নয়নকক্সনিউজ ডট কম
সম্ভাবনাময় তরুণ গায়ক শাহরিয়ার আবিদ, বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রা’র কর্মকর্তা আশিক এবং আবিদের সহকর্মী মুক্তাকিন তূর্যের অস্বাভাবিক মৃত্যু দেশের সকলকে যেন ভূমিকম্পের মতো নাড়া দিয়ে গেলো। এমন তিনজন তরুণের এভাবে মৃত্যু হবে তা তাদের পরিবার বা পরিচিতজনদের কাছে একেবারেই অবিশ্বাস্য ছিল। দুচার মিনিট আগেও যে তিনজন তরুণ ছিল প্রণোচ্ছল, হয়তো সমুদ্রের পানিতে নিজেদের ভিজিয়ে আনন্দ উপভোগ করছিল। একটি ঢেউই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু কেড়ে নিয়ে গেলো। স্তব্ধ করে দিলো ৩টি প্রাণের সকল স্পন্দনকেই। এরই নাম আকস্মিক দুর্ঘটনা, সমুদ্রের নির্দয়, নিষ্ঠুর আচরণ, করাল গ্রাস। আমরা বুঝতে পারছি ৩ জন তরুণের মা-বাবা ও নিকটজনের জন্য এই মৃত্যুর যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো খুবই কষ্টের বিষয়। তারা তিনজনই শুধু তাদের পরিবারের কাছেই প্রিয় ছিল না, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও খুবই পরিচিত নাম হয়ে উঠছিল তারা। আবিদের গানতো ২০০৫ সালের ক্লোজআপ ওয়ানের সময় থেকে শ্রোতাদের মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তার কণ্ঠ এবং গায়কী বৈশিষ্ট্য শ্রোতাদের মুগ্ধ করার মতো ছিল। বেঁচে থাকলে আবিদ সঙ্গীতে দেশকে অনেকটাই সমৃদ্ধ করতে পারতো। আবিদের সহকর্মীরা বিজ্ঞাপন শিল্পেও হয়তো অনেক অবদান রাখতে পারতো। কিন্তু সবই এখন চুকিয়ে তারা তিনজন স্মৃতির জগতের অধিবাসী হয়ে গেলো। আমি তিনজনের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। জানি না, তাদের পরিবারের সদস্যগণ আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের অনুভূতির কথা জানতে পারবেন কিনা। আবিদ, তূর্য ও আশিক যে বয়সে চিরবিদায় নিয়েছে তা আমারও সন্তানের বয়স। এদের মৃত্যু আমাদের বেঁচে থাকা সন্তানকে মনে হয় একটি বড় ধরনের সতর্ক সংকেত দিয়ে গেছে। এ নিয়েই আমার কিছু কথা।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এমন মৃত্যু প্রথম ঘটনা নয়, বরং প্রায়ই ঘটে থাকে। অনেক পরিবার আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে কক্সবাজার যান, কোনো কোনো পরিবারকে ফিরতে হয় প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথা, কান্না ও শোক নিয়ে। অনেক বাবা-মা কোলের শিশুকে হারিয়ে পাগল-প্রায় হয়ে যান। সারা জীবন সামান্য ভুলের সীমাহীন ক্ষতি ও যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা মোটেও কম নয়। সমুদ্র সৈকতে দুর্ঘটনা কিছু না কিছু ঘটে থাকেই। জানি না, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের মতো পৃথিবী বিখ্যাত সমুদ্র সৈকতগুলোতে ঘটে কিনা, সে রকম কোনো পরিসংখ্যান আমার জানা নেই। তবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতটি কয়েকবারই আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। পৃথিবীর উন্নত কয়েকটি দেশেও দুএকটি সমুদ্র সৈকতে আমার যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। গেলো বছর আমি কিউবায় চোখের চিকিৎসার জন্য যখন গিয়েছিলাম তখন হাভানা শহরের তীর ঘেঁষে বিশাল সমুদ্র সৈকতের দৃশ্য দাঁড়িয়ে অবলোকন করার সৌভাগ্য হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয়, আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এবং সৈকতগামী মানুষের চিন্তা-ধারার মধ্যে বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। সময় এসেছে বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলার। প্রথম যে বিষয়টিতে পৃথিবীর অনেক সমুদ্র সৈকত থেকে আমাদের সৈকতের পার্থক্যটি চোখে পড়ে তা হলো, এর অব্যবস্থাপনা, এখানে নজরদারি করার মতো যেন কোনো কর্তৃপক্ষই নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই হ্যান্ডমাইক নিয়ে একদল মানুষ সৈকতের সর্বত্র টহলরত অবস্থায় থাকেন, যারা স্নানরত মানুষদের নানা পরামর্শ দেন মাইকে। সমুদ্রে স্পিডবোটে টহলরত থাকেন আর একদল কর্মী, তারা তীক্ষè নজর রাখেন উচ্ছল স্নানকারীদের প্রতি। সবচাইতে বড় বিষয় হচ্ছে, জোয়ার-ভাটার বিষয়টি তারা দুইদিক থেকেই সতর্ক করে দেন, কখন পানিতে নামা একেবারেই নিষিদ্ধ তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় সৈকত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ থেকে। কোনো অবস্থাতেই তা লঙ্ঘন করতে দেয়া হয় না। দ্বিতীয় যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হচ্ছে, অনেক দেশেই সৈকতের পুরো এলাকায় বড় বড় পাথরখ- বিছানো থাকে। পানিতে নেমে পায়ের নিচে পাথর পেলে যে কোনো মানুষেরই দাঁড়ানোর একটি অবলম্বন থাকে।
আমি কৃষ্ণ সাগরের সৈকতে অন্তত দুবার ২০ দিন করে অবকাশযাপন করেছিÑ যখন আমার বয়স আবিদের মতোই ছিল। কিন্তু সেখানে পানিতে নেমে পাথরের বড় বড় টুকরোর ওপর দাঁড়িয়ে স্নান করার স্মৃতি এখনো মনে পড়ে। অবশ্য নিরাপত্তা প্রহরীদের সতর্কতা ভঙ্গ করে পানিতে নামার কোনো সুযোগ ছিল না, ইচ্ছাও হয়নি। তাছাড়া সঙ্গে থাকা আমাদের শিক্ষকরা প্রায়ই সমুদ্র স্নানের ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন মেনে চলার বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিতেন। তারপরও যে দুএকটি দুর্ঘটনা ঘটেনি তা বলা যাবে না। তবে তা খুবই নগণ্য। গেলোবার হাভানা সৈকতে আমার স্ত্রীসহ দাঁড়িয়ে সমুদ্র স্নানের দৃশ্য অবলোকন করেছি। সেখানেও নিরাপত্তার দিকগুলো কড়াকড়িভাবেই পালন করতে দেখেছি। বিশাল সৈকতজুড়ে পাথরের বড় বড় খ-গুলো নিরাপত্তা বিধানে অনেক বেশি সহায়ক। এসব বিষয় যাদের জানা আছে তারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে নামতেই ভয় পাওয়ার কথা। এখানে বালির সৈকত, একটু নামতেই বালির গর্ত পায়ের নিচে যেন জানান দেয় এ যেন মৃত্যুফাঁদ। স্থানীয় ছেলেপুলেরা অবশ্য ঐসব বালির গর্ত সম্পর্কে সাবধান করে দেয়। কিন্তু তাতে কী তেমন বেশি কাজে আসে? স্থানীয়রা ‘চোরাগর্ত’ নিয়ে যতো সতর্কই করুক না কেন, সমুদ্র সৈকতে আসা অনেকেই তা ভুলে যায়। সে কারণে দুর্ঘটনারও শিকার হয় তারা। এমন বালির সৈকতের নিয়ম-কানুনগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার কথা না জেনে সমুদ্র স্নান করতে নামার পরিণতি কারো কারো জন্য মৃত্যুফাঁদে পা দেয়া হয়ে দাঁড়ায়। সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা সম্পর্কেই আমাদের অনেকের ধারণা নেই। তাছাড়া শহরের ছেলেমেয়েদের বড় একটি অংশই কখনো পুকুরে নেমে স্নান করার অভ্যাস গড়ে তোলেনি। তারাই যখন সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের গর্জন বা আওয়াজ শোনে, পানির স্বচ্ছতা দেখে, ছোট বড় ঢেউ দেখেÑ তখন বাধভাঙা প্রাণোচ্ছলে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। বুঝতে পারে না সমুদ্র সৈকতে কীভাবে নিজেকে সংযত রাখতে হয়, আচরণ করতে হয়। তাছাড়া অনুশাসনে চলার জীবনে আমরা খুব একটা অভ্যস্তও নই। সমুদ্র সৈকতে এসে সকলেই নিজেকে সমুদ্রের মতো উচ্ছল, অসীম, উদাস ভাবতে শুরু করে নিজিকে। নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি অনেকেরই চিন্তার বাইরে চলে যায়। বিশেষত তরুণদের মধ্যে এ ধরনের অবারিত পরিবেশে নিজেদেরকে সংযত করার চিন্তা অনেকটাই হারিয়ে যায়। তখনই ঘটে যায় যতো সব বিপদ। জানে না, কখন সমুদ্রের জলে নামতে হয়, কখনো নামতে নেই। কেউ বললেও তাকে খুব একটা আমলে নেয়া হয় না। তারুণ্যের শক্তি বুঝতে চায় না সমুদ্রের ঢেউ কতো বেশি শক্তিশালী। এ ধরনের পরিস্থিতিতেই ঘটে অকস্মাৎ দুর্ঘটনা। যখন ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে যাওয়া, ডুবে যাওয়া, চোরাগর্তে ডুবে যাওয়া ইত্যাদি অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাঁধভাঙা আনন্দ তখন শোক ও কান্নার ঘটনাই অনেকের জীবনে বয়ে আনে। অথচ সকলে কক্সবাজার যাচ্ছে আনন্দ ভ্রমণ করতে। নগরজীবনের কোলাহল ও ব্যস্ততাকে দুএকদিন ভুলে থাকার জন্য, কিন্তু কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের বৈশিষ্ট্য, সমুদ্রস্নানের নিয়ম-কানুন, পরিবেশ পরিস্থিতি না বোঝার কারণে অনেকেই সলিল সমাধির মুখে পড়েন, প্রিয়জন, দেশ ও জাতির অনেক সম্ভাবনাময় মানুষকে হারাতে হয় আমাদেরকে। যেমনিভাবে আবিদ, তূর্য ও আশিককে আমাদের হারাতে হলো।
আমি নিশ্চিত সমুদ্র সৈকতে গিয়ে আমরা যদি নিয়ম-কানুনের মধ্যে স্নান করা, আনন্দ উপভোগ করাসহ যাবতীয় দিকগুলো মেনে চলি তা হলে এমন দুর্ঘটনা হয়তো ঘটতো না, এমন অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীনও কাউকে হতে হতো না। সে কারণে আমার বক্তব্য দুটো। এক. কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে একটি কার্যকর পর্যবেক্ষণ টিম বা প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করাÑ যা সমুদ্র সৈকতটিকে মানুষের যথার্থ আনন্দ ভ্রমণের জায়গা হিসেবে গড়ে তুলবে, এর বিদ্যমান মৃত্যু ফাঁদগুলোর অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেবে, নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে মেনে চলার ব্যবস্থা করবে। দুই. যারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আনন্দ ভ্রমণে যাবেন তাদেরকেও এর নিয়ম-কানুনসমূহ কঠোরভাবে মেনে চলার মানসিকতা অর্জন করতে হবে। সমুদ্র সৈকত আধুনিক দুনিয়ায় সত্যিই আনন্দের এক বিরল সুযোগ। আমাদের সমুদ্র আছে, সেই সুযোগও তাই আছে। কিন্তু আমরা সমুদ্র সৈকতের মৃত্যুফাঁদ সম্পর্কে মোটেও সচেতন নই। তাই বিপদ এবং দুর্ঘটনার কষ্ট আমাদের ছাড়ছে না। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতটি আামদের যেন আর কোনো জীবনকে গ্রাস করতে না পারে সেই চেষ্টা আমাদের করতে হবে।
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

0 Comments