Advertisement

ঈদের আগেই জাতীয় নির্বাচন প্রস্তুতি সারতে চায় বড় দুই দল


ডেস্ক রিপোর্ট
ঈদের আগেই জাতীয় নির্বাচনের বেশিরভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখতে চায় দেশের প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রমজানের পুরো সময়কে কাজে লাগাবে তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রীয় নেতাদের দুরত্ব কমিয়ে সার্বিক নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণে। অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু নিয়ে মাঠপর্যায়ে নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে বদ্ধপরিকর বিএনপি।

পাঁচটি সিটি করপোরেশনে টানা পরাজয় আমলে নিয়ে আওয়ামী লীগ আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করেছে।
দলগতভাবে নির্বাচন করলে আসন বণ্টন কি রকম হবে, আর মহাজোটগতভাবে নির্বাচন করলে তা নিয়ে হিসেব কষছে আওয়ামী লীগ।
সরকারি-বেসরকারি জরিপ এবং গত জাতীয় নির্বাচনে মনোয়নপ্রাপ্তদের তালিকা বিশ্লেষণের ফলাফলকে মানদ- ধরে হিসেবের খাতা চুড়ান্ত করতে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নির্দেশে কাজ করছে দলটি।
অন্যদিকে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের ঈদ-রমজান টার্গেট দুইটি। প্রথমত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঈদের পর আন্দোলন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। একইসাথে রোজার মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের সব ধরনের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে চায় দলটি। ১৮ দলীয় জোটের হাইকমা- মনে করে ঈদের পরে আন্দোলন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতি সমান্তরালভাবে চালিয়ে নিতে হলে রোজার মাসকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে হবে।
তবে, ইফতারকেন্দ্রিক আলাদা কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে রোজায় তৃণমূল-কেন্দ্র সমন্বয় এবং জোটের মধ্যকার ঐক্যবৃদ্ধিতে মনোযোগী হবে বিএনপি।
আন্দোলন ও নির্বাচনমুখী এই দুটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব ধরনের প্রস্তুতি রোজার মধ্যেই শেষ করতে মরিয়া দলটি।
রমজান মাসে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রস্তুতির শুরুতেই থাকছে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে এ বৈঠক ডেকে সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে কর্মপন্থা ঠিক করা হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ বলেন, "তৃণমূল পর্যায়ে মন্ত্রী-এমপিদের সাথে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, আমরা প্রথমেই তা নিরসনে উদ্যোগ নেব। প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে। এ জন্য ৩০০ আসনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সম্মেলন স্থগিত করা হবে।"
অপরদিকে, সাম্প্রতিক বিজয়ে প্রত্যয়ী বিএনপির দাবি, তারা ইতোমধ্যেই নির্বাচনের জন্য মোটামুটি প্রস্তুত। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, "বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দল সবসময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত থাকে। সে রকম প্রস্তুতি আমাদের এখনও আছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যাপারে অনড় থেকেই আমরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
তিনি আরো জানান, তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন হলে তাতে অংশ নেবে বিএনপি। ফলে, বর্তমানে নির্বাচন ও আন্দোলনের প্রস্তুতি একই সাথে চলছে বিএনপির।
তবে বিরোধী দলকে 'বিপাকে' ফেলার জন্য তত্ত্বাবধায়ক ছাড়াই যদি কোনো নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সে নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না বলেও জানান ফখরুল।
রমজানে আওয়ামী লীগের প্রচারণা নিয়ে জানতে চাইলে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ উল আলম লেনিন বলেন, "রমজান জুড়েই জোরেশোরে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলবে। দলের রুটিন ওয়ার্কের পাশাপাশি প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো হবে। জোটের শরিকদের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হবে।"
এক্ষেত্রে বিএনপির আলাদা কোনো রাজনৈতিক কৌশল থাকছে না।
আওয়ামী লীগের মতো তারাও রমজান জুড়ে নির্বাচনী প্রচারণা, প্রার্থী যাচাই, সম্ভাব্য ও আগ্রহী প্রার্থীদের আমলনামা পরীক্ষা, গত তিনটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের তথ্যাদি পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে জরিপসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকা- চালাবে।
এছাড়া ইফতারকেন্দ্রিক রাজনীতির মাধ্যমে তৃণমূল নেতারাও যাতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে পারে সে ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে এরই মধ্যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বিএনপিতে।
এ কাজে উৎসাহ জোগাতে ঈদের পর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক সফরে যাবেন কেন্দ্রীয় নেতার। তবে, ঈদের আগেই রোজার মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতারা নিজ নিজ এলাকায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও গণসংযোগে ব্যস্ত থাকবেন।
ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক কাজটিও সেরে রাখবেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
এছাড়া সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রোজা ও ঈদ উৎসবকে কাজে লাগানোর ইচ্ছা বিএনপির।
চার সিটি করপোরেশনের ফলাফলের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কিছুটা রদবদল শুরু হয়েছে এবং তা রমজানজুড়ে অব্যাহত রাখা হবে। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদেরকে আওয়ামী লীগের ধানম-ির কার্যালয়ে বসার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে সংগঠনের দেখভাল করারও দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে কিছুটা ছাড় দিয়ে সামনের সারিতে আনা হচ্ছে নাসিম, তোফায়েল ও আমুর মতো প্রবীন নেতাদের। নতুনদের মধ্যে মাহবুব-উল আলম হানিফকে সামনের সারিতে কাজে লাগানোর ইচ্ছা আওয়ামী লীগের।
এছাড়াও দলের উপ-কমিটি সম্পন্ন করার জন্য ওবায়দুল কাদের এবং দুই যুগ্ম-সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানককে দায়িত্ব দিয়েছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। রমজানেই উপ-কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে বলে জানিয়েছে দিলীয় একাধিক সূত্র।
সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ে মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, "আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তথ্যগুলো সংগ্রহ করে দলীয় সভানেত্রীকে দেয়া হবে। সেগুলোর আলোকেও নতুন করে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"
অন্যদিকে, সরকার হঠাৎ নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে এমন সম্ভাবনা নিয়েই এগোচ্ছে বিএনপি।
এমনটাই ইঙ্গিত দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ।
মওদুদ বলেছেন, "আন্দোলন ও নির্বাচনকে সামনে রেখে পুরো আগস্ট মাসজুড়েই আমরা তৃণমূলে সাংগঠনিক সফর করব। দলের মধ্যে যদি কোনো বিরোধ থেকে থাকে সেগুলো নিরসনের মাধ্যমে দলকে আরও শক্তিশালী করব এবং ঈদের পর পর্যায়ক্রমে ধাপে ধাপে আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাব। আর এসবে প্রস্তুতি রোজার মধ্যেই শুরু হয়ে যাবে।"
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মাহবুবুর রহমান রোজার সময়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করার আভাস দিয়ে বলেছেন, "দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একই সাথে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সেই নির্দেশ অনুযায়ী দুই ফরম্যাটেই আমাদের প্রস্তুতি চলছে। রোজার মধ্যে এই প্রস্তুতি আর জোরালো হবে।"
দলটির একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত সাড়ে চার বছরের মধ্যে এবারের রোজা ও ঈদ একটি ভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে এসেছে তাদের জন্য।
পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ের পর সারাদেশে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই গণজোয়ার ধরে রাখতে রমজানের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। এতে করে নিজেদের পক্ষে জনমত আরও বাড়বে। তাই রোজার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য অক্ষুণ্ন রেখে রাজনীতির হিসাব-নিকাশটাও মিলিয়ে রাখবে বিএনপি।
দলটির নেতারা মনে করেন, পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের একটা 'হোমওয়ার্ক' হয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে দলের ভেতর যে ছোটখাটো দ্বন্দ্ব ছিল, সেটি দূর করা সম্ভব হয়েছে। জয়ের ব্যাপারেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই চাঙ্গা অবস্থার মধ্যেই নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ দলের জন্য সহজ হবে।
এ ছাড়া জোটের মধ্যে থাকা মোটামুটি শক্তির দলগুলোর সাথেও নির্বাচন সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ সেরে রাখবে বিএনপি। যাতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এসে এসব বিষয় নিয়ে ঝামেলা পোহাতে না হয়।
১৫ থেকে ২০ রোজা পর্যন্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দল ও দলের অঙ্গ-সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের ইফতার মাহফিলে যোগ দেবেন। ওই ইফতার মাহফিলগুলোতে অন্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সাথেও দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হবে।

Post a Comment

0 Comments