Advertisement

এরশাদের ভ্যালেন্টাইন ও চুরি যাওয়া এক দশক

ভালোবাসার কথা মনে পড়লে এরশাদের কথা মনে পড়ে। কত কিছু ভালোবাসতেন এরশাদ। আমরা ফুল ভালোবাসি, তাই গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে ফুলদানিতে রাখি। এরশাদ দেশকে ভালোবাসতেন। তাই দেশটাকে জনগণের কাছ থেকে কেড়ে অবৈধ ক্ষমতার ফুলদানিতে সাজিয়ে রেখেছিলেন। তিনি ফুলও
ভালোবাসতেন। শহীদের রক্তমাখা হাত ফুল দিয়েই আড়াল করতেন। কবিতা ভালোবাসতেন; তাই তাঁর বিরুদ্ধের কবিদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছেন। তিনি নারীকে ভালোবাসতেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও গর্বের সঙ্গে বলেছেন, ‘এখন আর প্রেম-ভালোবাসা নেই। সমাজ থেকে প্রেম-ভালোবাসা উঠে গেছে।’ (আমাদের সময়, ৯ ডিসেম্বর ২০১৪)
আমাদের আশির দশক এরশাদের প্রেমের দশক। তিনি বেছে বেছে কয়েকজনকে ভালোবেসে ছিলেন। এক প্রেমিকাকে দলের সংরক্ষিত কোটায় সাংসদ বানান, পরে ছুড়েও ফেলেন। আরেক নারী যুক্তরাজ্যে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন। তাঁর আরেক স্ত্রীকে তো একরকম নির্যাতিত ও অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হয়। এরশাদের প্রেমঘটিত কাহিনিগুলো তাঁর পতনের পরে দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত হয়। এরশাদের বর্তমান দাম্পত্যও ব্যক্তিগত বিষয়ের চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক বিষয়।
এরশাদ শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ভালোবাসতেন। মাত্র দুই বছর আগেও তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলো দেখলে আমার কষ্ট হয়। দেখে মনে হয়, এগুলো বিরান ভূমি হয়ে গেছে। এগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নেই। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় এলে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সূত্র: ঐ)। ক্ষমতা দখলের তৃতীয় বছরে শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানকে দিয়ে যে শিক্ষানীতি তৈরি করেন, দেশের শিক্ষার্থীরা তা মানতে রাজি ছিল না। ফুঁসে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্রছাত্রীরা। কলেজের শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে ছিল না।
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া বিশাল মিছিলে গুলি চলল। হাইকোর্টের সামনের রাস্তায় পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, আইয়ুব, ফারুক, কাঞ্চন প্রমুখ তরুণ-তরুণী। ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সরকার স্বীকার করে মাত্র একজনের কথা। পরদিন চট্টগ্রামে নিহত হন মোজাম্মেলসহ আরও কয়েকজন। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস। এরশাদের আমলের নয় বছরে এই ছাত্রহত্যা থামেনি।
এরশাদের জন্য যা প্রেমের দশক, তা বাংলাদেশের তারুণ্যের প্রমিথিউসীয় সাহসেরও দশক। গ্রিক মহানায়ক প্রমিথিউস মানুষের হাতে আগুন এনে দিতে অসীম কষ্ট সয়েছিলেন। আর আমাদের আশির দশকের তরুণেরা গণতন্ত্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে আনতে শ্রেষ্ঠতম দান, আত্মদান করেছিলেন। সেটাও কিন্তু ভালোবাসারই শক্তি। প্রেম ও যুদ্ধে নাকি সবকিছু জায়েজ। কিন্তু এরশাদের রাজনীতি ও প্রেমের সব অপকীর্তি নাজায়েজ করে দিয়েছিলেন সে সময়ের তরুণেরা। তাঁরা ভালোবাসতে জানতেন। তারুণ্যের ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ প্রকাশ ঘটে প্রেমে, দেশপ্রেমে আর বন্ধুতায়। মিছিলে হাত ধরা, পাশাপাশি হাঁটা, একসঙ্গে লড়াই করতে করতে প্রেম হয়, বন্ধুত্ব হয়। আবার সেই মিছিলেই কতজন হারায় প্রেমিক-প্রেমিকাকে, কতজন হারায় প্রিয় বন্ধুকে। এরশাদের পুলিশের গুলিতে নিহত প্রতিটি তরুণ হয়ে ওঠে জাতির সবার সন্তান। ভালোবাসার আর শোকের ঢেউ কোটি হৃদয়কে তখন একাকার করে ফেলেছিল। আন্দোলনের উত্তাল আবহে যে বন্ধুত্ব, যে কমরেডশিপ, যে বিপ্লবী দোস্তি—তার কোনো তুলনা হয় না। এমনই প্রেম, এমনই আবেগ, এমনই বন্ধুত্ব নিয়ে ছেলেমেয়েরা মুখোমুখি হয়েছিলেন এরশাদের স্বৈরাশাহির।
উল্টো দিকে এরশাদের প্রেম ছিল দাপটের আর প্রতারণার। জন স্টেইনবেকের ছোট্ট একটি উপন্যাস ‘অব মাইস অ্যান্ড মেন’, সেখানে এক বিশালদেহী যুবক লেনি যা-ই ভালোবাসে, তা-ই নষ্ট করে, হত্যা করে। পালোয়ানের মতো সেই চরিত্রটি ভালোবাসে নরম জিনিসের স্পর্শ। ভালোবাসা মানে সে বুঝেছিল জোরে চেপে ধরা। ফলে তুলতুলে খরগোশ কিংবা কুকুরছানা তার বিশাল থাবার ‘আদরে’ দম বন্ধ হয়ে মরে। এক নারী তার নরম চুলে হাত বোলাতে দিয়েছিল তাকে। কিন্তু লেনির আদরে তার ঘাড় মটকে মৃত্যু হয়। এরশাদ এভাবে যাঁকেই ভালোবাসার কথা বলেছেন, তাঁকেই ধ্বংস করেছেন। এরশাদ চুরি করেছেন বাংলাদেশের একটি দশক। এরশাদ যুগের তরুণেরা যতই সাহসী হোন না কেন, তাঁরা যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টায় স্বাভাবিক দেশ পাননি।
প্রেমিক প্রথমত বিদ্রোহী। যা কিছু প্রেমকে অস্বীকার করে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেই প্রেমে পড়া মানুষ। সত্যিকার প্রেম দখল করে না, আটকে রাখে না, ক্ষুদ্র করে দেয় না মন। আর সে জন্যই যৌবন যার, সে-ই সবার আগে যুদ্ধে গেছে। কারণ, প্রেমের মধ্যে দিয়েই একজন আরেকজনের দায় নিতে শেখে। আশির দশকের বাংলাদেশ এরশাদের হয়নি, হয়েছে বিদ্রোহী যৌবনের। সে সময়কার গণ-আন্দোলন মানে যৌবনের উৎসব। দেশের জেলায় জেলায় যে তরুণ-তরুণীরা জেগে উঠেছিলেন, তাঁদের প্রতিটি মুখ প্রেমময়, তাঁদের উঠে দাঁড়ানো মহাকাব্যিক।
রক্তাক্ত মাস আমাদের ফেব্রুয়ারি। ভাষা আন্দোলনের আত্মদানের ফেব্রুয়ারি। এরশাদের আমলে প্রতি ফেব্রুয়ারিতে ছাত্ররা রুখে দাঁড়াতেন। প্রায় প্রতি ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশ লড়েছে ও শহীদের লাশ কাঁধে করে বয়েছে। এটাও আরেক ফেব্রুয়ারি। আজ ১৪ ফেব্রুয়ারির স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস ঢেকে গেছে ভালোবাসা দিবসের ঝালরে ঝালরে। কিন্তু বিদ্রোহের ১৪ ফেব্রুয়ারির সঙ্গে তো ভালোবাসারই মিলে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেই মিলন হতে দিচ্ছে না পণ্য ও ভোগকেন্দ্রিক বাজারি দিবস। এ এমন এক যুগ, যখন ইতিহাস ও স্মৃতির বাছাই চলছে। যে ইতিহাস ও স্মৃতির পক্ষে ক্ষমতা ও ব্যবসা আছে, তারই বাজার রমরমা। সেই স্মৃতিই পুষে রাখা হয়, যা নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য নিরাপদ। বাকিদের পাঠানো হয় বিস্মৃতির হিমঘরে। ভালোবাসা দিবস তাই যত জাগ্রত, তত জাগ্রত নয় ১৪ ফেব্রুয়ারির শহীদদের চেতনা ও স্মৃতি। অথচ এ দুয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকার কথা নয়।
গতকাল ছিল পয়লা ফাল্গুন। ওদিকে চলছে বইমেলা। মাসটাই তারুণ্যের। আমাদের মতো দেশে তারুণ্য নিজেই এক গণতান্ত্রিক শক্তি। জনগণের বড় অংশই তারা। তাদের মতামতই জনমতের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের উৎসবগুলোই হয়ে ওঠে জাতীয় উৎসব। উৎসবের মধ্যে থাকে জীবনের উদ্‌যাপন, জীবনের প্রতি ভালোবাসার আহ্বান। উৎসব মানে সর্বজনের মুক্ত জমায়েত। উৎসব তাই চরিত্রগতভাবেই গণতান্ত্রিক। ১৪ ফেব্রুয়ারির শহীদেরা জীবনের সেই গণতান্ত্রিক উৎসবের জন্যই জীবন দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র যেমন-তেমন; এরশাদ আছেন উত্তম দশায়। আর এরশাদ আছেন সরকারের মহামান্য উপদেষ্টার পদে। এ-ও এক এরশাদীয় ভালোবাসা। বিষয়টি পারস্পরিক। অগণতান্ত্রিক ক্ষমতা যেমন এরশাদকে ভালোবাসে, এরশাদও তেমনি অগণতান্ত্রিকতার সেবা করে গেছেন। এক বিচারে এরশাদ আমাদের রাজনীতির সত্যিকার পিতৃপুরুষ। নির্বাচনহীন একচেটিয়া ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার যে রাস্তা তিনি দেখিয়ে গেছেন, সেটাই এখন বাংলাদেশের ক্ষমতাশ্রিত সব দলের স্বপ্নের মডেল। এরশাদ উন্নয়নের কথা বলে অবৈধভাবে যে কৌশলে ক্ষমতা ভোগ করেছেন, সেই ক্ষমতা এখন আইনসিদ্ধ পদ্ধতিতেই ভোগ করা যায়। যাঁর থাকার কথা ছিল জেলে, তিনি থাকছেন ক্ষমতার প্রশ্রয়ে। এরশাদ বদলাননি। তিনি অতীতে গণতন্ত্র হত্যা করেছিলেন, এখনো তাঁর ভূমিকা গণতন্ত্রের বিপক্ষে। তাই তারুণ্যেরও বিপক্ষে; ভালোবাসার বিপক্ষে, প্রেমের বিপক্ষে, নারীর বিপক্ষে। নব্বইয়ে বিজয়ের এই বেহাত হওয়া তারুণ্যের পরাজয়, ভালোবাসার পরাজয়।
বাংলাদেশের পরাজিত তারুণ্য মাথা নিচু করে কীভাবে ভালোবাসবে প্রেম, দেশ ও যৌবনকে?

Post a Comment

0 Comments