Advertisement

আমি বাঙালি নই, চাটগাঁইয়া!

বরাবরই তিনি ব্যতিক্রম। সব সময় নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখার জন্য নানা ঘটনার জন্ম দেন তিনি। তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, বাক্যবাণ ছুড়তে, নানাভাবে চারপাশ উত্তপ্ত করে তুলতে তার জুরি নেই। তিনি আর কেউ নন অঘটন ঘটনপটিয়সী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (সাকা) চৌধুরী। রোববারও তার ব্যতিক্রম হলো না। নিজেকে বাঙালি নয়, চাটগাঁইয়া বলে দাবি করলেন একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সংসদ সদস্য। নিজের পক্ষে ৭ম দিনের মতো সাফাই সাক্ষ্যদানকালে রোববার এ মন্তব্য করেন সাকা চৌধুরী। তিনি আগের ৬ দিনের মতোই ইংরেজিতে সাক্ষ্য দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ। চেয়ারম্যান এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল তাকে সোমবারের মধ্যে সাফাই সাক্ষ্য শেষ করার আদেশ দিয়েছেন।
পরে সাকা চৌধুরী বলেন, আমি এখন পর্যন্ত যে বক্তব্য দিয়েছি তা সর্বোচ্চ এক ঘন্টার বক্তব্য। কিন্তু তা রেকর্ড (ক¤িপউটারে ক¤েপাজ) করতে অনেক বেশি সময় লাগছে। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাকে বলেন, আপনি বাংলায় সাক্ষ্য দিলে এতো সময় লাগতো না। তার চেয়েও বেশি কথা বলতে পারতেন।
জবাবে সাকা চৌধুরী বলেন, আমি বাংলায় সাক্ষ্য দিতে পারবো না, ইংরেজিতেই দেবো। কারণ, আমি বাঙালি না চাটগাঁইয়া। বাংলায়তো আমি ভালো বলতে পারতাম না। টেকনিক্যাল প্রবলেম হতো। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করে সাকা চৌধুরী সাফাই সাক্ষ্যে আরও বলেন, ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণকে যদি স্বাধীনতার ঘোষণা বলে দাবি করা হয়, তাহলে আমি মুক্তিযুদ্ধের একজন সমর্থক। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হন, তাহলে আমিও মুক্তিযুদ্ধের একজন সমর্থক।
এক পর্যায়ে সাক্ষ্য শেষ করার তাগাদা দিলে ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ্য করে সাকা চৌধুরী বলেন, সাঈদী সাহেবের মামলার রায়ের সময় বলা হয়েছে, বর্তমান সাঈদীর বিচার হচ্ছে না। দেলু শিকদারের (ওরফে দেইল্যা রাজাকার)বিচার হচ্ছে। আর আমার ব্যাপারে বলা হচ্ছে, ট্রাইব্যুনালে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিচার হচ্ছে না, বিচার হচ্ছে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছেলের।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার সাক্ষ্যে আরও বলেন, ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বন্ধুদের সঙ্গে আমিও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলাম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর একাধিক বৈঠক হয়েছে।
সাফাই সাক্ষ্যের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধে নিজের এবং পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি করে এর বিশদ বর্ণনা  দেন সাকা চৌধুরী। আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের দাবি তিনি বলেন, সে সময় তার ধানমণ্ডির বাসায় নিয়মিত আসতেন শেখ কামাল, তোফায়েল আহমেদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, সালমান এফ রহমান, শাহজান সিরাজসহ আরও অনেকে।
সাক্ষ্য দানকালে বেশ কয়েকবার বসে পড়েন সাকা। যদিও সপ্তম দিনের সাক্ষ্যদানের শুরুতেই ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বসে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। তখন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বসে সাক্ষ্য দিতে তার অসুবিধার কথা জানান। পরে তার এক আবেদনের প্রেক্ষিতে সাক্ষ্যগ্রহণ সোমবার পর্যন্ত  মুলতবি করে তা ওই দিনের মধ্যে শেষ করার তাগাদা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
সাক্ষ্যের শুরুতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় বাস করতাম। ঢাকায় আমাদের কোনো ড্রাইভার ছিল না। তাই বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার পিতার গাড়িটি আমিই ড্রাইভ করতাম।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী দাবি করেন, ১৯৬৫ সালের শেষ এবং ১৯৬৬ সালের শুরুর চার মাস সময় ছাড়া ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আমি কখনই চট্টগ্রামে আমার পারিবারিক বাসভবন গুডস হিলে বাস করিনি।
১৯৭৪ সালের পর চট্টগ্রামের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ ঘটে দাবি করে সাকা আরও বলেন, ১৯৭৯ সালের আগে চট্টগ্রামের ভোটার তালিকায়ও আমার নাম ছিল না। ১৯৬৬ সালের শুরুর দিকে আমার পিতা যখন মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত হন তখন থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি গণপরিষদের একজন স্বতন্ত্র সদস্য ছিলেন। সাকা বলেন, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে তখন আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। যদিও আমি নিজে কখনও কোনো ছাত্র সংগঠনের সদস্য ছিলাম না। আমার বন্ধুদের সঙ্গে ১৯৬৯ সালে আমি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম।
বিএনপির এ নেতা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা ধানমণ্ডিতে থাকতেন এবং যারা ধানমণ্ডির বাইরে থাকতেন তারা আমার বাসায় আসতেন। তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল তারা হলেন তওহিদ সামাদ, আহমেদ সালমান ফজলুর রহমান (সালমান এফ রহমান), শেখ কামাল, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, নিজাম আহমেদ, খায়রুল বাশার, ইরফান খান, ইমরান আহমেদ, কাজী আনোয়ার, আব্দুস সামাদ, কাইয়ুম রেজা চৌধুরীসহ আরও অনেকে। সিনিয়রদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আব্দুর রউফ, তোফায়েল আহমেদ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, সিরাজুল আলম খান, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, শাহজাহান সিরাজদের বাসায় আমন্ত্রণ জানাতেন বলেও দাবি করেন সাকা চৌধুরী।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার আন্দোলনকে বেগবান করতে তারা প্রায়ই আমার বাড়িতে মিলিত হতেন। সিনিয়রদের এসব মিটিংয়ে আতিথেয়তা দেওয়াই ছিল আমার কাজ। সাক্ষ্যের এক পর্যায় ট্রাইব্যুনাল বক্তব্য শেষ করার তাগিদ দিয়ে বলেন, আপনি ইতিহাসের কথা বলছেন, তা শুনে আমাদের কি লাভ?
জবাবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, আমার বিরুদ্ধে তো ইতিহাসের কথাই বলা হয়েছে। দেড় বছর আমার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। অথচ আমাকে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। সাকা চৌধুরীর পক্ষে তিনি নিজেসহ পাঁচ জন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য দেবেন বলে নির্ধারণ করে দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
তাদের মধ্যে প্রথম সাক্ষী হিসেবে গত ১৭ জুন থেকে সাফাই সাক্ষ্য দিচ্ছেন সাকা চৌধুরী। গত সোমবার পর্যন্ত ৬ষ্ঠ কার্যদিবসের মতো সাক্ষ্য দানকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বুধবারও অসুস্থ থাকায় তার সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ রোববার পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে সাকা চৌধুরীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য বাকি ৪ জন সাক্ষীর তালিকা দাখিল করেছেন আইনজীবীরা। সাক্ষীর তালিকায় রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা সালমান এফ রহমান (আহমেদ সালমান ফজলুর রহমান), এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাইয়ুম রেজা চৌধুরী, নিজাম আহমেদ ও বিচারপতি শামীম হাসনাইন। 
উল্লেখ্য, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ নূরুল ইসলাম ঘটনা ও জব্দ তালিকার সাক্ষী মিলিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী। আর ৪ জন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রত্যুষে গ্রেফতার করা হয় গাড়ি ভাংচুর ও পোড়ানোর মামলায় সাকা চৌধুরীকে। পরে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে। গত বছরের ৪ এপ্রিল সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। এতে তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের উল্লেখ করা হয়।

Post a Comment

0 Comments