মায়া জোছনা ঘেরা এই পৃথিবীর আদি রস প্রেমময়। যার বন্ধনেই আবদ্ধ রয়েছে
বিধাতার সৃষ্টি। মায়াজালের কোলে তাই সৃষ্টি হয়েছে মানব-মানবী, সৃষ্টি হয়েছে
সমাজ-সংসার। শুরু হলো শ্বাশত প্রেমের গল্প। প্রেমের এই খেয়ায় যাত্রী
দু’জন। ঠিক এমনিভাবে প্রেম সাগরে ছ’জন যাত্রী নিয়ে ভেসে চলেছে তিনটি খেয়া।
শাশ্বত প্রেমের এই প্রেমকাব্য, প্রেমিকযুগলের প্রেম ভাবনার শুরু, প্রসার,
রোমাঞ্চকর মুহূর্ত এবং সফল পরিণতি নিয়ে স্ব স্ব স্থানে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন
বয়সের, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার তিন প্রেমিক যুগলের বাস্তব প্রেমের গল্পকে
উপজীব্য করে আমাদের ভালোবাসা দিবসের বিশেষ ‘ভালবাসার গল্প’।
প্রেম যমুনার এই খেয়া যারা পাড়ি দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৪০টিরও বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ একেঁছেন এমন এক প্রেমিক শিল্পী খালিদ হাসান ও দেশের নামকরা পোশাক ডিজাইনার যার ডিজাইন করা পোশাক পরেছেন স্পেনের রাণী সোফিয়ার সেই কৃতি বাঙালি আইভি হাসান জুটির প্রেমের গল্প।
ঠিক তেমনি জীবন সংসারে সার্থক, সফল ও স্বনামধন্য প্রেমিক যুগলের কথা- যারা ধর্মীয় বাধাকে অতিক্রম করে শুধু প্রেমের টানে ঘর বেঁধেছিলেন যুক্তরাষ্টের বোস্টনে। করপোরেট ব্যক্তিত্ব মহসিন আর তার গৃহলক্ষ্মী ফাবিয়ানা জুটি প্রেমের গল্প।
আরো রয়েছে সংগীত শিল্পী, নাট্যকার ও করপোরেট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তা শান্তনু বিশ্বাস ও আবৃত্তি শিল্পী, শিক্ষক শুভ্রা বিশ্বাসের প্রেমের গল্প। এই তিন সফল প্রেমিক জুটি রচনা করেছেন ভালবাসার এক মহাকাব্য।
তাদের এই ভালোবাসা নামক অভিযানে চলতে গিয়ে মোকাবেলা করতে হয়েছে নানা চাড়ই উৎরাই। মাড়াতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ। পদে পদে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শত বাধাও তাদের দমাতে পারেনি। শত বাধা পেরিয়ে তারা জয়ী হয়েছেন।
ভালোবাসার মহান যুদ্ধে জয়ী এই তিন জন হলেন- দেশের র্শীষস্থানীয় করপোরেট হাউজ পিএইচপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন ও মার্কিন নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ফাবিয়ানা জুটি। রয়েছে দেশের নামকরা চিত্রশিল্পী খালিদ হাসান ও হিন্দু ধর্মের রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার আইভি হাসান জুটি। সংগীত শিল্পী হিন্দু ধর্মের শান্তনু বিশ্বাস ও আবৃত্তি শিল্পী বৌদ্ধ ধর্মের শুভ্রা বিশ্বাস জুটি।
মহসিন-ফাবিয়ানা
শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ পিএইচপির ব্যবাস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন। সফল এই উদ্যোক্তা পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পাশ্চাত্যের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পাড়ি জমিয়েছিলেন দেড় দশক আগে। সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সহপাঠীর এক বান্ধবীর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ভিনদেশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ফাবিয়ানাকে প্রথম দর্শনেই মহসিনের মনে ধরে। কয়েক দিন যেতে না যেতেই দুজনের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক অন্য রকম হৃদ্যতা। সেই থেকে মহসিনের কাছে ফাবিয়ানাই হয়ে যায় দূর দেশে সবচেয়ে আপনজন।
লেখাপড়ার ফাঁকে মহসিন-ফাবিয়ানার প্রেমের বয়স অতিক্রম করে দু’বছরের দিন পঞ্জিকা। এক পর্যায়ে তাদের এই ভালোলাগা ও হৃদ্যতার বন্ধনকে চিরস্থায়ী করতে দু’জনেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফাবিয়ানা মার্কিন নাগরিক আর মহসিন বাংলাদেশি। তারপরও রয়েছে ধর্মের বাধা। মহসিন মোসলমান আর ফাবিয়ানা বৌদ্ধ।
এরপরও এই দুই প্রতিবন্ধকতা তাদের বন্ধনে চিড় ধরাতে পারেনি। ফাবিয়ানার পরিবারের সম্মতিতে মহসিনের সহপাঠীর সহযোগিতায় তারা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে বোস্টনেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরই মধ্যে তাদের দু’জনেরই লেখাপড়া শেষ হয় বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে। তারা দুজন বোস্টনের একটি শহরের একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘ ছয়মাস বসবাস করলেও মহসিন-ফাবিয়ানা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করেছেন। মহসিনের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নামাজ কিংবা ঈদ উদযাপনে যেমন ছিল ফাবিয়ানার সহযোগিতা ঠিক তেমনি বৌদ্ধ ধর্মীয় ফাবিয়ানারও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনেও মহসিনের ছিল সার্বিক সহযোগিতা।
তাদের বিয়ে অনুষ্ঠানে কনেপক্ষের লোকজন উপস্থিত থাকলেও এক বছরেও টের পায়নি বা জানানো হয়নি বাংলাদেশে মহসিনের রক্ষণশীল পরিবারেরর লোকজন। এরই মধ্যে মহসিন অনেকবার সাহস করে তার পরিবারকে বিয়ের খবরটি জানাতে চেয়েও সাহস করে বলতে পারেনি। মনে অনেকটা ভয় ও সংশয় নিয়ে একদিন পিএইচপির কর্ণধার বাবা আলহাজ্ব সুফী মিজানুর রহমানকে ফোন করে মহসিন বিয়ের খবরটা জানান। শুনামাত্র সানন্দে তা মেনে নেন সুফি মিজান এবং পুত্রবধূকে নিয়ে দেশে আসতে বলেন।
সেই থেকে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে বাস করছেন সফল এই প্রেমিক জুটি। দেশের করপোরেট হাউজের পরিচিত ও ব্যস্ত মুখ মহসিন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সময় দিলেও পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির মহসিন-ফাবিয়ানার দম্পতির গৃহকোণটি সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখছে গৃহিনী ফাবিয়ানা ও তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
খালিদ হাসান ও আইভি
শিল্পী খালিদ হাসান একাধারে একজন কবি, গীতিকার ও ডিজাইনার হিসেবে পরিচিত। ফ্যাশন কোরিওগ্রাফির পাশাপাশি তিনি বিজ্ঞাপনী ব্যবসায়ও জড়িত। তার চেয়ে পিছিয়ে নেই সহধর্মীনি ফ্যাশন ডিজাইনার আইভী হাসান। আইভি হাসান দেশের একজন নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঢাকায় এবং চট্টগ্রামে তার ডিজাইন করা পোশাকের একক প্রদর্শনী হয়েছে বহুবার। তার ডিজাইন করা পোশাক পরেছেন স্পেনের রাণী সোফিয়া ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। আর শিল্পী খালিদ হাসান দেশে নিজেকে একজন প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তেত্রিশ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি দুই হাজারেরও বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। এর মধ্যে নন্দিত উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের ৪০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করা ছাড়াও তিনি কবি শামসুর রাহমান, কবি সিকদার আমিনুল হকসহ বাংলাদেশের প্রথম সারির লেখকদের অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। বিজিএমইএর বাটেক্সপোর প্রথম তিনটি শো’র ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরও ছিলেন খালিদ হাসান।
বিজ্ঞানের ছাত্র খালিদ হাসানের ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল চিত্রকলার প্রতি। আর তাই পেশা এবং নেশা হিসেবে বেছে নেন চিত্রকলাকেই। পাশাপাশি তখন থেকেই নাট্যাঙ্গনে তার ছিল সরব পদচারণা। গ্রুপ থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় বয়সে অনেক ছোট এক সহকর্মী আইভী ভট্টাচার্যের সঙ্গে। গ্রুপ থিয়েটার, চিত্রকলা এসব নিয়ে চারুকলার ছাত্রী আইভী তার সিনিয়র সহকর্মী খালিদের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ঘনিষ্টভাবে বিভিন্ন কাজে অংশ নিতে থাকেন। এরই মধ্যে আইভীকে মনে ধরে খালিদের। কাজের সঙ্গে সমানতালে চলতে থাকে তাদের প্রেম!
এই প্রেমের সম্পর্ককে বাস্তবতার প্রয়োজনে তারা একসময় পরিণয়ে রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকটা আইভীর পরিবারের তীব্র বিরোধিতার মুখে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে আইভী ধর্মান্তরিত হয়ে মোসলমান হয়ে খালিদের পরিবারের সঙ্গে ঘরসংসার শুরু করেন। ভালোবাসার নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে খালিদ-আইভী আজ খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসার সুখপাখী। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া একমাত্র মেয়েকে নিয়ে নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় তারা বর্তমানে খুব ভালোই আছেন।
শান্তনু ও শুভ্রা
শান্তনু বিশ্বাস ও শুভ্রা বিশ্বাস চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত নাম। একাধারে কবি, গীতিকার, নাট্য ও সংগীত শিল্পী শান্তনু বিশ্বাস এই জগতের সফল হওয়ার পাশাপাশি করপোরেট জগতেও রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। তিনি বর্তমানে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইস্পাহানী গ্রুপের ‘ইস্পাহানী টি’র জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। তারই সহধর্মীনি শুভ্রা বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে গ্রুপ থিয়োটার ও আবৃত্তি চর্চার পাশাপাশি চট্টগ্রামের একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শান্তনু বিশ্বাসের লেখা নাটক ‘ইনফরমার ও ভবঘুরে’ এই নাটক দুটি দুই বাংলায় বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা গান করেছেন ইন্দ্রানী সেন, সুবীর নন্দী, ফাতেমা তুজ জোহরাসহ অসংখ্য শিল্পী। ইতিমধ্যে তার ‘চিরকুট ও পোস্টম্যান’ নামের দুটি একক অ্যালবাম বের হয়েছে।
ভালোবাসার টানে জাত বর্ণ ধর্মকে উপক্ষো করে পালিয়ে বিয়ে করা শান্তনু বিশ্বাস ও শুভ্রা বিশ্বাস জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে খুবই উপভোগ করেন নিজেদের ভালোবাসায়। গ্রুপ থিয়োটারে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সনাতন ধর্মাম্বলী শান্তনুর সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাম্বলী শুভ্রার পরিচয় ঘটে। দীর্ঘ দিন একসঙ্গে একই দলে কাজ করা অতপর দুজনের দুজনকে ভালো লাগা এবং শেষ পর্যন্ত পালিয়ে বিয়ে করা। তাদের ভালোবাসার ভিত এতটাই শক্ত ছিল যে, দুই ধর্মের কোনো দোহাই তাদের সেই পবিত্র বন্ধনে চিড় ধরাতে পারেনি। ইস্পাহানি টি এ কর্মরত শান্তনু যখন প্রমোশন পেয়ে একটি ফ্ল্যাট ও গাড়ি পান কোম্পানির পক্ষ থেকে তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করবেন।
কিন্তু তাদের এই দীর্ঘ দিনের সুপ্ত বাসনায় বাধ সাধলো উভয় পরিবার। তাই তারা কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় গোপনে বিয়ের আইনগত বিষয়গুলো সম্পাদন করেন। এর দুই মাস পরই দুই পরিবারকেই জানান দিয়ে শান্তনু কক্সবাজারে তার নিজের গাড়িতে করে শুভ্রাকে নিয়ে কক্সবাজার পালিয়ে যান। কক্সবাজারে এক সরকারি রেস্ট হাউজে তারা বাসর সাজান। পরে নিজেদের ফ্ল্যাটে ওঠেন। বর্তমানে এইচএসবিসি ব্যাংকে কর্মরত বড় মেয়ে ও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছোট মেয়ে দুটোকে নিয়েই তাদের সুখের সংসার সাজিয়েছেন নগরীর ফয়’স লেকে।
প্রেম যমুনার এই খেয়া যারা পাড়ি দিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, বরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ৪০টিরও বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ একেঁছেন এমন এক প্রেমিক শিল্পী খালিদ হাসান ও দেশের নামকরা পোশাক ডিজাইনার যার ডিজাইন করা পোশাক পরেছেন স্পেনের রাণী সোফিয়ার সেই কৃতি বাঙালি আইভি হাসান জুটির প্রেমের গল্প।
ঠিক তেমনি জীবন সংসারে সার্থক, সফল ও স্বনামধন্য প্রেমিক যুগলের কথা- যারা ধর্মীয় বাধাকে অতিক্রম করে শুধু প্রেমের টানে ঘর বেঁধেছিলেন যুক্তরাষ্টের বোস্টনে। করপোরেট ব্যক্তিত্ব মহসিন আর তার গৃহলক্ষ্মী ফাবিয়ানা জুটি প্রেমের গল্প।
আরো রয়েছে সংগীত শিল্পী, নাট্যকার ও করপোরেট হাউজের শীর্ষ কর্মকর্তা শান্তনু বিশ্বাস ও আবৃত্তি শিল্পী, শিক্ষক শুভ্রা বিশ্বাসের প্রেমের গল্প। এই তিন সফল প্রেমিক জুটি রচনা করেছেন ভালবাসার এক মহাকাব্য।
তাদের এই ভালোবাসা নামক অভিযানে চলতে গিয়ে মোকাবেলা করতে হয়েছে নানা চাড়ই উৎরাই। মাড়াতে হয়েছে অনেক বন্ধুর পথ। পদে পদে পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় শত বাধাও তাদের দমাতে পারেনি। শত বাধা পেরিয়ে তারা জয়ী হয়েছেন।
ভালোবাসার মহান যুদ্ধে জয়ী এই তিন জন হলেন- দেশের র্শীষস্থানীয় করপোরেট হাউজ পিএইচপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন ও মার্কিন নাগরিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ফাবিয়ানা জুটি। রয়েছে দেশের নামকরা চিত্রশিল্পী খালিদ হাসান ও হিন্দু ধর্মের রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার আইভি হাসান জুটি। সংগীত শিল্পী হিন্দু ধর্মের শান্তনু বিশ্বাস ও আবৃত্তি শিল্পী বৌদ্ধ ধর্মের শুভ্রা বিশ্বাস জুটি।
মহসিন-ফাবিয়ানা
শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপ পিএইচপির ব্যবাস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহসিন। সফল এই উদ্যোক্তা পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে পাশ্চাত্যের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে পাড়ি জমিয়েছিলেন দেড় দশক আগে। সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সহপাঠীর এক বান্ধবীর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ভিনদেশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ফাবিয়ানাকে প্রথম দর্শনেই মহসিনের মনে ধরে। কয়েক দিন যেতে না যেতেই দুজনের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক অন্য রকম হৃদ্যতা। সেই থেকে মহসিনের কাছে ফাবিয়ানাই হয়ে যায় দূর দেশে সবচেয়ে আপনজন।
লেখাপড়ার ফাঁকে মহসিন-ফাবিয়ানার প্রেমের বয়স অতিক্রম করে দু’বছরের দিন পঞ্জিকা। এক পর্যায়ে তাদের এই ভালোলাগা ও হৃদ্যতার বন্ধনকে চিরস্থায়ী করতে দু’জনেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফাবিয়ানা মার্কিন নাগরিক আর মহসিন বাংলাদেশি। তারপরও রয়েছে ধর্মের বাধা। মহসিন মোসলমান আর ফাবিয়ানা বৌদ্ধ।
এরপরও এই দুই প্রতিবন্ধকতা তাদের বন্ধনে চিড় ধরাতে পারেনি। ফাবিয়ানার পরিবারের সম্মতিতে মহসিনের সহপাঠীর সহযোগিতায় তারা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে বোস্টনেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এরই মধ্যে তাদের দু’জনেরই লেখাপড়া শেষ হয় বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে। তারা দুজন বোস্টনের একটি শহরের একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘ ছয়মাস বসবাস করলেও মহসিন-ফাবিয়ানা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি পালন করেছেন। মহসিনের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নামাজ কিংবা ঈদ উদযাপনে যেমন ছিল ফাবিয়ানার সহযোগিতা ঠিক তেমনি বৌদ্ধ ধর্মীয় ফাবিয়ানারও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনেও মহসিনের ছিল সার্বিক সহযোগিতা।
তাদের বিয়ে অনুষ্ঠানে কনেপক্ষের লোকজন উপস্থিত থাকলেও এক বছরেও টের পায়নি বা জানানো হয়নি বাংলাদেশে মহসিনের রক্ষণশীল পরিবারেরর লোকজন। এরই মধ্যে মহসিন অনেকবার সাহস করে তার পরিবারকে বিয়ের খবরটি জানাতে চেয়েও সাহস করে বলতে পারেনি। মনে অনেকটা ভয় ও সংশয় নিয়ে একদিন পিএইচপির কর্ণধার বাবা আলহাজ্ব সুফী মিজানুর রহমানকে ফোন করে মহসিন বিয়ের খবরটা জানান। শুনামাত্র সানন্দে তা মেনে নেন সুফি মিজান এবং পুত্রবধূকে নিয়ে দেশে আসতে বলেন।
সেই থেকে বাংলাদেশেই স্থায়ীভাবে বাস করছেন সফল এই প্রেমিক জুটি। দেশের করপোরেট হাউজের পরিচিত ও ব্যস্ত মুখ মহসিন নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সময় দিলেও পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের নাছিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির মহসিন-ফাবিয়ানার দম্পতির গৃহকোণটি সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখছে গৃহিনী ফাবিয়ানা ও তার এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
খালিদ হাসান ও আইভি
শিল্পী খালিদ হাসান একাধারে একজন কবি, গীতিকার ও ডিজাইনার হিসেবে পরিচিত। ফ্যাশন কোরিওগ্রাফির পাশাপাশি তিনি বিজ্ঞাপনী ব্যবসায়ও জড়িত। তার চেয়ে পিছিয়ে নেই সহধর্মীনি ফ্যাশন ডিজাইনার আইভী হাসান। আইভি হাসান দেশের একজন নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঢাকায় এবং চট্টগ্রামে তার ডিজাইন করা পোশাকের একক প্রদর্শনী হয়েছে বহুবার। তার ডিজাইন করা পোশাক পরেছেন স্পেনের রাণী সোফিয়া ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। আর শিল্পী খালিদ হাসান দেশে নিজেকে একজন প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তেত্রিশ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি দুই হাজারেরও বেশি বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। এর মধ্যে নন্দিত উপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদের ৪০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করা ছাড়াও তিনি কবি শামসুর রাহমান, কবি সিকদার আমিনুল হকসহ বাংলাদেশের প্রথম সারির লেখকদের অসংখ্য বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। বিজিএমইএর বাটেক্সপোর প্রথম তিনটি শো’র ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরও ছিলেন খালিদ হাসান।
বিজ্ঞানের ছাত্র খালিদ হাসানের ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল চিত্রকলার প্রতি। আর তাই পেশা এবং নেশা হিসেবে বেছে নেন চিত্রকলাকেই। পাশাপাশি তখন থেকেই নাট্যাঙ্গনে তার ছিল সরব পদচারণা। গ্রুপ থিয়েটারে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় বয়সে অনেক ছোট এক সহকর্মী আইভী ভট্টাচার্যের সঙ্গে। গ্রুপ থিয়েটার, চিত্রকলা এসব নিয়ে চারুকলার ছাত্রী আইভী তার সিনিয়র সহকর্মী খালিদের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ঘনিষ্টভাবে বিভিন্ন কাজে অংশ নিতে থাকেন। এরই মধ্যে আইভীকে মনে ধরে খালিদের। কাজের সঙ্গে সমানতালে চলতে থাকে তাদের প্রেম!
এই প্রেমের সম্পর্ককে বাস্তবতার প্রয়োজনে তারা একসময় পরিণয়ে রূপ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকটা আইভীর পরিবারের তীব্র বিরোধিতার মুখে তারা পালিয়ে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে আইভী ধর্মান্তরিত হয়ে মোসলমান হয়ে খালিদের পরিবারের সঙ্গে ঘরসংসার শুরু করেন। ভালোবাসার নানা চরাই উৎরাই পেরিয়ে খালিদ-আইভী আজ খুঁজে পেয়েছেন ভালোবাসার সুখপাখী। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়া একমাত্র মেয়েকে নিয়ে নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় তারা বর্তমানে খুব ভালোই আছেন।
শান্তনু ও শুভ্রা
শান্তনু বিশ্বাস ও শুভ্রা বিশ্বাস চট্টগ্রামের সংস্কৃতি অঙ্গনের পরিচিত নাম। একাধারে কবি, গীতিকার, নাট্য ও সংগীত শিল্পী শান্তনু বিশ্বাস এই জগতের সফল হওয়ার পাশাপাশি করপোরেট জগতেও রেখেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। তিনি বর্তমানে দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইস্পাহানী গ্রুপের ‘ইস্পাহানী টি’র জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। তারই সহধর্মীনি শুভ্রা বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে গ্রুপ থিয়োটার ও আবৃত্তি চর্চার পাশাপাশি চট্টগ্রামের একটি নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শান্তনু বিশ্বাসের লেখা নাটক ‘ইনফরমার ও ভবঘুরে’ এই নাটক দুটি দুই বাংলায় বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা গান করেছেন ইন্দ্রানী সেন, সুবীর নন্দী, ফাতেমা তুজ জোহরাসহ অসংখ্য শিল্পী। ইতিমধ্যে তার ‘চিরকুট ও পোস্টম্যান’ নামের দুটি একক অ্যালবাম বের হয়েছে।
ভালোবাসার টানে জাত বর্ণ ধর্মকে উপক্ষো করে পালিয়ে বিয়ে করা শান্তনু বিশ্বাস ও শুভ্রা বিশ্বাস জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে খুবই উপভোগ করেন নিজেদের ভালোবাসায়। গ্রুপ থিয়োটারে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সনাতন ধর্মাম্বলী শান্তনুর সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাম্বলী শুভ্রার পরিচয় ঘটে। দীর্ঘ দিন একসঙ্গে একই দলে কাজ করা অতপর দুজনের দুজনকে ভালো লাগা এবং শেষ পর্যন্ত পালিয়ে বিয়ে করা। তাদের ভালোবাসার ভিত এতটাই শক্ত ছিল যে, দুই ধর্মের কোনো দোহাই তাদের সেই পবিত্র বন্ধনে চিড় ধরাতে পারেনি। ইস্পাহানি টি এ কর্মরত শান্তনু যখন প্রমোশন পেয়ে একটি ফ্ল্যাট ও গাড়ি পান কোম্পানির পক্ষ থেকে তখনই তারা সিদ্ধান্ত নেন বিয়ে করবেন।
কিন্তু তাদের এই দীর্ঘ দিনের সুপ্ত বাসনায় বাধ সাধলো উভয় পরিবার। তাই তারা কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় গোপনে বিয়ের আইনগত বিষয়গুলো সম্পাদন করেন। এর দুই মাস পরই দুই পরিবারকেই জানান দিয়ে শান্তনু কক্সবাজারে তার নিজের গাড়িতে করে শুভ্রাকে নিয়ে কক্সবাজার পালিয়ে যান। কক্সবাজারে এক সরকারি রেস্ট হাউজে তারা বাসর সাজান। পরে নিজেদের ফ্ল্যাটে ওঠেন। বর্তমানে এইচএসবিসি ব্যাংকে কর্মরত বড় মেয়ে ও নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছোট মেয়ে দুটোকে নিয়েই তাদের সুখের সংসার সাজিয়েছেন নগরীর ফয়’স লেকে।

