মাওলানা আবুবকর ছিদ্দিক
বিশ্ব বিধাতা মহাপ্রভু আল্লাহ তা-য়ালা অসংখ্য অগণিত সৃষ্টিরাজি দিয়ে নিখিল বিশ্ব নামক এই সংসারকে সাজিয়েছেন। প্রত্যেক সৃষ্টিকেই নিজ নিজ জীবন চলার পন্থা শিখিয়ে দিয়েছেন সূচারুরূপে ও সঠিকভাবে
জীবন পরিচালনা করার কর্মপন্থা ও নিয়মাবলী। কুরআন করীম বলেছেন, সকল প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর জন্য। যিনি সকল বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন আর হেদায়েত দান করেছেন। মহান আল্লাহ তার অপার অনুগ্রহে নবী ও রাসূলগণের মাধ্যমে অসংখ্য বাণী প্রেরণ করে মানব জাতির বিবেকের আলোকবর্তিকা ও শক্তিকে আরো উজ্জ্বল দীপ্তিমান করে সিরাতুল মুসত্বাকিমের পথ দেখিয়েছেন। কোরআনে করিম হল- আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ঐশী গ্রন্থসমূহের সর্বশেষ গ্রন্থ। এ মহান গ্রন্থ আল কোরআন সুদীর্ঘ তেইশ বৎসর ধরে হুজুর আকরাম (সাঃ) এর উপর অবতীর্ণ হয়। এ হল জীবন্ত কোরআন, এর নিজস্ব কোন মুখ নেই, তবুও সে কথা বলতে পারে। আপনি যদি কোরআনকে প্রশ্ন করেন, হে কোরআন, তুমি কোন মাসে নাযিল হয়েছ, তার জবাবে কোরআন বলবে। অর্থাৎ রমজান মাসই হল সেই মাস যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্য পথযাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ। আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। (সূরাঃ বাকারাহ)
হযরত আবুযর গিফারী (রাঃ) এর বর্ণনা মতে, রাসূল (সাঃ) বলেন- ইবরাহিম (আঃ) এর সহিফা সমূহ ৩রা রমজানে, তওরাত শরীফ ৬ই রমজানে, ইঞ্জিল শরীফ ১৩ই রমজানে এবং যবুর কিতাব ১৮ই রমজানে অবতীর্ণ হয়েছে। আর কোরআনে পাক ২০শে রমজানে মোবারক নাযিল হয়েছে। (তাফসীরে মাজহারী)
উল্লেখিত হাদীসে পূর্ববর্তী কিতাব সমূহের অবতরণ সম্পর্কিত যে সব তারিখের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেসব তারিখে কিতাব সম্পূর্ণই নাযিল করা হয়েছিল। কিন্তু কোরআনের বৈশিষ্ট্য হলো এই যে তা সম্পূর্ণভাবে রমজানের কোন এক রাতে লওহে মাহফুজ থেকে পৃথিবীর আকাশে অবতীর্ণ করে দেয়া হলেও হুজুর পাক (সাঃ) এর উপর ধীরে ধীরে তেইশ বৎসর তা অবতীর্ণ হয়। (তাফসীরে মারেফুল কোরআন)।
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, মহানবী (সাঃ) রমজান মাসে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। সে মাসের প্রতি রাতে হযরত জিবরাইল (আঃ) তার সাথে দেখা করতেন। আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রহঃ) লিখেছেন রমজান মাসে প্রতি রাতে হযরত জিবরাইল (আঃ) মহানবী (সাঃ) কে কোরআন তেলাওয়াত পাঠ করে শুনাতেন। (আইনী শরহে বুখারী- ১ম খন্ড -৭৬)
পবিত্র কোরআন মাজীদ ও আসমানী অন্যান্য গ্রন্থসমূহ এ রমজান মাসেই অবতীর্ণ হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতে মাহে রমজানের ফযীলত ও মর্যাদা অপরিসীম। পবিত্র কোরআনের সাথে এই মাসটির ঘনিষ্ঠতা ও নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। রমজান মাসকে কোরআন নাযিলের জন্য নির্দিষ্ট করে আল্লাহ তা-য়ালা মূলতঃ রমজানের ফসীলত ও মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেছেন অন্যথায় মাস হিসাবে সকল মাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। কোরআন মাজীদ বলছে নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস- বারটি। (সূরা তাওবা)
মুসলিম জাতি আজ কোরআনের আমল থেকে দূরে সরে গিয়ে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক কয়েকটি ইবাদত তথা রোজা, নামাজ, যাকাত, হজ্ব, শবে ক্বদর, শবে বরাত ইত্যাদি পালনে চলেছে। অপরদিকে তাদের জীবনে সামগ্রিক অঙ্গনে কোরআনের কোন স্থানই নেই। ফলে তারা তলিয়ে যাচ্ছে পঙ্কিলময় জীবদ্দশায়। বিশ্ব দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল (রহঃ) অনুতপ্ত হৃদয়ে বলে গেছেন- অতীতে মুসলমানরা ইজ্জত, সম্মান, স্থায়িত্ব ও গৌরবের উর্ধ্বাসনে সমাসীন হয়েছিলেন কোরআনের সামগ্রিক অনুসরণ করতঃ খাটি মুসলমান হওয়ার কারণে। অথচ এই যুগের মুসলমান কোরআনকে বর্জন করার কারণে লাঞ্চিত, অপমানিত এবং হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে। তাই আজ সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আত্মবলে বলীয়ান হওয়ার প্রশিক্ষণ দিয়ে যেন বিশ্ব মুসলিম কোরআনে মাজীদের বাস্তব অনুসরণ ও অনুকরণ করে তাদের হারানো সোনালী অতীতের সন্ধান পায় কোরআনের মাস, রমজানুল মোবারকের এ শুভ সন্ধিক্ষণে মহান আল্লাহর দরবারে এ তৌফিক কামনা করছি।
মাওলানা আবুবকর ছিদ্দিক
পরিচালক
মাদ্রাসা আল-ইসলামিয়া রিয়াজুস ছালেহীন
ছনখোলা ঘোনার পাড়া, পিএমখালী, কক্সবাজার।

0 Comments