শামসুল আলম শারেক, টেকনাফ ॥
টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে
মিয়ানমারে ডিজেল ও ইউরিয়া সার পাচারের মহোৎসব চলছে। পাশাপাশি পাচার
হচ্ছে চাল, ছোলা, চিনি, ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ঈদকে সামেন
রেখে সীমান্তে বিপুল সংখ্যক চোরাকারবারী সিন্ডিকেট তৎপর হয়ে উঠেছে। এসব
চোরাকারবারীরা রাতে আঁধারে পাচার করছে উপরোক্ত পণ্য। সীমান্তের বিভিন্ন
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী নাসাকা এসব পণ্য
পাচারে বাংলাদেশের চোরাকারবারীদের উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি সামগ্রীক সহায়তা
দিচ্ছে। সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন নাসাকা ফাড়ী সংলগ্ন এলাকায় খোলা হয়েছে
চোরাইপণ্য মজুদের গোডাউন। মিয়ানমারের তমব্রু, বালুখালী, কুমিরখালী,
ঝিয়ংখালী, হাঁইচ্ছালতা, হাইংপ্রাং, রোয়াইঙ্গাদং, নাপ্পুরা, বলিবাজারসহ
২০টি এলাকায় গোডাউন খোলে সেখানে বাংলাদেশী চোরাইপণ্য মজুদ করা হয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, এসব গোডাউন নাসাকা কর্তৃক ইজারা দেয়া হয়েছে।
মিয়ানমারের ২ লাখ কিয়াট (টাকায়) দিয়ে ইজারাদাররা (কুজলী) এসব গোডাউন
ইজারা নেয়। প্রতিদিন নাসাকার ইজারাকৃত গোডাউনে মজুদ করা বাংলাদেশী পণ্য
ইজারাদাররা মংডু, আকিয়াব এলাকায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে ও
মাছ ব্যবসায়ীরা চোরাইপণ্য পাচারের অবাক বর্ণনা দেন। জানা যায়, টেকনাফের
হ্নীলা থেকে হাজার হাজার লিটার তেল মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। অসাধু ডিলাররা
নানা কৌশলে ডিজেল, কেরোসিন চোরাকারবারীদের কাছে সরবরাহ করছে। এলাকায় বিপুল
তেলের চাহিদা দেখিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসা তেল মিয়ানমারে পাচার
করছে। হ্নীলা ষ্টেশনে ১টি পাম্প, ২টি ডিলার ও ২০টির মত ইউএনওর অনুমোদিত
খুচরা তেল বিক্রয়ের দোকান। এছাড়া মৌলভীবাজার, খারাংখালী, হোয়াইক্যংসহ
বিভিন্ন এলাকায় ইউএনওর অনুমোদিত বেশ কিছু খুচরা তেল বিক্রয়ের দোকান
রয়েছে। ডিলারগুলো প্রতিসাপ্তাহে হাজার হাজার লিটার তেল নিয় আসার পাশাপাশি
খুচরা বিক্রেতারাও বিপুল চাহিদা দেখিয়ে কক্সবাজার ও উখিয়া থেকে নিয়ে
আসছে ডিজেল ও কেরোসিন। অভিযোগে জানা যায়, হ্নীলার বিএন ট্রেডার্স থেকে
সন্ধ্যা ও ভোরে চোরাকারবারীদের তেল বিক্রয়ের হিড়িক পড়ে। গত ১০ দিনে
হাজার হাজার লিটার তেল চোরাচালানীদের হাতে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগ
উঠেছে। সূত্র মতে উক্ত ডিলার প্রতিমাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার লিটার তেল
চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে আসে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএন ট্রেডার্সের
মালিক স্থানীয় জামায়াত নেতা নুরুল বশর। তিনি প্রতিমাসে ৫ গাড়ীতে তেল
আনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এলাকায় তেলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। চট্টগ্রাম
থেকে নিয়ে আসা তেল খুচরা বিক্রেতা ও ট্রলি, ট্রাক্টর, জেনারেটর ও বিভিন্ন
স্থানে সরবরাহ করা হয়। বিএন ট্রেডার্সের মালিক উল্টো অভিযোগ করেন, ইউএনওর
অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতার কাছে তেল বিক্রি করতে গিয়ে বিজিবির হয়রাণীর
শিকার হচ্ছে। এছাড়া হ্নীলা এজেন্সেী, ইলিয়াছ এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন
খুচরা বিক্রেতারা প্রতিনিয়ত চোরাকারবারীদের কাছে তেল বিক্রি করে দিচ্ছে।
এসব চোরাচালানরোধে ৪২ ব্যাটালিয়ানের কমান্ডিং অফিসারের কড়া নির্দেশনা
থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় অসাধু বিজিবি সদস্যরা রহস্যজনকভাবে দেখেও না দেখার
ভান করে থাকে। এলাকার স্থানীয় লোকজন জানান, এ এলাকার তেলের চাহিগদা যাচাই
করলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের নিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ তেল কোথায় যায় এ রহস্য
বেরিয়ে আসবে। এদিকে টেকনাফের হ্নীলা ও হোয়াইক্যং বিওপি ক্যাম্প বিজিবির
গতকাল ও পরশু পৃথক অভিযান চালিয়ে ডিজেল, ভোজ্য তেলসহ বিপুল পরিমাণ
চোরাইপন্য আটক করেছে। এছাড়া গতকাল টেকনাফস্থ বিজিবির বিওপির জওয়ানরা
অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারে পাচারকালে বিপুল পরিমানে ওষুধ, ২মণ পেঁয়াজ, ৯মণ
আলু, ৯০ লিটার ভোজ্যতেল, ৩ মণ সেমাই, ৬৫ কেজি খেজুর , ৫০কেজি সার, ৩মণ
ময়দা, ১৫ লিটার দুধ ও ৫২০ লিটার জ্বালানিসহ ২টি নৌকা জব্দ করা হয়।
জব্দকৃত মালামালের মূল্য প্রায় তিন লক্ষ টাকা। টেকনাফ কাষ্টমস শুল্ক
বিভাগের গোদাম কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, অবৈধভাবে মিয়ানারের
পাচারকালে জব্দকৃত পণ্য সামগ্রী গুলো শুল্ক বিভাগে জমা করা হয়েছে। ৪২
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) টেকনাফ ব্যাটলিয়ানের অধিনায়ক লে কর্ণেল
জাহিদ হাসান নিশ্চিত করেন। টেকনাফ থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) স্বপন
কুমার মজুমদার জানান, এ ব্যাপারে বিজিবি বাদী হয়ে মামলার রুজু করা
হয়েছে।

0 Comments