মহাবিশ্ব ক্রমাগত বেড়ে না চলে হয়তো ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আবার সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। পদার্থবিজ্ঞানী আন্দ্রে লিন্দ্র এবং স্ত্রী রেনাটা কার্লোস যে গবেষণা করেন তার ফল মহাবিশ্বের মহাসঙ্কোচনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে তুলেছে। মহাবিশ্ব আগামী ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন বছরে
সঙ্কুচিত হয়ে বিন্দুর চেয়েও ছোট হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। মহাবিশ্ব বর্তমান বয়স প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর। আর এতদিন আমাদের ধারণা ছিল মহাবি শ্বের জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু লিন্দ্র-কার্লোস মডেলের মধ্যে, মহাবিশ্ব তার জীবনকালের মাঝামাঝি সময়ে অবস্থান করছে।সৃষ্টি হওয়ার পর আমাদের মহাবিশ্ব কিন্তু প্রতিনিয়ত স্ফীত হয়েই চলেছে। গ্যালাক্সিগুলো কিন্তু প্রতিনিয়ত একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় এদের কাউকে দৃষ্টিসীমায় পাওয়া যাবে না এবং প্রায় ১৫০ বিলিয়ন বছর পর আমাদের ছায়াপথ নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়ে থাকবে অন্ধকার মহাশূন্যে। এ প্রচলিত তর্কটাই আমাদের সবার মাঝে ঘুরেফিরে আসত। কিন্তু গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির কসমোলজিস্টরা জানান, মহাবিশ্ব ক্রমাগত বেড়ে না চলে হয়তো ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে আবার সঙ্কুচিত হয়ে যাবে। পদার্থবিজ্ঞানী আন্দ্রে লিন্দ্র এবং স্ত্রী রেনাটা কার্লোস যে গবেষণা করেন তার ফল মহাবিশ্বের মহাসঙ্কোচনের সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে তুলেছে। লিন্দ্র জানান, তারা মহাবিশ্বের ক্রমাগত বেড়ে চলার ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করার জন্য একটি কার্যকর তত্ত্ব দাঁড় করাতে চাইছেন। অবশ্য এটি এখনো একটি মডেল মাত্র। এ মডেল নির্ভুল হলে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এক সময় থেকে যাবে এবং এরপর সঙ্কুচিত হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এখন আমরা যেগুলোকে অসীম দূরত্বে দেখতে পাই সেগুলো সব একে অপরের কাছে আসতে আসতে সঙ্কুচিত হয়ে প্রোটনের চেয়েও ছোট একটি বিন্দুতে এসে পৌঁছাবে।
মহাজাগতিক বস্তুগুলোর মধ্যে যে মহাকর্ষ শক্তি রয়েছে তাকে অগ্রাহ্য করে মহাবিশ্বকে ক্রমেই প্রসারিত করার মতো শক্তিশালী ছিল এ অদৃশ্য শক্তি। যদি এ রহস্য অদৃশ্য শক্তিটি না থাকত তাহলে সাধারণত আপেক্ষিকবাদ তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব মহাকর্ষ বলের কারণে সঙ্কুচিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত; কিন্তু ১৯২০ সালে এডউইন হাবল ও অন্য বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করলেন, গ্যালাক্সিগুলো স্থির নেই। এগুলো একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর যেহেতু মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাই আইনস্টাইন তার তত্ত্ব থেকে অপ্রয়োজনীয় বলে মহাজাগতিক ধ্রুবককে বাদ দিয়ে দিলেন। এরপর তার আত্মোপলব্ধি ছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হলো এ মহাজাগতিক ধ্রুবক।
এরপর ১৯৮৮ সালে দুটি আলাদা জ্যোতির্বিজ্ঞানীর দল আবিষ্কার করলেন মহাবিশ্ব বেড়ে চলার পাশাপাশি এ সম্প্রসারণের গতি দিন দিন বেড়ে চলছে। তারা সুপারনোভা নিয়ে পরীক্ষা করে জানতে পারলেন যে এগুলোর গতি ক্রমেই বাড়ছে এবং মহাকর্ষ বলে এদের যতখানি আটকে রাখতে পারত, তাদের ত্বরণের হার তার চেয়েও বেশি; কিন্তু মহাবিশ্ব কোনো বলের কারণে মহাকর্ষ বলকে অতিক্রম করতে ক্রমেই ত্বরান্বিত হচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে ৮০ বছর পর এখন বিজ্ঞানীরা ভাবছেন, হয়তো আইনস্টাইন ঠিকই ছিলেন। তিনি যেটিকে মহাশূন্যের অদৃশ্য শক্তি বলেছিলেন সেটিকেই এখন ডার্ক এনার্জি বা কৃষ্ণশক্তি নামে অবিহিত করা হচ্ছে। প্রচলিত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের তত্ত্বের ক্ষেত্রে কৃষ্ণশক্তির পরিমাণ সবসময় শূন্যের চেয়ে বেশি এবং চিরকাল এমন থাকবে। তাই প্রশ্ন জাগে মহাবিশ্ব যদি সঙ্কুচিত হয় তাহলে কৃষ্ণশক্তির এ ধনাত্মক মান কীভাবে ঋণাত্মক মানে পরিণত হবে?
কিন্তু কোয়াটাম পদার্থবিদ্যা ও কণাবিদ্যার জগতে প্রতিদিনের যুক্তি খাটে না। বিগত বছরগুলোয় পদার্থবিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেন, স্ট্রিতত্ত্ব বা সুপারগ্রাভিটি তত্ত্ব দিয়ে ধনাত্মক কৃষ্ণশক্তির উৎপত্তি বোঝা যায় না। লিন্দ্র এ সম্পর্কে বলেন, 'যে কয়টি তত্ত্বের উদ্ভব সম্পর্কে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারে সেখানে দেখা যায় কৃষ্ণশক্তির মান ধীরে ধীরে ঋণাত্মক হয়ে যাবে। যার অর্থ মহাবিশ্ব সঙ্কুচিত হতে এক বিন্দুতে পরিণত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।'
লিন্দ্র-কার্লোস মডেলের অবাক করা ব্যাপার হলো, মহাবিশ্ব আগামী ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন বছরে সঙ্কুচিত হয়ে বিন্দুর চেয়েও ছোট হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। মহাবিশ্ব বর্তমান বয়স প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর। আর এতদিন আমাদের ধারণা ছিল মহাবিশ্বের জীবনযাত্রা শুরু হয়েছে। কিন্তু লিন্দ্র-কার্লোস মডেলের মধ্যে, মহাবিশ্ব তার জীবনকালের মাঝামাঝি সময়ে অবস্থান করছে। লিন্দ্র স্ফীতিতত্ত্বের সমর্থক। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, 'শূন্য অবস্থা থেকে অসম্ভব রকম দ্রুতসারিত হয়ে মহাবিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে।' তার বিশ্বাস, 'মহাবিশ্ব দেখতে আসলে বুদবুদের মতো নয়, বরং বুদবুদ থেকে আরেকটি বুদবুদ তৈরি হচ্ছে এ ধরনের। আমরা ছোট একটা বুদবুদের মধ্যে বাস করি এবং বলি এটা আমাদের মহাবিশ্ব। যদি আমাদের বুদবুদটি এক সময়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে অন্য জায়গায় আরেকটি বুদবুদ জন্ম নেয়। হয়তো সেখানে একেবারে অন্যরকম জীবন পুনর্বিবর্তিত হয়। মহাবিশ্বে আমাদের অংশটি হয়তো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্ব অমর। এটি শুধু এর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের মাত্রা। মহাবিশ্ব যে অংশে বুদ্ধিমান জীবন বাস করে, তারা সেখানে তাদের অবস্থান নিয়ে জানার চেষ্টা করবে যে কীভাবে এর উদ্ভব হলো, কীভাবে এটি ধ্বংস হবে ইত্যাদি। কিন্তু তারপর সবই মহাবিশ্ব ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্তি হবে।
ইন্টারনেট থেকে


0 Comments