Advertisement

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও মানা হচ্ছে না:সরকারের শীর্ষ প্রশাসনে স্থবিরতা

এনএনবি : মহাজোট সরকারের আড়াই বছরের মাথায় এসে ঝিমিয়ে পড়েছে প্রশাসন। প্রধানমন্ত্রীর আদেশ-নির্দেশও অনেক সময় মানা হচ্ছে না। শুধু তাই
 নয়, সচিবালয়ের নির্দেশিকা মানার বালাই নেই। ইতোপূর্বে জারি করা সিটিজেন চার্টার পরিণত হয়েছে কাগুজে নির্দেশনায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা না থাকা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে পেছনের সারির কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নসহ বিভিন্ন কারণে কর্মকর্তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে নেমে আসছে স্থবিরতা। 
সচিবালয়ে দলীয় আনুগত্যের কারণে পেছনের সারির  কর্মকর্তারা ওপরে উঠে আসেন।  কিছু কিছু কর্মকতা আছেন যখন যে সরকার তখন সে সরকারের লোক হয়ে সুযোগ বাগিয়ে নিচ্ছেন। এতে প্রশাসনের চেন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। জনপ্রশাসনে সংস্কারের জন্য বিগত তত্ত্বাবধায়ক আমলে কিছু বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতার কারণেও ঝিমিয়ে পড়ছে প্রশাসন। বর্তমানে এটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক মন্ত্রণালয় থেকে অন্য মন্ত্রণালয়ে কোন ফাইল গেলে তা গুরুত্ব না দিয়ে বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফাইলও ইচ্ছাকৃতভাবে ঘোরানোর মতো ঘটনাও ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি রমজানের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিযোগিতামূলক আইনটি ভোটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে এই আইনটি করা হচ্ছিল। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় ফাইলটি কয়েক সপ্তাহ আটকে রেখে পরে তা আবারও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বলে ফেরত পাঠায়। সেখানে যে অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে, তা আইন মন্ত্রণালয় সংশোধন করে দিতে পারত। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর খবরদারি দেখানোর মনোভাব প্রকাশ করেন। আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও অন্য মন্ত্রণালয়কে ছাড় দেয় না। তেমনি কোন কোন ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়েরও শরণাপন্ন হতে হয় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে। সে ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণায়ের কর্মকর্তারাও তাদের অজুহাত দেখানোর চেষ্টা করেন। এ সকল কারণেও ফাইলের ধীর গতি হয়ে যায়।
এক কর্মকতা বলেন, বিধান অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয় সকল মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুমোদন করে থাকে। আবার বিধানে রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুমোদন করবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের বাজেট নিজেরাই অনুমোদন করে থাকে। বাজেট অনুমোদনের জন্য তারা সংস্থাপনের অনুমোদনের প্রয়োজন মনে করে না।
সম্প্রতি সাধারণ ফাইলেও জরুরী বা অতিজরুরী লেখা থাকছে। তাই জরুরী অতি জরুরী ফাইলেরও গুরুত্ব কমে এসেছে। সে ক্ষেত্রে অতি জরুরী ফাইলের ক্ষেত্রে আবার তদ্বির করা হয়। এদিকে অপ্রয়োজনেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফাইল পাঠালে সেখানের কর্মকর্তারা তা প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন না। বরং তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তা উপস্থাপন করেন অনুমোদনের জন্য। কোন কোন কর্মকর্তা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর দফতরে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা মনে করেন আমরা সুপার মিনিস্ট্রি। বরং তাঁদের কাছে ফাইল না গেলে তাঁরা মনোক্ষুণœ হন।
সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে সস্প্রতি সড়কের বেহাল দশা নিয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে এবং বাইরে মন্ত্রীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। আর বৈঠক হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এতে কর্মকর্তারা খেই হারিয়ে ফেলছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘন ঘন বিদেশ সফর। শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত ১৫ ডিসেম্বরে ৩১৫ কর্মকর্তাকে উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। এ সময় জুনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তারা পদোন্নতির দাবিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের দ্রুত পদোন্নতির দাবি জানান। এ সময় তাদের অশ্বাস প্রদান করা হয় ২০১১ সালের মার্চ/এপ্রিলে যোগ্যদের পদোন্নতি প্রদান করা হবে। এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও এখন পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তেমন কোন তৎপরতা নেই। 
মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৮৭ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হলেও সে ক্ষেত্রে বঞ্চিত হওয়ার নজির সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ নেতার ছেলেও পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ার নজির সৃষ্টি হয়েছে সকল যোগ্যতা থাকার পরও। বিগত আমলে বঞ্চিত অনেক যোগ্য কর্মকর্তা এখনও রয়েছেন কোণঠাসা হয়ে। এমনকি তাঁদের অনেকেও রয়েছেন ওএসডি হয়ে। অথচ বিগত আমলেও তাঁরা ঘুরেছেন বারান্দা-বারান্দায়। জনপ্রশাসনে আবারও পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানেও শুরু হয়েছে রাজনীতি। চারদলীয় জোটের সুবিধাভোগীদের আবারও পদোন্নতি দেয়ার লক্ষ্যে এবার নিরপেক্ষ প্রশাসন গড়ার কথা বলে সকলকে এক কাতারে আনার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা বলছেন, কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেয়ার আগে অতীতের অপকর্ম চিহ্নিত করে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তার পর সকলকে এক কাতারে এনে নিরপেক্ষ প্রশাসন সাজাতে হবে।  তাঁরা বলছেন, আমরাও চাই একটা সুন্দর দেশ গড়তে। কিন্তু ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সুবিধাভোগীরা, এমএম গোলাম কিবরিয়ার হত্যার সুবিধাভোগীদের এক কাতারে এনে কোন নিরপেক্ষ প্রশাসন সাজানো সম্ভব নয়।
সূত্র জানায়, পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা হয় না। সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের তালিকা প্রদান করেন। এই তালিকা অনুমোদন করতে প্রয়োজনীয় সকল তথ্যও তাঁরা সরবরাহ করে থাকেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ওই তালিকা যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয় না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পছন্দের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে আসছেন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি উপলব্ধি করেছেন ইতোপূর্বে উপসিচবের পদোন্নতির ফাইল অনুমোদন করতে গিয়ে (১৫ ডিসেম্বর ৩১৫ কর্মকর্তাকে উপসচিবে পদোন্নতি দেয়া হয়)। জানা গেছে, এই পদোন্নতির ফাইল অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠালে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এই তালিকা থেকে ৬ কর্মকর্তার নাম কেটে দেন। দুই সপ্তাহ পরে তিনি ফাইলটি অনুমোদন করেন। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে পদোন্নতি প্রদানের কারণে প্রশাসনের মাথাভারি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, বিগত আড়াই বছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনও সরকারকে উল্লেখযোগ্য কোন পরিকল্পনা দিতে পারেনি। ঘন ঘন বিদেশ গমন এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের শায়েস্তা করাই যেন এখন এই মন্ত্রণালয়ের মুখ্য কাজে পরিণত হয়েছে। অপছন্দের কর্মকর্তা হলে মন্ত্রীর ডিওকেও পাত্তা দেয়া হয় না। আবার পছন্দের কর্মকর্তা অযোগ্য হলেও তাকে বসানো হয় গুরুত্বপূর্ণ পদে। এতে প্রশাসন ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ছে শ্লথ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে এত ব্যস্ত যে তারা অন্য কিছু করার বা দেখার সুযোগ পায় না। 
সচিবালয়ের নির্দেশিকা মানার বালাই নেই। ইতোপূর্বে জারি করা সিটিজেন চার্টার পরিণত হয়েছে কাগুজে নির্দেশনায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় না থাকায়ও মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে স্থবিরতা সৃষ্টি করছে। এতে করে সরকারের অনেক ভালো উদ্যোগের সুবিধা পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। সরকারের উন্নয়নে সদিচ্ছা থাকলেও  মন্ত্রণালয় তা বাস্তয়নে ধীর গতি নিচ্ছে। ফলে সামগ্রীক ভাবে সরকারে উপর মানুষের আস্থা দিন দিন কমছে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী নেতারা এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত না নিলে পরে অনেক মাসুল দিতে হতে পারে বলে রাজনৈতিক অভিজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।

Post a Comment

0 Comments