রাজনৈতিক নির্যাতনের অংশ হিসেবে তিনি একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন কাদের সাকা চৌধুরী। নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন তিনি। বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও
বিচারপতি আনোয়ারুল হকের দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ বৃহ¯পতিবার চতুর্থ দিনের মতো সাফাই সাক্ষ্য দেন মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সাকা চৌধুরী।
তিনি বলেন, “আমি রাজনৈতিক ‘জুলুমবাজি’র শিকার হয়ে এ ট্রাইব্যুনালে এসে দাঁড়িয়েছি (প্রসিকিউশনের আপত্তিসহ গৃহীত)। রাজনৈতিক জুলুমবাজি দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো উপন্যাসের ঘটনা না, তবে বিভিন্ন আমলে এর হার বেড়েছে।”
সাকা চৌধুরী আরো বলেন, “ব্রিটিশ রাজত্বের সময় থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতারকৃত রাজনীতিবিদদের ওপর তেমন কোনো শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছরেও তেমনভাবে এ ধরনের অভিযোগ শোনা যায়নি।”
এ সময় প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ট্রাইব্যুনালকে বলেন, “মাই লর্ড, আদালতের নিয়ম (রুলস) মেনে চলা হচ্ছে কি না তা দেখা দরকার।” আরেক প্রসিকিউটর আলতাফ উদ্দিনও বলেন, “আপনি আদালতের নিয়ম মেনে সাক্ষ্য দিন।” এ সময় সাকা চৌধুরী বলেন, “ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না।”
তিনি ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমি ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে ইতিহাস থেকে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খেলাফত আন্দোলনের দুইজন নেতা মাওলানা মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলীকে গ্রেফতার করা হয়। সেই ব্রিটিশ আমলে মাওলানা মোহাম্মদ আলী দুই মাস ২৪ দিন ধরে আমার মতো সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।”
সাকা চৌধুরী বলেন, “আজকে স্বাধীন দেশে তিনদিন সাক্ষ্য দেওয়ার পরই আমাকে বারবার টাইম ম্যানেজমেন্টের কথা শোনানো হচ্ছে। আমি আড়াই বছর ধরে জেলে রয়েছি। আমারওতো বউ বাচ্চা, আপনজন আছে। তাদের ছেড়ে আছি। ” এরপরে আবার সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করে তিনি বলেন, “এমনকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেফতারের পরে বঙ্গবন্ধুর ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন হয়েছে বলে শোনা যায়নি। তিনি নিজেও কখনো এমন কোনো দাবি করেননি, যা থেকে বোঝা যায়, তার ওপর কোনো নির্যাতন হয়নি।”
“ছাপোষা অত্যাচারীদের অভব্যতার প্রথম অভিজ্ঞতা হয় আমার ২০০৭ সালের ৪ ফেব্র“য়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন আমি গ্রেফতার হই। ওই সময় আমাকে আমার ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় একজন ‘দেশপ্রেমিক’ আর্মি অফিসার আমার চোখ বেঁধে ফেলেন এবং আমাকে পাঁচ ফুট বাই নয় ফুট সাইজের একটি কারাকক্ষে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেভাবেই রাখা হয়।” তিনি জানান, “ওই কারাকক্ষের দু’পাশের কক্ষে ছিলেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা কামাল লোটাস। ওই কারাগারে ২০ মাস আটক ছিলাম আমি।”
এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আব্দুল জলিল, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আরো অনেক রাজনীতিবিদও সেখানে আটক ছিলেন বলে জানান সাকা চৌধুরী। সাফাই সাক্ষ্যে তিনি বলেন, “আইনজীবী, প্রকৌশলী, ডাক্তারসহ সব পেশাজীবীদের স্বার্থরক্ষার জন্য সংগঠন থাকলেও রাজনীতিবিদদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো সংগঠন নেই। একমাত্র রাজনীতিবিদরাই নিজেরাই মাংশাসী প্রাণীদের মতো নিজেদের মতো অন্যদের দিয়ে ক্ষুধা মিটাতে চান।”
তিনি আরো বলেন, “ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলে হওয়ার সুবাদে জন্মের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যেই থাকার সুযোগ হয়েছে। সত্তরের দশক পর্যন্তও মতাদর্শের পার্থক্য থাকলেও রাজনীতিবিদদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ সব সময়ই ছিলো।”
এ সময় ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে এ বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমার বাবাকে বঙ্গবন্ধু তার বাসায় ভাত খেতে বলেছিলেন। ’৯০-র দশকে যখন হুলিয়ার জন্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জু শপথ নিতে পারছিলেন না, তখন আমি তাকে সংসদ ভবনের সাততলায় আমার জন্য বরাদ্দ একটি কক্ষে নিয়ে সারারাত রেখে পরদিন শপথ নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেই। তখন আমি বিএনপিও করতাম না, এনডিপি করতাম।” “এই সামাজিক যোগাযোগের ব্যাপারটাই এখানে বলতে চেয়েছি আমি।”
সাক্ষ্যে তিনি আরো বলেন, “বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে নতুন এক ধরনের ‘হাইব্রিড’ ঐতিহ্য চালু হয়েছে। একে অপরের প্রতি সন্দেহের ভিত্তি এতো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠে এক বিষবা®প ছড়াচ্ছে যা সহিংসতা ডেকে আনছে।” এ পর্যায়ে সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত অবস্থায় রোববার পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। গত সোমবার থেকে প্রথম সাফাই সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দিচ্ছেন সাকা চৌধুরী। তিনিসহ ৫ জন সাক্ষী সাফাই সাক্ষ্য দিতে পারবেন বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালঅ
অন্যদিকে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ নূরুল ইসলাম ঘটনা ও জব্দ তালিকার সাক্ষী মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী। আর ৪ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেফতার করা হয় গাড়ি ভাংচুর ও পোড়ানোর মামলায় সাকা চৌধুরীকে। পরে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। গত বছরের ৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়।

0 Comments