Advertisement

প্রয়াত অধ্যাপক খালেকুজ্জামান বাহার কক্সবাজারের আলোক বর্তিকা


ইন্জিনিয়ার বদিউল আলম
জন্মিলেই মৃত্যু অনিবার্য। জীব জগতের তো বটেই, এমনকি প্রকৃতি জগতের পরিত্রাণও নেই মৃত্যু বা ধ্বংস থেকে। এটা সৃষ্টির অমোঘ বিধান। পৃথিবীতে যুগে যুগে বিভিন্ন স্থানে, সমাজে ও দেশে কিছু জ্ঞানী এবং
মেধাবী মানুষের জন্ম হয়। ফলে তাদের বদৌলতে সেই দেশ বা সমাজ উপকৃত হয়। অন্ততঃ কক্সবাজারের জন্য প্রয়াত অধ্যাপক খালেকুজ্জামান তেমনই একজন ব্যক্তি হিসেবে নিঃসন্দেহে দাবী করা যায়। বিগত ১১ জুন, ২০১৩ মঙ্গলবার মাত্র ৫৮ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন।
তার সহপাঠি, সহকর্মী বা ছাত্র না হলেও তার অনুজপ্রতিম বন্ধু হিসেবে তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। কাকতলীয়ভাবে তার সাথে আমার পরিচয়। তবে সে আলোচনা এখানে অবান্তর। প্রথম দেখাতে এবং আলোচনাতেই বুঝতে পারি যে, মানুষটি অতি বিদ্বান। দুনিয়ার নামকরা জ্ঞানী-পন্ডিত-দার্শনিকদের খাতায় নাম থাকতো, যদি তিনি কক্সবাজারে বাস না করে ঢাকা বা উন্নত কোন দেশের রাজধানীতে বসে তার পেশাগত জীবন কাটাত। কেননা সেখানেই লাইম লাইটে তাকে তুলে ধরার অপূর্ব সুযোগ ছিলো। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সর্বত্র নজরকাড়া মেধার কৃতিত্ব ছিল তার। অতঃপর কর্মজীবনে যেখানেই গেছেন সেখানেই জ্ঞান-জ্যোতির বিচ্ছুরণ রেখে গেছেন। এ ব্যাপারে তার সহকর্মী ও ছাত্ররা আরো ভালো জানেন। তিনি ইংরেজীর ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে হলেন ইংরেজীর শিক্ষক। আমার ব্যক্তিগতভাবে দেশ-বিদেশে অনেক ইংরেজী শিক্ষকের সাথে পরিচয় ও সম্পর্ক। কিন্তু নিখুঁত ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে যে ভাষাগত সংস্কৃতি, উচ্চারণ, ব্যাকরণ,  প্রজ্ঞা ও পান্ডিত্যশৈলী থাকা প্রয়োজন, সর্বোচ্চ মার্গের তার ছিলো। পৃথিবীর উন্নত যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে অবাধে বিচরণ করার সার্বিক যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষটি ছিলো আমাদের বাহার ভাই। অবাক হতে হয়, ইংরেজীর শিক্ষক হলেও দেশজ রাজনীতি, বিশ্ব রাজনীতি, বিশ্ব অর্থনীতি, ধর্মনীতি, সংস্কৃতি এবং আধুনিক বিজ্ঞান জগতের প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনকি আমার ইনজিনিয়ারিং জগতের বিভিন্ন খুঁটি-নাটি বিষয়ে ছিলো তার নিখুঁত জ্ঞান। 
খালেকুজ্জামান বাহার প্রকৃতপক্ষে একজন পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। অর্থ-বিত্ত ক্ষমতার মোহ বিষ্ট হননি, যেটা সাধারণভাবে জ্ঞানী-দার্শনিক ব্যক্তিদের বেলায় প্রযোজ্য। হতে পারতেন, দেশের কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ বেতনধারী চাকর বা সরকারি প্রশাসনিক কোন সর্বোচ্চ উঁচুপদে আসীন। তার সেই যোগ্যতা ছিলো। বিসিএস পরীক্ষায় সারাদেশে তার ২য় স্থান অর্জন তা প্রমাণ করে। 
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এত মেধাবী মানুষটি কেন ঢাকা বা দেশের অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন নাই। অতি আবেগী ও প্রতিশ্র“তিশীল মানুষের যা হয়, তাই হয়েছে। দলীয় শিক্ষক রাজনীতির সুযোগ নেওয়া অপরাধ মনে করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ শিক্ষক নিয়োগের বেলায় তাকে অপেক্ষমান তালিকায় রাখা হয়। ফলে প্রচন্ড ক্ষোভে অভিমানে অল্পকালের মধ্যে তিনি লিবিয়ার ত্রিপোলী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী সাহিত্যের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদেন। ওখানে ক’বছর শিক্ষকতার পর দেশপ্রেমের টানে দেশে ফিরেন এবং ঢাকায় বিমান বাহিনীর শাহিন স্কুল এন্ড কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ওখানে আবার ক’বছর অধ্যাপনার পর নিজ শহর কক্সবাজারে এসে ঈদগাহ্ ফরিদ আহমদ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। অতঃপর কিছুক্ষণ অধ্যাপনার পর স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে তার আকর্ষণীয় শিক্ষাদান পদ্ধতির কারণে নিজগৃহে কোচিং সেন্টার খুলতে বাধ্য হন। এর কিছু দিন পরেই কক্সবাজারে অবস্থিত জাতিসংঘের শাখা ইউএনএইচসিআর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের ইংরেজী শিক্ষাদানের জন্য ডাক পড়ে। সেখানে তার উন্নত শিক্ষাদানের কারণে তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হন এবং নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প কাজ সমাপ্ত করেন। ওই সময়ে আমি মহেশখালীতে লীডারশীপ ইউনিভার্সিটি কলেজের নির্মানাধীন ভবন সূহের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে কর্মরত ছিলাম। ওখানে একজন অভিজ্ঞ ইংরেজীর অধ্যাপক প্রয়োজন বিধায় আমি খালেকুজ্জামান বাহার ভাইকে বিনীত অনুরোধ করি। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডাঃ রাশেদ রশিদ তার শিক্ষকতার মান ও প্রজ্ঞায় বিমোহিত হন।  অতঃপর তিনি লিডারশীপ ইউনিভার্সিটি কলেজে যোগদান করেন। সেখানে অত্র কলেজের সাদা চামড়ার অস্ট্রেলিয়ান অধ্যক্ষ কর্তৃক ব্যাপকভাবে সম্মানিত ও প্রশংসিত হন।  
আজকে কক্সবাজারের নতুন প্রজন্ম যারা ইংরেজীতে বুৎপত্তি লাভ করেছেন, তারা প্রায়ই খালেকুজ্জামান বাহারের সৃষ্টি। ভার্সেটাইল ইংলিশ ক্লাব তার মেধা ও মননের সৃষ্টি এবং স্বাক্ষী। তিনি শুধু ইংরেজীর শিক্ষক হিসাবে নয়, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শন জগতের অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং সৃজনশীল লেখক। 
আমার স্মৃতিতে তিনি বড়ই মধুর, রসিক ও হিতকারী মানুষও বটে। বন্ধু সমাবেশে মানুষকে মাতিয়ে রাখার অসীম গুণে গুণান্বিত তিনি। তার অসময়ে মৃত্যুতে কক্সবাজারবাসী হারাল জ্ঞানের এক উজ্জ্বল প্রদীপকে। তাকে হারিয়ে আমরা মূহ্যমান। অসীমের মাঝে খুঁজে পেতে আমাদের ব্যর্থ প্রয়াস মাত্র। আমরা অধ্যাপক খালেকুজ্জামান বাহারের মহাপ্রয়ানে পরম ব্যথিত তার বৃদ্ধা মা, তার সন্তান, তার পরিবার এবং স্বজনদের জ্ঞাপন করি আন্তরিক সমবেদনা। তার আত্মার শান্তি কামনা করি। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক। 

লেখকঃ
ইনজিনিয়ার বদিউল আলম
বিশিষ্ট পরিকল্পনাবিদ
সমাজসেবক ও রাজনীতিবিদ
কক্সবাজার।

Post a Comment

0 Comments