: নানা মুনির নানা মত-১৮২ :
-ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সহিদুজ্জামান :
গত সপ্তাহে গণতন্ত্র নিয়ে আলোকপাত করেছিলাম। তখন বাংলাদেশে সামরিক ও স্বৈরাচারের শাসনের কথা উল্লেখ করতে পারিনি। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল আওয়ামী লীগের উপর পূর্ণ আস্থা রেখে শাসন ক্ষমতা অর্পণ করে। মানুষের আশা আকাংখা আর প্রাপ্তির হিসাব মেলানোর আগেই দুঃশাসন, স্বজনপ্রীতি দূর্নীতি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে গ্রাস করেছিল। পরিণতিতে দূর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।
সেদিনও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের উপর আস্থা রাখতে না পেরে একদলীয় বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্রকে বিকশিত হতে সাহায্য করেনি বরং সমালোচক বা প্রতিবাদকারীদের উপর লাল ঘোড়া দাবরিয়ে গণতন্ত্র নিথর করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাকান্ডে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন। সিপাহী জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। এরপর রাষ্ট্রপতি দেশকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে অর্থাৎ আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। একদলীয় বাকশালের জিঞ্জির থেকে মুক্ত করে সবদলের অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য ছিল পরিস্কার। তিনি সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষকে জোট বেঁধে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বি.এন.পি.অর্থাৎ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করে জনগণকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। দুর্ভাগ্য এদেশের মানুষের আরেক নির্মম হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমান নিহত হন। লক্ষ লক্ষ মানুষের জানাযায় তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণ যোগ্যতাকে নিশ্চিত করে। এরপর সামরিক শাসক এইচ.এম.এরশাদ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। তিনি প্রায় ৯ বছর স্বৈরশাসক হয়ে ক্ষমতায় চেপে বসেছিলেন, যদিও জাতীয় পার্টি দল প্রতিষ্ঠা করেন কিন্তু গণতান্ত্রিক রীতি মেনে নেননি। ফলে আমজনতার আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ এর শেষ সময় ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন। এ জায়গায় একটি বিষয় উল্লেখ করতে হয় ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি খুব বেশী রক্তক্ষয়ী ছিলনা। বিএনপির ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি মধুর ছিল না, আওয়ামী লীগের সহিংস ও দেশকে জিম্মি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থ সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করতে সফল হয় এবং ২১ বছর পর ক্ষমতার মসনদে আরোহন করে। ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে মোটামোটি শান্তিপূর্ণ ভাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা কখনো স্থুল কারচূপি বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বিষয়টি বেশ সহজ নিজের বেলায় ঠিক অন্যের বেলায় বেঠিক। ১৯৯৬ পর আবারও ২০০৬ সালে ৪ দলীয় জোটের ক্ষমতার শেষ ভাগে লগি বৈঠা আন্দোলনে দেশকে নৈরাজ্য, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার কারণে ১/১১ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে ৩ মাসের বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করে প্রায় ২ বছর ২০০৮ ডিসেম্বর মাসে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেয়। কথিত আছে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা করার জন্যে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার মূল ব্যক্তিরা নিরাপদে দেশের বাইরে গিয়ে বসবাস করতে পারেন। এককথায় বলতে গেলে ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে। বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে হাইকোর্টের বিতর্কিত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে নিজেদের ক্ষমতায়ন পাকাপোক্ত করার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয়ে ঘোষণা দেন ২৭শে অক্টোবর থেকে ২৮শে জানুয়ারীর মধ্যে নির্বাচন হবে। মন্ত্রী পরিষদ বহাল থাকবে, রুটিন কাজ করবে, সংসদ সদস্য থাকবেন কিন্তু সংসদ বসবে না। জাতি সংঘের মহাসচিব যেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিঘœ সেখানে সংলাপের সমস্ত রাস্তা বন্ধ করে আবারও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করেছে মাত্র। বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট কোন অবস্থায় এই নির্বাচনে যাবে না। সম্প্রতিকালে সমস্ত জরিপ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে। ৫টি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও রায় সরকারের বিপক্ষে গিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গণতন্ত্রের মানসকন্যা খ্যাত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার ফর্মূলা বেছে নিয়েছেন। এখানে স্মরন করা যেতে পারে তার পিতা জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে থাকা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশকে স্তব্দ করে দিয়ে একদলীয় শাসন চালু করে সুবিধা করতে পারেননি। ৪০ বছর পর জনগণের উপর, গণতন্ত্রের উপর শ্রদ্ধাশীল না হলে আর যাই হইক ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে মনে করাটা মনে হয় সঠিক নয়। অন্ত:ত ইতিহাস তাই বলে না।
ইঞ্জিনিয়ার মোঃ সহিদুজ্জামান
সাবেক সংসদ সদস্য
সদর-রামু
ফোন নং-০১৮১৯-২৫১৮০০
সাবেক সংসদ সদস্য
সদর-রামু
ফোন নং-০১৮১৯-২৫১৮০০
E-mail: shahidmpcoxs@yahoo.com

