Advertisement

‘না জানি আরও কতদিন চলবে এই পাওয়া-হারানোর খেলা!’

  1. - এম. শাহজাহান চৌধুরী শাহীন :
  2. আমি সব পেয়ে সব হারাই,সব হারিয়ে আবার সব ফিরে পাই কিন্তু, কিভাবে যেন আবারও আমি সব হারিয়ে ফেলি । না জানি আরও কতদিন চলবে এই পাওয়া-হারানোর খেলা । এটা কোন কবিতার শ্লোক নয়। নয় কোন গানের কলি। কথা গুলো বলে ছিলেন বির্দশন মুক্তি ভাবনা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নিশীত বড়–য়াসহ তার মতে আরও অনেকেই ভাষ্য এটা। রামু রম্যভুমির সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সব চেয়েবেশী হারিয়ে ছিল সম্প্রীতির বন্ধন। আস্তে আস্তে বিহার, মন্দির, বসতঘর সবই নব ভাবে গড়ে উঠেছে। একই ভাবে ফিরে আসতে শুরু করেছে সম্প্রীতির বন্ধনও। তবে সম্পূর্ণ সম্প্রীতি ফিরতে আরো সময়ের প্রয়োজন।
গত মঙ্গলবার ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা আনুষ্টানিক ভাবে নবনির্মিত ১২টি বৌদ্ধ বিহার উদ্বোধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর থেকে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন শুরু করেছে পূজা আর বিশ্বের শান্তি কামনায় প্রার্থনা। চলছে জগতের সকল প্রাণীকে সুখি করার বিশেষ প্রার্থনা। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুছে দিয়েছে সেই কালো রাত্রির ধবংসযজ্ঞের সকল অশুভ চিহ্ন। এর পরও তাদের না পাওয়া আর হারানোর বেদনা।
বিহার গুলো উদ্বোধনের পরথেকেই খুলে দেয়া হয়েছে পূজার্থীদের জন্য। মঙ্গলবার বিকাল থেকে শুরু হয়েছে প্রার্থনার। সন্ধ্যা ৭টায় বিহার গুলোতে নামেবৌদ্ধ ধর্মাম্বলম্বী নারী পুরুষের ঢল। মঙ্গল প্রদীপ হাতে নিয়ে বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা। অনেক পূজার্থীর চোখে মুখে ছিল না পাওয়ার বেদনার চাপ। সেই কাল মঙ্গল বার থেকেই আবারও শুরু হয়েছে নব নির্মিত বিহারে পুরনো সব পূজা।
এর পরেও সংশয় আর শংকায় তারা। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতে,সেই ৩০ সেপ্টেম্বর কালো রাতে ধবংস করে দেয়া বিহার মন্দির পেয়েছি। কিন্তু ভেঙ্গে যাওয়া মন আস্তে আস্তে জোড়া লাগছে। প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুছে দিয়েছে সেই কালো রাত্রির ধবংসযজ্ঞের সকল অশুভ চিহ্ন। এর পরেও তারা বিহার গুলোতে স্থায়ী নিরাপত্তা আর উপযুক্ত পরিচর্যা ও রক্ষনাবেখক্ষনের উদ্যোগ গ্রহণ করার দাবী তুলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।
পর্যটন নগরীতে বেড়াতে আসলে অনেকেই রামু ঘুরে আসতে ভুল করতেন না। কারণ রামুতেই ছিল সবচেয়ে বেশি বৌদ্ধবিহার, যার অনেকই দুই থেকে তিন শ’ বছরের পুরনো। জাপান, থাইল্যান্ড, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটক এমনকি রাষ্ট্রীয় উচ্চপর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরাও রামু পরিদর্শন করতেন। সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তিটিও এই রামুতেই ছিলো। এই রামু উপজেলার রয়েছে দীর্ঘ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধরা শত বছর ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছিল সেখানে।
২০১২ সালের ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বিভীষিকাময় সেই রাতটির কথা স্মরণ করলে এখনও শিউরে ওঠে হাজার বছরের বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক রামু বৌদ্ধ সম্প্রদায়। এক রাতেই নিশ্চিহ্ন করে দেয় অসংখ্য শতবর্ষীয় বৌদ্ধ নিদর্শন, যেগুলো সযতেœ সংরক্ষিত রাখা ছিল রামু চৌমুহনির সীমা বিহার,উত্তর মিঠা ছড়ির বিমুক্তি বির্দশন ভাবনা কেন্দ্র, শ্রীকুল গ্রামের মৈত্রি বিহার, লাল চিং, সাদা চিং ও অর্পনা চরন চিং,চেরাংঘাট উসাই সেন বৌদ্ধ বিহার, জাদিপাড়া আর্যবংশবৌদ্ধ বিহার, উখিয়ার ঘোনা জেতবন বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার, চাকমারকুল অজন্তাবৌদ্ধ বিহার সহ ১২টি বৌদ্ধ বিহারে।সে সাথে বৌদ্ধপল্লীর অন্তত ৩০টি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এ ছাড়াও লুটপাটের শিকার হয় আরও ৫টি বৌদ্ধমন্দির ও বৌদ্ধদের শতাধিক বাড়িঘর। সেই কালো রাতে সু-পরিকল্পিতভাবে একের পর এক বিহারে আগুন দিয়ে ধবংসস্তুপে পরিণত করা হয়েছিল অনেক মূল্যবান নিদর্শন। সরকারের আন্তরিকতায় বিহারগুলো নান্দনিক স্থাপত্যে নতুন করে তৈরি হলেও ফিরে পাওয়া যাবে না সেই সব নিদর্শন।
বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনের মতে, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছিলো। কিন্তু সম্প্রীতির এই রম্যভুমিতে এমন সাম্প্রদায়িক ধ্বংসযজ্ঞ এর আগে কখনও হয়নি। উত্তম কুমার বডয়া নামের একজন তরুণের ফেসবুকে যে আপত্তিকর ছবিগুলো ট্যাগ করা হয়েছে সেজন্য উত্তম দায়ী কিনা সে বিষয়ে এখনো কেউ নিশ্চিত নন। এ ছাড়া দাঙ্গা লাগানোর উদ্দেশ্যে এটা পরিকল্পিত কোনো ফাঁদও হতে পারে। তাই কোনো বিষয়ে সুষ্পষ্ট তথ্য না জেনে রাতের অন্ধকারে যেভাবে বৌদ্ধদের পবিত্র প্রার্থনার স্থান পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেদিন।
শুধু রামুই নয়, বাংলাদেশের ইতিহাসে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর এমন হামলার ঘটনাও নজিরবিহীন। ঘটনা শুধু রামুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায়ও ধ্বংস করা হয় ৭টি বৌদ্ধবিহার। ধর্মান্ধলোকজনের হামলায় ধ্বংস হয়েছে শত শত বৌদ্ধ মূর্তি, বৌদ্ধ ধাতু, তালপাতার পুঁথি এবং আরও অনেক মূল্যবান সম্পদ ও নির্দশন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রামুতে ঘৃণার আগুন জ্বালালো কারা ?
কিন্তু মঙ্গলবার বেলা ১২ টায় প্রধানমন্ত্রীশেখ হাসিনা আনুষ্টানিক ভাবে কক্সবাজারের রামুর ১২টি নব নির্মিত বৌদ্ধ বিহার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাম্বলাম্বিদের পূজা ও প্রার্থনা। রামুর সেই ধবংসস্তুপের উপর গড়ে তুলা দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার গুলো এখন পর্যটকদের আর্কষণে পরিণত হয়েছে। ১২টি বৌদ্ধ বিহার নির্মাণ করতেসেনা বাহিনীর সময় লেগেছে ১১ মাস। আর সরকারী ভাবে ব্যয় করা হয়েছে ১২ লাখ এবং সেনা বাহিনী ব্যয় করেছে আরো ৮কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ২০কোটি টাকা। এই টাকা নির্মিত উপাসনালয় গুলো পাল্টে দিয়েছে রম্য ভুমির চেহারা ।
রামু রম্যভুমির সকল সম্প্রদায়ের মানুষ সব চেয়েবেশী হারিয়ে ছিল সম্প্রীতির বন্ধন। আস্তে আস্তে বিহার, মন্দির, বসতঘর সবই নব ভাবে গড়ে উঠেছে। একই ভাবে ফিরে আসতে শুরু করেছে সম্প্রীতির বন্দনও। তবে সম্পূর্ণ সম্প্রীতি ফিরতে আরো সময়ের প্রয়োজন। না জানি আরও কতদিন চলবে এই পাওয়া। রামু সকল ধর্মের লোকজনের কামনা আরযেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে ভাঙ্গা, গড়া আর হারানোর খেলা!।