দেশের একমাত্র নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রসারিত করতে ‘চূড়ান্ত’ পর্যায়ে চলে গেছে সরকার। এছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক ভেঙে
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রামীণ ব্যাংক তৈরির সুপারিশও করা হয়েছে। ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ গঠন প্রণালীর জন্য গঠিত গ্রামীণ ব্যাংক তদন্ত কমিশনের সুপারিশে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া গেছে। গ্রামীণ ব্যাংক কমিশনের পূর্ণাঙ্গ অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন পড়–ন গ্রামীণ ব্যাংক তদন্ত কমিশন বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে: গ্রামীণ ব্যাংককে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের আইন কাঠামোতে সাজানো হোক। এর জন্য গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ আইন সংস্কার করতে হবে। গ্রামীণ ব্যাংকের পাঁচ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার মালিকের একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রাখতে হলে সংস্থাটিকে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের আদলে আনা ছাড়া গত্যন্তর নেই। (গ্রামীণ ব্যাংকের সূত্র মতে, ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৮৪ লাখ, শেয়ার মালিকের সংখ্যা ৫০ লাখ)।
কমিশনের একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন এরই মধ্যে সরকারের কাছে দাখিল করা হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের জন্য আগামী ২ জুলাই রাজধানীর বিয়াম মিলনায়নে একটি ওয়ার্কশপ আয়োজন করা হয়েছে। কমিশন আয়োজিত ওয়ার্কশপে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উপস্থিত থাকবেন।
উল্লেখ্য, ১৯৮৩ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত-ই গ্রামীণ ব্যাংক উদ্বোধন করেছিলেন। তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের অন্তত ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক হবে সরকার। অবশিষ্ট শেয়ার ব্যাংকের ঋণগ্রহীতারদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বেড়ে গেলো।
আরেকটি সুপারিশ হলো, সরকারকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আদলে ১৯ বা সমসংখ্যক কো¤পানিতে বিভক্ত করা। প্রত্যেকটির জন্য স্বতন্ত্র রেজিস্ট্রেশনও থাকবে। এই কো¤পানিগুলির পর¯পরের মধ্যে আইনগত স¤পর্ক থাকবে না, ব্যবস্থাপনার সংযোগ থাকবে না, কিংবা আর্থিক স¤পর্ক থাকবে না।
তবে শীর্ষ সংস্থা হিসেবে থাকবে গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান প্রধান কার্যালয়। এটা ১৯টি পৃথক ক্ষুদ্র গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। ক্ষুদ্র গ্রামীণ ব্যাংকগুলোকে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার দায়িত্ব থাকবে শীর্ষ সংস্থার উপর। শীর্ষ সংস্থা প্রত্যেকটি গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচন প্রক্রিয়া তদারক করবে, তাদের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর নজরদারী করবে, ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে সামঞ্জস্য বিধান করবে, নিয়োগ বিধিমালার প্রয়োগ তদারক করবে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এদের কার্যক্রম সমন্বয় করবে। শীর্ষ সংস্থাটির পরিচালনা ব্যয় স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাংকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে।
গ্রামীণ ব্যাংককে সমবায় বা ক্রেডিট ইউনিয়নের কাঠামোতে আনা ছাড়া শুধু অন্য একটি উপায়ে বেসরকারি সদৃশ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তিরত করা যেতে পারে, তা হলো কো¤পানি আইন ১৯৯৪-এর অধীনে কো¤পানি পরিণত করা। এটা করতে গেলে বড় সমস্যা দাঁড়াবে শেয়ার মালিকদের বার্ষিক সভা অনুষ্ঠান করা। এই বার্ষিক সভা অনুষ্ঠান কো¤পানি আইনের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই সুপারিশও করেছে তদন্ত কমিশন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমস্ত সুপারিশ করলেও গ্রামীণ ব্যাংকের আইন পরিবর্তনের পক্ষে কোনো যুক্তি উপস্থাপন করা হয়নি। বিশেষ করে, ৩০ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করে আসছে গ্রামীণ ব্যাংক, তখন এর প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল তা বোধগম্য নয়। বর্তমান আইন বোর্ডকেই সমস্ত ক্ষমতা দিয়েছে। বোর্ডের ৭৫ শতাংশ সদস্য গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা। এ নিয়ে কারো কোনো আপত্তি নেই। গ্রামীণ ব্যাংক সরকার বা কোনো সংস্থা থেকে কোনো টাকা নেয় না। গ্রামীণ ব্যাংক প্রতি বছর মুনাফা অর্জন করে। এই মুনাফা সদস্যদের মধ্যে লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) আকারে বিতরণ করে দেওয়া হয়।

0 Comments