হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের আচরণের প্রভাব চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পড়ছে বলে সরকার সমর্থিতদের ভরাডুবি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির যুগ্ম আহ্বায়ক মুফতি মিজানুর রহমান সাইদ।
হেফাজতের উত্থাপনের প্রেক্ষাপটে কওমি মাদ্রাসা নিয়ে শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের উদ্যোগে এক মতবিনিময় সভায় এই মত জানান তিনি।
গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুল ভোটে হেরে যান।
ওই নির্বাচনে হেফাজতকর্মীরা সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছিলো বলে অভিযোগ উঠলেও মুফতি মিজান বলেন, এটা ‘অটোমেটিক’ প্রতিক্রিয়া।
“মুসলমানদের অন্তরে আঘাত লাগে এমন কোনো বিষয় যদি ঘটে, আমরা আহ্বান জানাবো- আপনারা পদক্ষেপ নেবেন আমরা বসে থাকবো, দোয়া করবো। কিন্তু কোনো রকমের কর্ণপাত না করে ইসলাম বিরোধীদের সরকারের বিভিন্ন রকমের সহযোগিতা ইসলামের বিপক্ষে চলে গেছে।”
“আর নির্বাচনে অধিকাংশ ভোট মুসলমানদের কাছে, হিন্দুদের কাছে নয়।নির্বাচনে এর প্রতিক্রিয়া পড়তেই পারে। এটা হেফাজতের কাজ নয়, অটোমেটিক রেজাল্ট আসছে। ইসলামের পক্ষে কারা, বিপক্ষে কারা।”
হেফাজতে ইসলামের উত্থান, এবং রাজনীতিতে এর প্রভাব সম্পর্কে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আর্টস এডিটর কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা জানতে চাইলে হেফাজত নেতা একথা বলেন।
এই আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক সালাউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তাদের সঙ্গে ছিলেন কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ফরীদউদ্দীন মাসঊদও।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গত ফেব্রুয়ারিতে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পরপরই মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম, যার নেতা চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক আহমদ শফী।
গণজাগরণ আন্দোলনের সম্পৃক্ত ব্লগারদের ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে তাদের শাস্তির দাবিতে রাজপথে নামা হেফাজত পরে ১৩ দফা দাবি তোলে, যা নারীবিরোধী বলেও সমালোচিত।
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অভিযোগ, হেফাজতের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। আর সেজন্য গত ৫ মে মতিঝিলে অবস্থান নেয়া হেফাজতকর্মীদের তুলে দেয়া হয়।
ওই অভিযানে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে হেফাজতের সঙ্গে বিরোধী দলও দাবি করে আসছে; যদিও তা প্রত্যাখ্যান করছে সরকার।
মুফতি মিজান বলেন, “আমরা কখনো বলিনি, সরকার ইসলাম চায় না। সরকার ইসলাম চায়, কিন্তু যারা ইসলাসের বিরোধী শক্তি, ইসলাম যারা চায় না, তাদের সঙ্গে সরকার সুর মেলাচ্ছে।
“বিভিন্নভাবে হেফাজতে ইসলামকে কোনঠাসা করার জন্য জুলুম-নির্যাতন করা হয়েছে। আবার মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যাচার করা হয়েছে।”
বিভিন্ন সভায় হেফাজত নেতারা সরকারকে ‘নাস্তিক্যবাদী সরকার’ আখ্যায়িত করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে আসেছেন।
হেফাজত নেতা মুফতি মিজান বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতি হলো- প্রতিষ্ঠিত সরকারকে আল্লাহর বিধি-বিধান অনুযায়ী পরিচালনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা। সরকার যদি এতে কোনো ভুল-ত্রুটি করে থাকে, তবে জাতি জনগোষ্ঠীর কল্যানে আল্লাহর বিধি বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য যত ধরনের দাবি আছে তা তুলে ধরা এবং আল্লাহর হুকুম সরকারকে মেনে চলতে সহযোগিতা করা।
কওমি মাদ্রাসার মূল শিক্ষার সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার সঙ্গে রাজনীতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত নয়। এটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি সঠিকপথে থেকে রাজনীতি করে, সেটা ‘নফল এবাদতের সওয়াব’ পাবে।
“তবে রাজনীতির নামে অন্য কোনো ধারা, যেটা জাতি সমর্থন করে না, ন্যায় থেকে দূরে আছে। সেই ধরনের পথ ইসলাম সমর্থন করে না।”
“ইসলাম এর সঙ্গে কখনোই একমত নয়। কারণ রাজনীতি একটা মানুষের জীবন। জাতির জন্য মানুষের জন্য এর অনেক প্রয়োজন। এই প্রয়োজনে জনগণ কাজ করবে আর ইসলাম কোনো দিক-নির্দেশনা দেবে না, তা কখনো হতে পারে না।”
সেইসঙ্গে তিনি আরো বলেন, “ইসলামে রাজনীতি হচ্ছে ১০টি অধ্যায়ের মধ্যে একটি। সেটা যে কেউ করলেই হবে, ফরজে কেফায়ার মতো, জানাজার নামাজের মতো।”
এটা কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষা দেয়া হয় বলে জানান হেফাজতের যুগ্ম আহ্বায়ক মুফতি মিজান।
হেফাজতের উত্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, “হঠাৎ করে যখন নাস্তিক ব্লগারদের কিছু কথা উঠলো, তখন আমরা দেখছিলাম রাজনৈতিক দলগুলো সোচ্চার হয় কি না।
“রাজনৈতিক দলগুলো যখন কিছু বলেনি। তখন দ্বীন রক্ষার জন্য, ধর্ম রক্ষার জন্য, রসুলের প্রেমিকরা সোচ্চার হয়েছি।”

0 Comments