দীপক চৌধুরী ও আমিনুল হক ভূইয়া : ঘরের দরজা থেকেই শুরু হয় ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ। সেহরির পর থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। সকালে দেখা দেয় শ্রাবণ বর্ষণ। বৃষ্টিভেজা জামাকাপড় শরীরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। চোখেমুখে উদ্বিগ্নের ছাপ স্পষ্ট। তারপরও থেমে নেই ঈদযাত্রা। ঝুঁকি নিয়েও আনন্দের ঈদযাত্রা। ঘরে ফেরার আনন্দ
অন্যরকম। মা-কা আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে মিলেমিশে খুশি ভাগ করার চেয়ে বড় কিছু আছে ?
বাস, রেল ও লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের উপচে ভিড়। গতকাল সরেজমিন ঘুরে এ দৃশ্য দেখা গেছে সবখানে। সব স্টেশনে ছিল যাত্রীদের ভিড়। মালপত্র সামলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যানবাহনের ভেতরে ঠাঁই না পেয়ে, ঝুঁকি নিয়েই বাস-ট্রেন বা লঞ্চের ছাদে চড়ে বসেন যাত্রীদের অনেকে। সকালের প্রবল বর্ষণের পর দিনভর থেমে থেমে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ছাদে ঠাঁই পেয়ে অনেকে স্বস্তিবোধ করেন। প্রতিকূলতাকে মাড়িয়ে পথ চলার দুর্ভোগ-ক্লান্তি ধুয়ে দেয় আনন্দ-বৃষ্টি। পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে শিকড়ের টানে ঝুঁকি নিয়েই বাস-ট্রেন ও লঞ্চের ছাদে যাতায়াত করছে বাধাহীনভাবে।
রাজধানীর গাবতলি, মহাখালি ও সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল ছাড়াও একই চিত্র দেখা গেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও।
তবে, ফি বারের মতো এবার মহাসড়কে গতকাল পর্যন্ত যানজট ছিল তীব্র। তারপরও চলাচল করছে দেশের বিভিন্ন রুটের যানবাহন। ঈদকে সামনে রেখে বেশ কিছুদিন আগে থেকে পরিবহণ কোম্পানি ও রোড সংশ্লিষ্ট নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে প্রায় যানজটবিহীন দূরপাল্লার মহাসড়কে।
গতকাল সেহরির পর মাঝারি বৃষ্টিপাত শুরু হলেও, ভোর ৬টা থেকে দেখা দেয় বর্ষণ। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকায় ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। বৃষ্টি ঝরবে ঈদের দিনেও। কিন্তু বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সেহরির পর থেকে ঘরমুখো ছুটতে থাকে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে।
ঈদ সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বেড়েছে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে। তবে রেলস্টেশনে ভিড় এখনও কিছুটা কম। শবে-কদরের ছুটি থাকায় অঘোষিত ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যায় মূলত গত মঙ্গলবার থেকেই। ফলে বৃষ্টি ও খারাপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে সকাল থেকেই মানুষের ভিড়ে সয়লাব হয়ে ওঠে গাবতলী, শ্যামলী, কল্যাণপুর, মালিবাগসহ বিভিন্ন স্থানের বাস কাউন্টারগুলো। ঈদের পর জামায়াতের ৪৮ ঘণ্টার হরতাল থাকায় অনেকেই আগাম কিনে রাখা টিকিট ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে গত বছরের তুলনায় ঈদের দুই-তিন দিন বাকি থাকলেও ভিড় এখনও পুরোপুরি জমেনি বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে গাবতলীর শ্যামলী বাস কাউন্টারের জাকির হোসেন জানান, গতকাল মঙ্গলবার ভোর থেকেই এখান থেকে চলাচলকারী প্রতিটি রুটের বাস যাত্রী বোঝাই হয়ে গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে। একটি বাস ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ১০ মিনিটেই যাত্রীপূর্ণ হয়ে যায়। মহাসড়ক ও ফেরিঘাটে এবার যানজট না থাকায় বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে আজ বুধবার থেকে মহাসড়কের অবস্থা কেমন হবে তা আগাম বলা যাবে না।
ঈদ ট্রেন : ঈদে ঘরমুখো মানুষকে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে রেলওয়ে বিভাগ। সকাল থেকেই প্রতিটি ট্রেনই যাত্রী বোঝাই করে গন্তব্যে ছেড়ে যায় কমলাপুর স্টেশন। পথে বিমানবন্দর স্টেশন যেন যাত্রীর খনি। একটি ট্রেন পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনে ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ভেতরে স্থান না পেয়ে শুরু হয় ছাদে ওঠার প্রতিযোগিতা। এখান থেকে ছেড়ে বাড়তি যাত্রী নিয়ে ধীর গতিতে রওয়ানা দেয় ঈদের বিশেষ ট্রেন। ৪০ মিনিট দেরিতে গতকাল সকাল ৭টায় দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশে ঈদ স্পেশাল ট্রেনটি ছেড়ে যায় কমলাপুর স্টেশন। এছাড়া ঈদের আগে এবং পরে ঢাকা থেকে পার্বতীপুর ও খুলনায় দুই জোড়া এবং চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরে চলাচল করবে দুই জোড়া বিশেষ ট্রেন। ঈদের দিন ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ ভৈরব থেকে আরও একটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করবে শোলাকিয়ায়। চট্টগ্রামের পথে মহানগর এক্সপ্রেস এবং দেওয়ানগঞ্জগামী ঈদ স্পেশাল ছাড়া প্রায় সবগুলো ট্রেনের যাত্রাই ছিল নির্ধারিত সময়ে। রেল কর্তৃপক্ষের দাবিÑ এখন পর্যন্ত রেলে শিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেনি।
কমলাপুরের স্টেশন ম্যানেজার খায়রুল বশীর জানান, সকালের তুলনায় ভিড় বাড়বে দুপুরের পর থেকে। আজ বুধবার থেকে পুরোমাত্রায় যাত্রী ঢল নামবে কমলাপুর স্টেশনে। ঈদের পর হরতাল থাকলেও রেল চলাচল স্বাভাবিক থাকবে। এ জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
বাস : ঈদের আগাম টিকিটের যাত্রী ছাড়াও বিনা টিকিটের বহু যাত্রী নগরীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারে ভিড় জমাচ্ছেন। এমন যাত্রীর অধিকাংশই ঠাঁই করে নিচ্ছেন বাসের ছাদে। এদের অনেকের আশা পথিমধ্যে যাত্রী নামার পর বাসের ভেতরে জায়গা পাবার। তারপরও আপনজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি যেতে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গাবতলী এসে জড়ো হচ্ছেন।
তবে পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতকাল ছিল তুলনামূলক কম যাত্রী। ভোর থেকে টানা বৃষ্টির কারণে অনেকেই গাবতলী পৌঁছতে পারেনি বলেও জানান তারা।
পরিবহণসংশ্লিষ্টরা যাত্রী কম থাকার কথা বললেও পরিপূর্ণ যাত্রী নিয়েই প্রতিটি বাস ছেড়ে গেছে। এরমধ্যে বেশি ছিল
উত্তরবঙ্গের যাত্রী। লঞ্চ : নদী পথে ৫০টির অধিক রুটে ১৬০ লঞ্চ চলছে এবার। ৮ থেকে ১০ লাখ লোক যাবে দক্ষিণাঞ্চলের নৌযানগুলোয়। মালিক সমিতি ছাড়াও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা অবিরাম ছুটোছুটি করছেন। লঞ্চ টার্মিনালে কোস্টগার্ড, পুলিশ, র্যাব ও স্কাউট সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। একটি লঞ্চ আসার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নিষেধ সত্ত্বেও নৌকাযোগে ঝুঁকি নিয়ে মাঝ নদীতে গিয়ে লঞ্চে ওঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। স্বল্পপাল্লার লঞ্চ তিন এবং দূরপাল্লার লঞ্চগুলো দুই ট্রিপ করে চলাচলের ব্যবস্থা করেছে মালিক সমিতি। মালিক সমিতির সচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী জানান, আমরা যাত্রী নিরাপত্তায় সকল ব্যবস্থা নিয়েছি। অতিরিক্ত যাত্রী বহনে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিটি লঞ্চের ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী বহন করা হচ্ছে না। তবে ঈদ উপলক্ষে যাত্রীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার থাকে না। কারণ সবাই যেতে চায়। আজ থেকে ঘরমুখো মানুষের চাপ আরও বাড়বে বলে জানান তিনি। তাছাড়া ঈদের হরতাল হলেও নৌযান চলাচলে কোনো অসুবিধা হবে না।
ভোগান্তির বৃষ্টি : ঈদে ঘরমুখো মানুষদের ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারাদেশে আজ বুধবারও থেমে থেমে বৃষ্টি থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তবে কখন কোন অঞ্চলে বৃষ্টি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি আবহাওয়া অফিস। সম্পাদনা : আলাউদ্দিন


0 Comments