Advertisement

কক্সবাজারের পাশাপাশি টেকনাফে নতুন হোটেল-মোটেল জোন তৈরির পরিকল্পনা

কক্সবাজার থেকে ফিরে : বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আসা-যাওয়া, অবস্থান এবং রাতে থাকার কারণে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ বিপন্ন হতে বসেছে। তাই সেখানে পর্যটকদের রাতে থাকা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে। পর্যটকদের সেন্ট মার্টিনে গিয়ে দিনেই ফিরতে হবে। তবে পর্যটকদের যাতে রাতে থাকা-খাওয়ার সমস্যা না হয়,
সে জন্য কক্সবাজারের পাশাপাশি টেকনাফে নতুন হোটেল-মোটেল জোন তৈরির পরিকল্পনা চলছে।২০ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাহারুল ইসলামকে সভাপতি করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয় বৈঠকে। বৈঠকে উপস্থিত কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শুকুর আলী প্রথম আলোকে বলেন, ১২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনে পর্যটক আনাগোনা অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় দ্বীপটির পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। এ কারণে সেন্ট মার্টিনকে শুধু ডে-ট্যুরিজমের (দিবা পর্যটন) জায়গা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, প্রায় ৪০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যেতে হয়। সেন্ট মার্টিনে গিয়ে পর্যটকেরা সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যার আগে টেকনাফ ফিরে আসবেন। তাঁদের জন্য টেকনাফে গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন হোটেল-মোটেল জোন।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে শুধু দিনে পর্যটনসুবিধা চালুসহ ২৫টি প্রস্তাব নিয়ে গত বৃহস্পতিবার বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সভা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মিহিরকান্তি মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পুলিশ, গণপূর্ত বিভাগ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, কক্সবাজার জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বলা হয়, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে দিবা পর্যটন চালুসহ আনুষঙ্গিক সিদ্ধান্তের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত দরকার।
টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে দেখা যায়, চার-পাঁচ বছর আগে সেন্ট মার্টিনে বছরে গড়ে পর্যটক আসতেন পাঁচ হাজার। এখন আসছেন ২০ লাখের বেশি। অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত টেকনাফ-সেন্ট মার্টিনের মধ্যে ছয়টি জাহাজে করে পর্যটকেরা যাতায়াত করেন। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের জন্য এই দ্বীপে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অন্তত ৫২টি আবাসিক হোটেল, কটেজ ও রেস্টহাউস।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মারুফ হোসাইন সেন্ট মার্টিন নিয়ে ২০০৬ সালে বিস্তারিত গবেষণা চালান। ‘রিপোর্ট অন একুয়াটিক পলিউশন ফর সেন্ট মার্টিন’ শীর্ষক এই গবেষণাকর্মের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্রাতিরিক্ত জনবসতির চাপে দ্বীপের খাওয়ার পানি ক্রমেই লবণাক্ত হয়ে উঠছে। দূষণের কারণে দ্বীপের বহু জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
মার্কিন কোরাল বায়োলজিস্ট টমাস টমাসিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, দিনে ৮৫০ জনের বেশি পর্যটক গেলে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ বিপন্ন হবে না। অথচ শীত মৌসুমে দিনে তিন-চার হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন যাচ্ছেন এবং রাতে থাকছেন।
পরিবেশবিদ ও গবেষকেরা মনে করেন, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিতে বিরল প্রজাতির কয়েকটি মাছের প্রজনন ও রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। বিপন্ন প্রজাতির কিছু কাছিম এখানে ডিম পাড়তে আসে। শীতের অতিথি পাখির (ওয়াটার বার্ড) চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথের মধ্যে পড়ে সেন্ট মার্টিন। পাখিরা এখানে বিশ্রাম করে আবার চলে যায়। এটাকে অস্ট্রেলিয়ান এশিয়ান ফ্লাই রুট বলা হয়। বিশ্বের বিলুপ্তপ্রায় কিছু প্রজাতির পাখিও এখানে আসে। এসব বিবেচনা থেকে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, টেকনাফের সাবরাং মৌজায় ৭৫০ একর খাসজমি আছে। এ জমিতে কোনো বসতবাড়ি নেই। ভূমি মন্ত্রণালয় এ জমিতে নতুন হোটেল-মোটেল জোন তৈরির পরিকল্পনা করছে। পাশে সিলখালী এলাকায় প্রায় ১০০ একর জায়গায় শুধু বিদেশিদের জন্য বিশেষ পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

Post a Comment

0 Comments