শুধু রোহিঙ্গার জটলা। আবার কারো মুখে নাওয়া -খাওয়াও নেই।
খাদ্যের জন্য ছোট শিশুদের আহাজারী। স্থানীয় লোকজনের দেওয়া শুকনা খাবার,
কিছু খিচুড়ি নিয়ে গত ২দিন একরাত পার করেছে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের
আনজুমান পাড়া সীমান্তের এপারে জড়ো হওয়া রোহিঙ্গারা।
গত রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ৯টা থেকে পরদিন সোমবার সকাল ৭ -৮
টা পর্যন্ত রোহিঙ্গার শ্রোতা ধরে। পাহাড় -জলপথ মাড়িয়ে এপারে চলে আসে অন্তত
২০ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা। স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে নতুন করে আসা রোহিঙ্গার
সংখ্যা অনুমান করলেও শ্রোত দেখে স্থানীয় লোকজন জানান, জড়ো হওয়া রোহিঙ্গার
জটলা এবং বিচ্ছিন্ন ভাবে বিভিন্ন বস্তির আশপাশে চলে যাওয়াদের মিলিয়ে অর্ধ
লাখের কম নয় বলে ধারণা করা হয়।পাশাপাশি মংগলবার (১৭ অক্টোবর)
বিচ্ছিন্নভাবে আরো কিছু রোহিঙ্গা ক্রমশঃ যোগ হয়ে জটলার পরিধি
সময় যত ঘনাচ্ছে ততই বাড়ছে। তবে এপারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি রয়েছে
কড়া প্রহরায়। গত রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত
এপারে চলে আসা রোহিঙ্গাদের বর্ণনা এবার ভিন্ন। তারা বলছেন,
মগসেনারা শারিরীক নির্যাতন করছেনা। এবার মানসিক নির্যাতন চলছে। পুরো পাড়া
অবরুদ্ধ করে রাখে গত এক সপ্তাহ ধরে। কোথাও যেতে দিচ্ছেনা। দোকানপাট বন্ধ,
বাজার বন্ধ, সদায় নেই। ফলে খাবার সংকট তীব্র থেকে তীব্রতায় রুপ নেয়।
নিরুপায় হয়ে এপারে কেউ ২ দিন, আবার অনেকেই ৪/৫ দিন পাহাড়, বনজংগল, জলাশয়,
খাল -বিল মাড়িয়ে নদী পার। এভাবে চলে আসা প্রান যেন যায় -যায় অবস্থা ক্লান্ত
দেহে। এমনই বর্ণনা করছিলেন, বুচিডং থানার মগনামা, কোয়াইনডং, মনিপাড়া,
লামার পাড়া থেকে চলে আসা রোহিঙ্গাদের নবী হোছন (৫০), মোঃ সালাম (৩৫),মরজিনা
বেগম (২৪), নুর হাসিনা (৪২) সহ অনেকেই।
তারা আরো জানান, ইতিমধ্যে মগসেনারা ভিন্ন নির্যাতনে নেমেছে।
পুরো রোহিঙ্গা গ্রাম জিম্মি করে রেখেছিল, না খেয়ে ছোট -ছোট বাচ্চাদের অনেক
ঠকিয়েছি। শেষমেষ মগসেনাদের উপস্থিতি নজরে রেখে ফাকফোঁকর দিয়ে পালিয়ে আসতে
সক্ষম হয় তারা। প্রসঙ্গতঃকক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের
আনজুমান পাড়া পয়েন্ট দিয়ে সোমবার একদিনেই ২০ সহস্রাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ
করেছে।আরো রোহিঙ্গা এপারে ঢুকতে মিয়ানমারের ওপারে কুয়ান্সিবং,চাকমা কাটা
সীমান্তেও এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ভাবে রোহিঙ্গারা ঝাড়েঁ -জঙ্গলে অপেক্ষা
করছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা বেশী।
এপারে চিংড়ি ঘেরের বাধাঁর, খালের পাড়ে এবং পাহাড়ি ঢালে
অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি অবলোকন করতে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের
পদস্থ কর্মকর্তা,এনজিও প্রতিনিধি ও সাহায্য সংস্থার লোকজন পরিদর্শনে যান।গত
১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৯ থেকে ১৬ অক্টোবর সকাল ৮ টা পর্যন্ত ২০ হাজারের অধিক
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে করেছে বলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা অনুমান করেছেন।
বর্তমানে তারা পালংখালীর আনজুমানের উত্তর পাড়া সীমান্তে অর্থাৎ নাফ নদীর
বেড়ী বাঁধে অবস্থান করছেন।এদিকে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ সীমান্ত দিয়েও রাতের
আধাঁরে নৌকা যোগে প্রায় দেড় হাজারের অধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। এদের
মধ্যেও বেশীর ভাগ রাখাইনের বুছিডং থানার বাসিন্দা।
এরমধ্যে রোববার রাতে নাফ নদ পার হতে গিয়ে নাফ নদ ও সাগরের
মোহনায় আবারো নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। নৌকা ডুবির ঘটনায় ৫ শিশু ও ৬ নারীর
মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশংকা করছেন
স্থানীয়রা। এঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২১ জনকে। আরো অন্ততঃ ৩০ জন
রোহিঙ্গা নিখোঁজ রয়েছে।পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশীর ভাগ বুছিডং
থানার মগনামা, কোয়াইনডং, জাদীপাড়া, লাওয়াডং গ্রামের বাসিন্দা রয়েছে।
অপরদিকে আনজুমান পাড়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে পালিয়ে আসা
রোহিঙ্গা বুছিডং থানার কোয়াইডং গ্রামের মৃত গনি মিয়ার পুত্র মোঃ ইসমাইল
(৬৫), মংডুরে মনিপাড়ার মোঃ আলম (৩৫)জানান, রাখাইনের সহিংসতার পর থেকে তাদের
গ্রাম্য বাজার বন্ধ রয়েছে। কোন কাজ কর্ম করতে পারছেনা। বাড়ীতে খাদ্য নেই।
পরিবারের ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে অনেকদিন ধরে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর
জীবন যাপন করছি। মগ সেনারা কোথাও দেখলে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। বাড়ীতে
একপ্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছি।প্রতি মুহুর্ত আতংক আর প্রাণের ভয়। তাই এপারে
আসছে আসতে বাধ্য হয়েছি।
তিনি আরো জানান, গত ৭ দিন যাবৎ পাহাড়ের ঢালা ও বিভিন্ন গ্রাম
অতিক্রম করে সীমান্ত পাড়ি দিতে হয়েছে। লাউয়াডং এলাকার বদর উদ্দিনের স্ত্রী
রহিমা খাতুন, শিক্ষক মোঃ আলমের স্ত্রী মংডুরে লামার পাড়ার মিজানা বেগম
জানান, এক বিভিষীকাময় ও অবরুদ্ধ পরিবেশ থেকে উদ্ধার হয়ে খোলা আকাশে
নিঃশ্বাস নিতে পারছি। অর্ধাহারে অনাহারে হাঁটতে হাঁটতে শরীর ক্লান্ত ও
ব্যথা হয়ে গেছে।
স্থানীয় মেম্বার সোলতান আহমেদ জানান, রাতভর প্রায় ২০ হাজার
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। বর্তমানে ওপারে হত্যা নির্যাতন বন্ধ হলেও
অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গাদের ভুল বার্তার মাধ্যমে তারা এপারে ঢুকছে। নুতন করে
অনুপ্রবেশকৃত রোহিঙ্গারা বর্তমানে বিজিবির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।এদিকে ৩৪
বিজিবির মেজর আশিকুর রহমান জানান,গত দুইদিনে ১৫ -২০হাজারের বেশী রোহিঙ্গা
হতে পারে। তবে তিনি নির্দিষ্ট সংখ্যা বলতে পারছেননা। আপাততে জড়ো হওয়া
রোহিঙ্গাদের মানবিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিপাত থেকে রক্ষা পেতে
বিজিবির পাশাপাশি ব্যক্তি -প্রতিষ্ঠানও কিছু ত্রিপল টানিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এপারে রোহিঙ্গারা ওপারে রোহিঙ্গাদের সাথে
মুঠোফোনে যোগাযোগ করে তাঁদের ডেকে আনছেন বলে ধারণা করছেন তিনি। উর্ধ্বতন
কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন
তিনি।অপরদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রোববার সন্ধ্যা থেকে কুয়ান্সিবং
সীমান্তে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষা করেছিলেন। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে
তারা এপারে ঢুকতে থাকে। আরো ঢুকার আশঙ্কা করেছেন তারা।
উখিয়ার পালংখালী ইউপির চেয়ারম্যান এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী
জানান, আগে চলে আসা রোহিঙ্গারা ওপারে নিজ এলাকায় থাকা রোহিঙ্গাদের ত্রাণের
সুযোগ -সুবিধার কথা জানিয়ে নিয়ে আসছে।এমনকি নতুন করে চলে আসা রোহিঙ্গাদের
একটি মহল নৌকা, বোট যোগে নিয়ে আসতে উদ্ধুদ্ধ করছে এমন আশংকাও করেন।

0 Comments