Advertisement

৭ বছরে চালু হয়নি কুতুবদিয়া বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প

ফরিদুল মোস্তফা খান

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবোর) অর্থায়নে দেশে প্রথম পরীক্ষামুলক বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি কুতুবদিয়া দ্বীপের উপকুলে স্থাপন করে বিগত ৭ বছরেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে আলোর মুখ দেখেনি। এ প্রকল্পটি রক্ষা করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবোর)
অধীনে গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে বেড়িবাঁধ নির্মানের জন্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাক্কলন তৈরী করা হয়। এক ও দুই নম্বর প্রকল্পের কাজ অধিকাংশ শেষ হলেও ৩ নং প্রকল্পটির নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে গত ২০১১-১২ অর্থ বছর প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারেনি। চলতি অর্থ বছর অর্থাৎ ২০১৩-১৪ অর্থ বছর পাউবোর কর্তৃপক্ষ বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি রক্ষার জন্য  বেড়িবাঁধ এখনো নির্মাণ করতে পারেনি এ শিকার করলেন পাউবোর কর্তৃপক্ষ।
বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের  সাথে কথা বলে জানা গেছে, বিগত ২০০৭ সনের জুলাই মাসের দিকে কুতুবদিয়া দ্বীপের আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের তাবলরচর গ্রামের উপকুলে পরীক্ষামুলক বায়ু বিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি স্থাপনের কাজ শুরু করে। তখনই (অর্থাৎ ২০০৭ সনে) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবোর) অর্থায়নে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল। বিগত ২০১০ সনে প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে উক্ত এলাকায় পাউবোর  বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় প্রকল্পটি মারাতœক ঝুঁিকর মুখে পড়ে। অবশ্য ২০০৭ সন হতে ২০১৩ সন পর্যন্ত বিগত ৭ বছর ধরে এ প্রকল্প হতে দ্বীপবাসী বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রাহকদের নিকট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে দেখেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবোর) তত্ত্বাবধানে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে কুতুবদিয়ার তাবলরচর গ্রামের সাগর উপকুলে বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি  স্থাপন করা হয়। ২০০৭ সনের জুলাই মাসে এ প্রকল্পের  কাজ শুরু করলে গত ২০০৮ সালের ১৫ মার্চ মাসে অধিকাংশ কাজ শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দিকে গিয়েছিল।  বিগত ২০০৮ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটি পরীক্ষামুলকভাবে চালুও করা হয়। ঐ বছর (২০০৮) ১৪ এপ্রিল এ প্রকল্পটি গ্রাহকদের নিকট উম্মুক্ত করে বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়া হয়। তখনই প্রকল্পটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ উপজেলা সদরের সাত শতাধিক গ্রাহককে সন্ধ্যা ৬টা হতে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছিল। ২০০৮ সালের ১৪ জুলাই আইলার জলোচ্ছ্বসে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে স্থাপিত ৫০ টি বায়ুকল পাখার (উইং) মধ্যে অধিকাংশ পাখা ভেঙে যায়। তখন থেকেই এ প্রকল্প হতে বিদ্যুৎ  উৎপাদন হতে দেখেনি গ্রাহকরা। কুতুবদিয়া উপজেলার আবাসিক প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ইলিয়াছ মাহমুদের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, যান্ত্রিক ত্রুুটির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কুতুবদিয়া উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি পূর্ণঃ মেরামত ও নতুন প্রকল্প তৈরী করে অর্থ বরাদ্দের চাহিদাপত্র কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। বিউবোর ঢাকা অফিস থেকে এ প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রন করে থাকে। তাই যথাযথ জবাব দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।  বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে গেলে কুতুবদিয়া দ্বীপে তেমন বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকবে না।  তবে বর্তমানে পিড়িবির ৫শত কেবি ক্ষমতাসম্পন্ন কামিন্স জেনারেটর মেশিন দিয়ে কুতুবদিয়া উপজেলা সদরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছেন।
অবশ্য বিদ্যুৎ গ্রাহকদের অভিযোগ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ ও সরবরাহ না থাকলেও কুতুবদিয়া আবাসিক প্রকৌশলী অফিস রক্ষণাবেক্ষণ (মেনটেইনেন্স) নাম দিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রতি মাসে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে হাজার হাজার টাকা বিল ভাউচার দেখিয়ে টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে যাচ্ছে। এ সুবাধে অফিসের কিছু সংখ্যক অসাধু কর্মচারী বিদ্যুৎ লাইন মেরামত নাম দিয়ে অবাধে সড়কের সামাজিক বনায়নের ও বাড়ি ভিটির গাছ গাছালি খেটে লাকড়ি বিক্রি করে বনায়ন ধ্বংস করছে।
বিউবোর অফিস সূত্রে প্রকাশ, কুতুবদিয়ার বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি গত ২০০৭ সনে স্থাপনের কাজ শুরু করলে ২০০৮ সনে স্থাপনের কাজ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শেষ করেন। প্রকল্পটি বিউবোর তত্ত্ব¡াবধানে প্যান এশিয়া পাওয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড একটি সংস্থা বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্প স্থাপন করেন। এক হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৫০ টি বায়ুকল (উইং টারবাইন) স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি বায়ুকল থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা রয়েছে। একটি বায়ু কলের একটি ইউনিট ধরা হবে। প্রতিটি ইউনিটে ৫০ মিটার উচুঁ একটি টাওয়ার ও টাওয়ারের মাথায় দেড়টন ওজনের ডানা বিশিষ্ট একটি ইস্পাতের পাখা স্থাপন করা হয়েছে। একটি উইং টারবাইন থেকে আরেকটি টারবাইনের দুরত্ব তিনশ গজ। বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের যন্ত্রগুলোতে টাওয়ার জেনারেটর কন্ট্রোল ,প্যানেল, সাব-স্টেশন ও টারবাইন ব্লেড রয়েছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিউবোর কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে জানান,  কুতুবদিয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ কামনা করলে এ প্রকল্পটি চালু করার জন্য নতুন ভাবে প্রকল্প তৈরী করে টেন্ডার আহবান করা হয় । যথাযত শর্ত পূরণ না হওয়ায়  পুনরায় রি-টেন্ডার দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিউবোর ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাবে। অবশ্য এ এলাকায় পাউবোর বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনে গেলেও কাজে আসবে না।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কক্সবাজার জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মাঈন উদ্দিনের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি রক্ষার জন্য পাউবোর অর্থায়নে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভাবে একটি প্রকল্প তৈরী করে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।  নিয়োগ প্রাপ্ত ঠিকাদারের অনিয়ম ও অবহেলার কারণে ঠিকাদার প্রাক্কলিত কাজ সমাপ্ত করেনি। ঐ এলাকায় গত ২০১১-১২ অর্থ বছর এক ও দুই নং প্রক্কলিত দুইটি প্রকল্পের বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। প্রাক্কলিত তিন নং প্রকল্পটির নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার যথা সময়ে কাজ শুরু না করায় চুক্তিপত্র বাতিল পূর্বক নতুন ভাবে প্রক্কলন তৈরী করে  ইতিমধ্যে পূনঃ টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগামী ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে বায়ুবিদ্যুৎ এলাকায় ভাঙ্গণ বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হবে। অসমাপ্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বায়ুবিদ্যুৎ পাইলট প্রকল্পটি মারাত্মœক ঝুকির মুখে রয়েছে।

Post a Comment

0 Comments