন সচেতন সংবাদকর্মি হিসেবে এধরণের কথা শোনা বা এধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া খুবই বিব্রতকর। এই পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়-দায়িত্ব শুধুমাত্র পত্রিকার সম্পাদক এবং প্রকাশকের। তাই সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের ভাব-মর্যাদা রক্ষা করা এবং তা পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব একক ভাবে পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশকের।
মুহম্মদ নূরুল ইসলাম
কক্সবাজার
০১১৯৯-৭০৭২৬১

0 Comments